সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশে তীব্র বিতর্ক। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস -এর শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুললেও বাস্তবে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন ছবি সামনে এল। কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court) -এর নথি বলছে, সদ্যসমাপ্ত ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করে তৃণমূলের মাত্র আটজন প্রার্থী ইলেকশন পিটিশন দায়ের করেছেন। বাকি বিপুল সংখ্যক পরাজিত প্রার্থী আদালতে যাননি, যা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে।
বিধানসভা ভোটে পাহাড়ের তিনটি আসন বাদ দিয়ে মোট ২৯১টি কেন্দ্রে প্রার্থী দেয় তৃণমূল। তার মধ্যে মাত্র ৮০টি আসনে জয় পায় দলটি। অর্থাৎ, ২১১টি আসনে পরাজয়ের মুখ দেখেন তৃণমূল প্রার্থীরা। কিন্তু এত বড় পরিসরে হারের পরেও মাত্র আটটি আসনের ফল আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০৩ জন পরাজিত প্রার্থী এই পথে হাঁটেননি। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ভোটের ফল ঘোষণার পরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিলেন, ‘১০০টির বেশি আসনে ভোট লুট হয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে এবং বিজেপি (Bharatiya Janata Party) বেআইনি উপায়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। তিনি জানিয়েছিলেন, ফল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়া হবে। কিন্তু নির্ধারিত ৪৫ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, সেই ঘোষণা বাস্তবে তেমন প্রতিফলিত হয়নি।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, যে প্রার্থী নিজে হেরেছেন, তিনিই ইলেকশন পিটিশন দায়ের করতে পারেন। দলের তরফে সম্মিলিত ভাবে মামলা করার সুযোগ নেই। ফলে প্রত্যেক প্রার্থীকে আলাদা ভাবে প্রমাণসহ আদালতে যেতে হয়। এই প্রক্রিয়াই অনেকের কাছে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। তৃণমূলের এক বিধায়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘দলনেত্রী যা বলেছেন, তা রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু আদালতে যেতে গেলে প্রমাণ দরকার। সব প্রার্থীর পক্ষে সেই প্রমাণ জোগাড় করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রেই ভোটের ফল মেনে নেওয়াই বাস্তবসম্মত।’ তাঁর এই মন্তব্যে দলের অন্দরের মনোভাবের ইঙ্গিত মিলছে। নদীয়া (Nadia) জেলার এক পরাজিত প্রার্থীর কথায়, ‘১০০টি আসনে কারচুপির কথা বলা হলেও কোন কোন কেন্দ্র তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। যদি সত্যিই এত বড় অভিযোগ থাকে, তা হলে সেই প্রার্থীদের একত্র করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যেত। বাস্তবে তেমন কিছু দেখা যায়নি।’ তাঁর দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই ব্যক্তিগত ভাবে মামলা করতে আগ্রহী নন, কারণ তাঁরা দলীয় সমর্থন নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন।
এদিকে যাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুর (Bhabanipur) কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) কাছে তিনি পরাজিত হন ১৫,১০৫ ভোটে। মমতার অভিযোগ, ‘আমাকে গণনাকেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে একতরফা গণনা হয়েছে।’ যদিও নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ খারিজ করে জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে গণনাকেন্দ্রে দেখা গিয়েছে। এছাড়াও পাণ্ডবেশ্বর (Pandabeswar) কেন্দ্রের প্রার্থী নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (Narendranath Chakraborty) বিজেপির জিতেন্দ্র তিওয়ারির (Jitendra Tiwari) কাছে ১৩৯৮ ভোটে হেরে যান। তাঁর দাবি, ‘কারচুপি না হলে ফল অন্যরকম হত।’ একইভাবে গোপীবল্লভপুর (Gopiballavpur) -এর অজিত মাহাতো (Ajit Mahato), বিনপুর (Binpur) -এর বিরবাহা হাঁসদা (Birbaha Hansda), ঝাড়গ্রাম (Jhargram)-এর মঙ্গল সোরেন (Mangal Soren) ও মানবাজার (Manbazar) -এর সন্ধ্যা রানি টুডুও (Sandhya Rani Tudu) আদালতে গিয়েছেন। রাজারহাট-নিউটাউন (Rajarhat-Newtown) কেন্দ্রের তাপস চট্টোপাধ্যায় (Tapas Chatterjee) মাত্র ৩১৬ ভোটে পরাজিত হয়েও মামলা করেছেন। একইভাবে পটাশপুর (Patashpur)-এর পীযূষকান্তি পন্ডা (Piyushkanti Panda) ইলেকশন পিটিশন দায়ের করেছেন।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, বহু প্রার্থী খুব কম ব্যবধানে হারলেও আদালতে যাননি। সাতগাছিয়া (Satgachia) -এর সোমাশ্রী বেতাল (Somasree Betal) ৪০১ ভোটে হেরে গিয়েও মামলা করেননি। জাঙ্গিপাড়ার (Jangipara) স্নেহাশিস চক্রবর্তী (Snehasish Chakraborty), রায়নার (Raina) মন্দিরা দোলুই (Mandira Dolui) ও কাশীপুর-বেলগাছিয়ার (Kashipur-Belgachia) অতীন ঘোষ (Atin Ghosh)-এর মতো নেতারাও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটের ফল ঘোষণার পর অনেক প্রার্থীকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগেও সাড়া সীমিত ছিল। কয়েকজন ই-মেল করলেও অধিকাংশই নীরব থেকেছেন। স্নেহাশিস চক্রবর্তী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। অন্যদিকে বিজেপিও কয়েকটি আসনের ফল চ্যালেঞ্জ করেছে। বর্ধমান উত্তর (Bardhaman North) -এর সঞ্জয় দাস (Sanjay Das), স্বরূপনগর (Swarupnagar)-এর তারক সাহা (Tarak Saha), মধ্যমগ্রাম (Madhyamgram)-এর অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Banerjee), কুলতলি (Kultali)-র মাধবী হালদার (Madhabi Haldar), হাসনাবাদ (Hasnabad)-এর নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (Nikhil Banerjee) এবং সিতাই (Sitai)-এর আশুতোষ বর্মা (Ashutosh Barman) আদালতে গিয়েছেন। সব মিলিয়ে দুই দলের মোট ১৪টি ইলেকশন পিটিশন দায়ের হয়েছে। আইনি মহলের একাংশের মতে, ইলেকশন পিটিশনের নিষ্পত্তি সাধারণত দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন শেষ হয়ে গেলেও মামলা ঝুলে থাকে। ২০২১ সালের ভোটের পরেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল, তখনও আটটি মামলা দায়ের হয়েছিল, যার অধিকাংশ এখনও বিচারাধীন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক বক্তব্য আর আইনি পদক্ষেপের মধ্যে এই ফারাক কেন? একদিকে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ, অন্যদিকে আদালতে সীমিত উপস্থিতি, এই দ্বন্দ্বই এখন আলোচনার কেন্দ্র। আগামী দিনে এই মামলাগুলির গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যায়, সেটাই এখন দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Bhabanipur election case, Mamata Banerjee High Court | ভবানীপুর ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে মমতা, শুভেন্দুর জয়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই




