Mahabalipuram | মহাবলীপুরমের পাথরের গহীনে ইতিহাসের নীরব জ্যোতি

SHARE:

মিলি ঘোষ : যদি সমুদ্রের ধারে ইতিহাসের আঁচ পাওয়া যায়, তবে তা মহাবলীপুরম (Mahabalipuram) ছাড়া আর কোথাও নয়। তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) কাঞ্চিপুরম (Kanchipuram) জেলার এই ছোট্ট শহর যেন পাথরের মধ্যে প্রাণের স্পন্দনকে চিরকাল বেঁধে রেখেছে। সমুদ্রের নোনা হাওয়া আর পাথরের গায়ে কুড়ানো সূর্যের আলোয় প্রতিটি মন্দির, প্রতিটি শিলালিপি, প্রতিটি গুহা গল্প বলে প্রাচীন সভ্যতার, এক পরাক্রমী রাজবংশের, আর মানুষের শিল্পপ্রতিভার। যখন সূর্য উদিত হয় বঙ্গোপসাগরের (Bay of Bengal) বুকে, তখন মহাবলীপুরমের (Mahabalipuram) উপকূলীয় মন্দিরগুলোর উপরে তার আলো পড়ে এক অনন্য সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। প্রথম দিনের ভোরে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, “পৃথিবীতে এমন শৈল্পিক দৃশ্য আর কোথাও নেই।” এই অনুভূতিই হয়তো সকল পর্যটককে টেনে আনে এখানে।

পঞ্চরত্ন মন্দির। সংগৃহীত চিত্র। 

পল্লব (Pallava) রাজাদের স্থাপত্যশিল্প এখানে সর্বাধিক ফুটে উঠেছে। সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দীতে গড়া এই শৈলকর্তিত মন্দিরসমূহ ও গুহা-মন্দিরগুলির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়, কেন ইউনেস্কো (UNESCO) এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দিয়েছে। ইতিহাসবিদেরা বলেন, “মহাবলীপুরম (Mahabalipuram) শুধু স্থাপত্য নয়, এটি তৎকালীন সমাজ, ধর্ম, রীতি এবং মানুষের অন্তর্লৌকিক বোধের এক জ্যান্ত দলিল।” সমুদ্রতটের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শোর টেম্পল (Shore Temple) যেন এক অমর গান গাইছে। শোনা যায়, একসময় এই এলাকায় সাতটি শোর মন্দির ছিল, যেগুলোকে ‘সপ্ত-পগোডা’ বলা হত, কিন্তু এখন একটিমাত্রই স্থায়ীভাবে দৃশ্যমান। শোর টেম্পলের (Shore Temple) শৈলশিল্প, শিবলিঙ্গ ও নারসিংহের মূর্তি দেখার সময় মনে হয়েছিল, পাথরের মধ্যেই ঈশ্বরকে বেঁধে ফেলা হয়েছে চিরদিনের জন্য।রথসমূহ (Rathas) বা পঞ্চ রথের (Five Rathas) কথা না বললেই নয়। এগুলোকে মোনোলিথিক মন্দির বলা হয়, কারণ সম্পূর্ণ একটি পাথর কেটে এই রথগুলোর অবয়ব গড়া হয়েছে। এখানে দ্রৌপদীর (Draupadi), অর্জুনের (Arjuna), ভীমের (Bhima), যুধিষ্ঠিরের (Yudhishthira) ও নকুল সহ সহদেবের (Nakula Sahadeva) রথ আছে। প্রতিটি রথের গায়ে খোদাই করা প্রতিমা, স্তম্ভ আর দেওয়াল যেন কথা বলছে, হাজার বছরের পুরনো গল্প। একজন স্থানীয় গাইড বলছিলেন, “এগুলো শুধু মন্দির নয়, এগুলি পল্লবদের (Pallavas) শক্তি, কৌশল আর শিল্পের তেজময় নিদর্শন।”

আরও যে জায়গাটি অবাক করেছিল তা হল ‘অর্জুন’স পেনান্স’ (Arjuna’s Penance)। বিশাল একটি পাথরের উপর খোদাই করা এই শিল্পকর্মে দেখা যায় দেবতা, ঋষি, প্রাণী, নাগ, গঙ্গা অবতরণ সব একসঙ্গে। এর বিশালতা আর সূক্ষ্মতা দেখে বোঝা যায়, প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য কতখানি জটিল ও ভাবনাপ্রবণ ছিল। স্থানীয়রা এটিকে ‘গঙ্গা অবতার’ও বলেন।সন্ধ্যায় যখন সূর্য ডুবে যাচ্ছিল, তখন শোর টেম্পলের (Shore Temple) পেছনে কমলা আভা ছড়িয়ে পড়েছিল। সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের শব্দের মধ্যে সেই দৃশ্য যেন এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। এক জার্মান পর্যটক বলছিলেন, “এটি শুধু পর্যটন নয়, এটি আত্মা জাগ্রত করার স্থান।”

মহাবলীপুরমের (Mahabalipuram) রাস্তাগুলোও কম নয়। এখানে বিভিন্ন পাথরের ভাস্কর্য বিক্রেতা, কাঠের হাতের তৈরি সামগ্রী, মাটি আর শাঁখের গহনা পাওয়া যায়। এক দোকানদার বলল, “দিদি, এখানকার শিল্পীরা এখনও পল্লব যুগের কারিগরি শিখে কাজ করেন। আমাদের জীবিকা এই শিল্প।” সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ঘোরাঘুরির পর বুঝলাম, মহাবলীপুরম (Mahabalipuram) আসলে শুধু দর্শনীয় স্থান নয়। এটি ইতিহাসের জীবন্ত পাঠশালা। এখানে আসা মানে সময়কে ছুঁয়ে ফেরা। প্রতিটি পাথর, প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি আলো-ছায়া, সব কিছু মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় এক গভীর সংযোগ, যা শুধু চোখে নয়, হৃদয়েও গেঁথে থাকে।

ছবি: সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : Travelog : Nahargarh Fort, Rajasthan | রাজপ্রাসাদের ছায়ায় নাহারগড়, জমকালো ঐতিহ্যের ব্যঞ্জনা

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment