সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রান্নার গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের পথে কেন্দ্রীয় সরকার। ‘লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস সংশোধনী আদেশ, ২০২৬’ (LPG Amendment Order, 2026) কার্যকর করে গ্রাহকদের জন্য নতুন সুবিধার দরজা খুলে দিল পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক (Ministry of Petroleum)। এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন সেই সব পরিবার, যারা পাইপলাইনের গ্যাস (PNG) নেওয়ার পর পুরোনো এলপিজি (LPG) সিলিন্ডার কানেকশন জমা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে গ্রাহকরা তাঁদের পুরোনো এলপিজি সংযোগ আবার ফিরে পেতে পারবেন। অর্থাৎ, একবার সিলিন্ডার জমা দিলেই তা চিরতরে বাতিল হয়ে যাবে, এই ধারণার অবসান ঘটল। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের বক্তব্য, ‘গ্রাহকদের আরও সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে।’
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনও গ্রাহক যদি বাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ গ্রহণ করেন, তবে ৬০ দিনের মধ্যে তিনি তাঁর পুরোনো এলপিজি কানেকশন জমা দিতে পারবেন। তবে এর পরিবর্তে তাঁকে একটি ‘ট্রান্সফার ভাউচার’ দেওয়া হবে। এই ভাউচারই ভবিষ্যতে তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে কাজ করবে। সরকার জানিয়েছে, ‘এই ভাউচার ব্যবহার করে গ্রাহক অন্য কোনও এলাকায় গিয়ে আবার সিলিন্ডার কানেকশন চালু করতে পারবেন।’ ফলে যারা চাকরির সূত্রে বারবার স্থান পরিবর্তন করেন, ভাড়াটিয়া বা পড়ুয়া, তাঁদের জন্য এই নিয়ম অত্যন্ত কার্যকর হতে চলেছে। এর আগে নিয়ম ছিল, পাইপলাইনের গ্যাস নিলে এলপিজি কানেকশন বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হবে এবং তা পুনরুদ্ধারের সুযোগ ছিল না। সেই নিয়মের জেরে প্রায় ৫৯,৮০০ জন গ্রাহক তাঁদের পুরোনো সিলিন্ডার কানেকশন ফেরত দিয়েছিলেন। নতুন সিদ্ধান্তে তাঁদের মতো বহু মানুষের সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই পদক্ষেপের পেছনে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ভারত এখনো এলপিজি গ্যাসের ক্ষেত্রে বড় অংশে আমদানির উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উপর নির্ভরতা বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) সংক্রান্ত সমস্যার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ এলপিজি আমদানি এই রুটের উপর নির্ভরশীল। ফলে সেই পথ ব্যাহত হলে গোটা সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। দেশের প্রায় ৩৩ কোটি গ্রাহক ছাড়াও হাসপাতাল, হোটেল এবং অন্যান্য পরিষেবার জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত রাখা সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প ব্যবস্থার দিকে নজর দেয়। বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে ঘরোয়া ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্যাস বুকিংয়ের ব্যবধান শহরাঞ্চলে ২৫ দিন এবং গ্রামীণ এলাকায় ৪৫ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, যাতে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় থাকে। একই সঙ্গে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবস্থার সম্প্রসারণেও জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ মাস থেকে প্রায় ৮ লক্ষ নতুন পিএনজি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। শহরাঞ্চলে এই পরিষেবা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু, দেশের সব জায়গায় এখনো পাইপলাইনের গ্যাস পৌঁছয়নি। বহু এলাকায় এখনও এলপিজিই একমাত্র ভরসা। সেই কারণেই নতুন নিয়মে দুই ব্যবস্থার মধ্যে নমনীয়তা রাখা হয়েছে। কেউ যদি ভবিষ্যতে এমন এলাকায় চলে যান, যেখানে পিএনজি নেই, তখন তিনি সহজেই পুরোনো এলপিজি সংযোগ ফের চালু করতে পারবেন। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সাধারণ মানুষের সুবিধাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ঘরোয়া গ্যাস ও পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহকে ১০০ শতাংশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ এর ফলে শহর ও গ্রাম, দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীরা লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এই নতুন নিয়মের ফলে গ্যাস ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা এবং নমনীয়তা আসবে। গ্রাহকদের উপর চাপ কমবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তারা নিজেদের জ্বালানি ব্যবস্থাকে বদলাতে পারবেন। বর্তমানে অনেকেই পিএনজি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন, কারণ এটি নিরবচ্ছিন্ন এবং তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কিন্তু সবার কাছে এই পরিষেবা পৌঁছয়নি। তাই এলপিজি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে বাদ না দিয়ে, বরং বিকল্প হিসেবে ধরে রাখার এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্তের ফলে গ্যাস ব্যবহারের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। গ্রাহকেরা পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, কোথাও পিএনজি, কোথাও এলপিজি। কেন্দ্রের এই নতুন নিয়ম সেই পথকেই আরও সহজ করে দিল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : LPG Crisis | ২১ রাজ্যে পাম্পে কেরোসিন সরবরাহ শুরু, তালিকায় নেই পশ্চিমবঙ্গ



