নবারুণ দাস, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ৪১ হাজার বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায় ঘটে যায়, যার প্রভাব মানুষের জীবনযাত্রাকে নতুনভাবে রূপ দেয়। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, সেই সময় পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র প্রায় ধ্বসে পড়েছিল, ফলে মহাজাগতিক বিকিরণের ঝুঁকি বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণে। একে বলা হয় Laschamps Excursion, যা এক বিরল জিওম্যাগনেটিক ঘটনা, প্রথম ফ্রান্সের আগ্নেয়গিরির স্তর থেকে শনাক্ত করা হয়। এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক জার্নাল Science Advances-এ।
স্বাভাবিক অবস্থায় পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র একটি স্থিতিশীল ডাইপোলের মতো কাজ করে, যা সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ এবং সৌরঝড় থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। কিন্তু Laschamps Excursion-এর সময় সেই সুরক্ষা ভেঙে যায়। পৃথিবীর মেরুগুলো দিকভ্রষ্ট হয়ে কয়েক হাজার মাইল সরে যায় এবং চৌম্বকক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়ে বর্তমানের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশে। এর ফলে মহাজাগতিক রশ্মি সরাসরি ভূপৃষ্ঠে এসে আঘাত হানতে শুরু করে। গবেষক দলের অন্যতম ভূতত্ত্ববিদ অগ্নীৎ মুখোপাধ্যায় জানান, ‘এই সময়ে আকাশে অরোরা বা মেরুজ্যোতি শুধু মেরু অঞ্চলে নয়, নিরক্ষীয় অঞ্চল পর্যন্ত দৃশ্যমান ছিল। পৃথিবীর আকাশ ছিল যেমন মোহময়, তেমনি ছিল বিপজ্জনক।’

আর্কিওলজিক্যাল প্রমাণ বলছে, তখন ইউরোপে বসবাস করছিলেন নীয়ান্ডারথাল এবং হোমো স্যাপিয়েন্স। অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির কারণে মানুষ বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ত্বক পোড়া, দৃষ্টি নষ্ট হওয়া, এমনকী গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও ছিল প্রবল। প্রতিরোধ গড়তে মানুষ আশ্রয় নেয় গুহায়, ব্যবহার করে গা ঢাকা পোশাক, আর শরীরে মেখে নেয় খনিজ গুঁড়ো ওকার, যা প্রাকৃতিক সানস্ক্রিনের মতো কাজ করত।
Read : Love, sex and Ancient India : প্রাচীন ভারতে প্রেম যৌনতায় ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
রেভেন গারভে। তিনি আর্কিওলজি নিয়ে কাজ করেন, বলেছেন, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, এই সময় গুহায় থাকার প্রবণতা ও শরীর ঢেকে রাখার অভ্যাস হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। ওকার ব্যবহারের বিস্তারও এই সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। অর্থাৎ, মানুষ প্রকৃতির হুমকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সৃজনশীল পথ খুঁজে নিয়েছিল।’ তবে গবেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, শুধুমাত্র মহাজাগতিক আবহাওয়া বা চৌম্বকক্ষেত্রের দুর্বলতা নীয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির কারণ নয়। এটি ছিল আরও অনেকগুলি পরিবেশগত চাপের মধ্যে একটি। তবুও এই ঘটনা প্রমাণ করে, মহাজাগতিক পরিবর্তন সরাসরি মানবজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ভূতত্ত্ববিদরা সাধারণত মডেল ও ডেটা নিয়ে কাজ করেন, অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিফলন থেকে তথ্য খুঁজে আনেন। এই দুই শাখার যৌথ গবেষণা দেখিয়েছে কিভাবে মহাজাগতিক আবহাওয়া মানুষকে প্রভাবিত করেছে।সানজা পানভস্কা মন্তব্য করেছেন, ‘স্পেস ওয়েদার শুধু আয়নোস্ফিয়ার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছে গিয়েছিল, যা আজকের পৃথিবী বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’ আবার বিজ্ঞানীরা আরও সতর্ক করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম চৌম্বক বিপর্যয় বহুবার ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা জানলে ভবিষ্যতের ঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে।
উল্লেখ্য যে, এই গবেষণার অন্যতম বার্তা হল, মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য সবসময় নতুন কৌশল আবিষ্কার করেছে। গুহার অন্ধকার থেকে শুরু করে খনিজ রঙের ব্যবহার, সবই ছিল মহাজাগতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়াইয়ের অংশ। আজও মহাজাগতিক বিকিরণ, সৌরঝড় ও চৌম্বকক্ষেত্রের পরিবর্তন মানবসভ্যতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অতীতের শিক্ষা হয়তো আমাদের ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করবে।
-প্রতীকী চিত্র ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Marriage in Ancient Egypt : প্রাচীন মিশরে বিবাহের রীতি




