সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) মঙ্গলবার এক সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এমন এক ঘটনা শোনালেন, যা মুহূর্তেই শ্রোতাদের মুখে হাসি এনে দেয়। কথা উঠেছিল জন্মের শংসাপত্র বা ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ নিয়ে। সেই প্রসঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী একদিকে যেমন নিজ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন, তেমনই শেয়ার করেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee)-এর সঙ্গে তাঁর এক রসিক মুহূর্তের কথাও। মমতা বলেন, “আগে তো আমাদের সময়ে হাসপাতালের সংখ্যা হাতে গোনা ছিল। তখন প্রায় সব বাচ্চাই জন্মাতো বাড়িতে, ধাত্রী মা এসে বাচ্চা প্রসব করাতেন। আমরা ছিলাম হোম ডেলিভারি (Home Delivery)। এখন তো সময় বদলে গেছে। হাসপাতালে সন্তান জন্ম দেওয়া এখন সাধারণ ব্যাপার। এটাকে বলে ইন্সস্টিটিউশন ডেলিভারি (Institutional Delivery)। গত চোদ্দ বছরে স্বাস্থ্যে বিপ্লব ঘটেছে। এখন ৯৫ শতাংশেরও বেশি ইন্সস্টিটিউশন ডেলিভারি হয়। এর জন্য সবার কৃতিত্ব হওয়া উচিত।”
এরপর নিজের জীবনের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আজ যদি কেউ বলে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তোমার জন্মের সার্টিফিকেট নিয়ে এসো, আমি কী করে দেব? আমরা জন্মেছিলাম মাটির ঘরে। তখন তো সার্টিফিকেট বলে কিছু ছিল না। ধাত্রী মা এসে কাজটা করে দিতেন। ক’জনের ইন্সস্টিটিউশন ডেলিভারি হত? ক’টা হাসপাতাল ছিল? তখনকার সময়ে এডুকেশন সার্টিফিকেটই ছিল জন্মের প্রমাণ। ৯৯ শতাংশ লোকের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে।” মমতা বলেন, “আমি আমার আত্মজীবনী বইয়েও লিখেছি, আমার দাদা বলেছিল, তুই জানিস, আমার সঙ্গে তোর বয়সের ফারাক মাত্র ছ’মাস। আমি তখন বলেছিলাম- এগুলো বাবা-মা করেছেন, আমি না! ওটাই হয়েছে বলেই হয়তো এত তাড়াতাড়ি জীবনের দৌড়ে এগিয়ে যেতে পেরেছি।”
তারপরই আসে তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে মজার অংশ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অটলজি (Atalji) আর বেঁচে নেই, কিন্তু উনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। একদিন আমি মজা করে ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘যীশুর জন্মের দিনই আপনার জন্ম হয়েছিল?’ উনি বলেছিলেন, না না, আসলটা ওটা না। যেটা মা-বাবা লিখেছিলেন, সেইটাই চলছে। উনি ৫ জানুয়ারি আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ফোন করতেন। তখন আমি বলতাম, অটলজি, আমারও তাই।” এই কথার পরেই হেসে মমতা বলেন, “আপনি আমায় ফোন করবেন না!” আর সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত শ্রোতারা হেসে ওঠেন।
রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এমন হালকা রসিকতা প্রায়ই দেখা যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতায়। তবে এদিনের বক্তব্যে তিনি শুধু রসিকতা নয়, এক বাস্তব সমস্যার কথাও সামনে আনলেন। রাজ্যে বর্তমানে এসআইআর (SIR) বা সামাজিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলছে, যার জন্য বহু নাগরিককে জন্ম সনদ বা বয়স প্রমাণপত্র জমা দিতে হচ্ছে। কিন্তু বহু মানুষ, বিশেষ করে প্রবীণ প্রজন্মের, কাছে এই নথি নেই। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এখনকার দিনে জন্ম সার্টিফিকেট না থাকলে অনেক সময় নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু পুরনো দিনের মানুষদের জন্য এটা সত্যিই কঠিন। তাই তাঁদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত।” তাঁর কথায় উঠে আসে এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, “সবাই তো হাসপাতালের বিছানায় জন্মায়নি। তাই আমরা যাঁরা সেই সময়ের মানুষ, তাঁদের দিকটাও দেখতে হবে। এখনকার দিনে হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিংহোম—সব কিছুই সহজলভ্য। কিন্তু তখন অনেকেই তো মাটির ঘরে, ধাত্রী মায়ের হাতে জন্মেছিলেন।”
স্বাস্থ্য পরিষেবায় পশ্চিমবঙ্গের উন্নতির কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, “এই ১৪ বছরে রাজ্যে চিকিৎসা পরিষেবায় এক বিপ্লব ঘটেছে। এখন প্রতিটি ব্লকে হাসপাতাল আছে, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছেন। আগে যেখানে সন্তান জন্ম হত বাড়িতে, সেখানে এখন ৯৫ শতাংশ মানুষ হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। এটা বড় পরিবর্তন।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য একদিকে যেমন প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রতি আলোকপাত করেছে, তেমনই মানবিক সংবেদনশীলতার ছোঁয়াও দিয়েছে। বিশেষত অটল বিহারী বাজপেয়ীর স্মৃতি উস্কে দিয়ে তিনি রাজনৈতিক শালীনতারও এক নিদর্শন রাখলেন। এক প্রশাসনিক সভা থেকে এমন রসিক অথচ ভাবনাপ্রবণ মন্তব্যে আবারও প্রমাণ মিলল- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতির মঞ্চে যেমন কঠোর, ঠিক তেমনই সাধারণ জীবনের কথায় স্নেহময় ও বাস্তববাদী।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Partha Chatterjee release | জেল থেকে মুক্ত হয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বিবৃতিতে আত্মবিশ্বাসের সুর



