তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : শীত এ বছর আগের চেয়ে অনেক বেশি কড়া হতে পারে। আবহাওয়াবিদরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করছেন, প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত তৈরি হচ্ছে ‘লা নিনা’ (La Niña) পরিস্থিতি, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ায়। ফলে ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে আগামী বছরের শুরুতেই দেশে নেমে আসতে পারে রেকর্ডতুল্য শীত। বিশেষত উত্তর ভারত, হিমালয় সংলগ্ন রাজ্য ও মধ্য ভারতের বেশ কিছু অঞ্চল কাঁপতে পারে প্রবল ঠান্ডায়। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর (IMD – India Meteorological Department) -এর প্রাথমিক পূর্বাভাস বলছে, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় অন্তত ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লি (Delhi), পাঞ্জাব (Punjab), হরিয়ানা (Haryana), রাজস্থান (Rajasthan), উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh), বিহার (Bihar), পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) ও মধ্যপ্রদেশে (Madhya Pradesh) ঠান্ডার তীব্রতা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

লা নিনা কীভাবে প্রভাব ফেলে আবহাওয়ায়
‘লা নিনা’ শব্দটির উৎপত্তি স্প্যানিশ ভাষা থেকে, এর অর্থ “ছোট মেয়ে”। এই প্রাকৃতিক ঘটনা পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত প্রক্রিয়া (Climatic Phenomenon), যা ‘এল নিনো’ (El Nino) -এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এল নিনো যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়, সেখানে লা নিনা সেই তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। এর ফলে বায়ুপ্রবাহের ধরণ, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং মৌসুমী পরিবর্তনের তীব্রতা বদলে যায়। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ড. অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত (Dr. Aniruddha Sengupta) বলেন, “লা নিনা অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাংশে জল ঠান্ডা হয়ে যায়। এই ঠান্ডা জলের কারণে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ঠাণ্ডা বায়ুপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলে এর ফলস্বরূপ দেখা যায় দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর শীতকাল।” বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO – World Meteorological Organization) ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ লা নিনা সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ভারতবর্ষে চলতি শীত হতে পারে গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম ঠান্ডা মৌসুম।
ভারতের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে এই পরিবর্তন
লা নিনা অবস্থার কারণে উত্তর ভারতের সমতল অঞ্চলে ঘন কুয়াশা, শৈত্যপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা পতনের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে। কিছু অঞ্চলে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে, ট্রেন ও বিমানের সময়সূচিতে প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি তাপমাত্রা হঠাৎ পতনের কারণে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবহাওয়া দপ্তরের এক কর্তা বলেন, “লা নিনা যখন সক্রিয় থাকে, তখন উত্তর ভারতের রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক নিচে নেমে যায়। এমনকি পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার কিছু এলাকাতেও ঠাণ্ডার প্রভাব বাড়তে পারে।”

কৃষিক্ষেত্রে মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে এই শীত
বিশেষজ্ঞদের মতে, লা নিনা যেমন ঠান্ডা বাড়ায়, তেমনি কৃষিক্ষেত্রেও তার প্রভাব স্পষ্ট হয়। এই সময়ে শীতের মাত্রা বাড়লে রবি ফসলের জন্য তা উপকারী হতে পারে। গম, সরিষা, মটরশুঁটি ও আলুর মতো ফসল ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় ভালো ফলন দেয়। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডা বা অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হলে কৃষকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে যদি জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে অকাল বৃষ্টি হয়, তবে ফসলের মান নষ্ট হতে পারে। কৃষি বিশ্লেষক অশোক মিশ্র (Ashok Mishra) বলেন, “লা নিনা মৌসুমে গমের ফলন সাধারণত বাড়ে, কিন্তু যদি ঠান্ডা তীব্র হয় এবং সূর্যালোক কমে যায়, তবে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।”
অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব
ঠান্ডা পড়লে বিদ্যুৎ খরচ বাড়বে, বিশেষ করে গরম রাখার যন্ত্রপাতি ব্যবহারে। অন্যদিকে পর্যটন খাতের জন্য এটি ভালো খবর হতে পারে—কাশ্মীর (Kashmir), মানালি (Manali), দার্জিলিং (Darjeeling), সিকিম (Sikkim) -এর মতো হিল স্টেশনগুলোতে পর্যটকের ভিড় বাড়তে পারে। তবে পরিবহন ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত তিন বছরে এল নিনো ও লা নিনা পর্যায়ের অস্বাভাবিক পরিবর্তন বিজ্ঞানীদেরও চিন্তায় ফেলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) প্রভাবে এই প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি আরও অনিশ্চিত ও অনিয়মিত হয়ে উঠছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি মৌসুমী পূর্বাভাস দেওয়া এখন ক্রমেই জটিল হচ্ছে।ভারতের আবহাওয়া দপ্তর ইতিমধ্যেই নাগরিকদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে, শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা, গরম রাখার উপায়, এবং শিশু ও প্রবীণদের যত্নে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ভ্রমণ বা কৃষিকাজের পরিকল্পনা করার আগে স্থানীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুসরণ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, “লা নিনা ভারতের জন্য একদিকে যেমন প্রবল শীতের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি এটি হতে পারে কৃষি উৎপাদনের পক্ষে ইতিবাচক একটি সময়ও। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডা বা অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে নাগরিকদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।”
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ একুশ-তম কিস্তি)




