পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের ঐতিহাসিক জয়ের পর ভারতজুড়ে এখন উৎসবের আবহ। নারী ক্রিকেটে ভারতীয় দলের এই জয় কেবল মাঠের নয়, এটি মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস ও বিশ্বাস অর্জন। দলের অন্যতম নায়িকা জেমাইমা রদ্রিগেজ (Jemimah Rodrigues) ইনিংস শেষে চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি। ১৩৪ বলে অপরাজিত ১২৭ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেই তিনি ভারতকে ফাইনালে তুলে দিলেন। কিন্তু ম্যাচ শেষে তাঁর কণ্ঠে যে কৃতজ্ঞতা ও বিনয় শোনা গেল, সেটিই ছুঁয়ে গেল কোটি মানুষের হৃদয়। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার নিতে গিয়ে জেমাইমা বললেন, “স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু এই স্বপ্নটা এখানেই শেষ নয়। আমাদের এখনও ফাইনাল খেলতে হবে, আরও একটি ধাপ বাকি। গত এক মাসের পরিশ্রমটা সত্যিই কঠিন ছিল। একা আমি পারতাম না। মা, বাবা, কোচ এবং যাঁরা আমার উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানাতে চাই।”

এই ইনিংসের আগে অনেকেই জানতেন না যে, তাঁকে তিন নম্বরে নামানো হবে। আশ্চর্যজনকভাবে, তিনিও জানতেন না! “আমি তখন স্নান করছিলাম,” হাসতে হাসতে বলেন জেমাইমা। “আমাকে শুধু বলা হয়েছিল, প্রস্তুত থাকতে। মাঠে নামার পাঁচ মিনিট আগে জানানো হয় আমি তিন নম্বরে ব্যাট করব! তাই মনটাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেছিলাম।” তাঁর এই হঠাৎ ইনিংস ইতিহাসের অংশ। শতরান করার পরেও কোনও উল্লাস দেখা যায়নি তাঁর মুখে। কারণও পরিষ্কার করে বললেন, “আজ ব্যক্তিগত রানের কোনও গুরুত্ব নেই। আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, ভারতকে জেতানো। আগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আমরা হাতছাড়া করেছি। তাই এবার কোনও ভুল করতে চাইনি।”
তাঁর চোখে জল কেবল জয়ের নয়, অতীতের বেদনারও। গত বছর তাঁকে বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেই আঘাত আজও তাঁকে তাড়া করে। “গত বছর আমাকে দলে নেওয়া হয়নি। তখন অনেক কিছুই আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না,” বললেন জেমাইমা। “প্রতিদিন কেঁদেছি। মানসিকভাবে ভাল ছিলাম না। কিন্তু জানতাম, এবার আমাকে নিজের সেরাটা দিতে হবে। এই ইনিংস সেই প্রতিজ্ঞারই ফল।” ইনিংস চলাকালীন তাঁর আত্মবিশ্বাস ও ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল অটল। তিনি বলেন, “বাইবেলে লেখা আছে, দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও, ঈশ্বর তোমার হয়ে লড়বেন। আমি বারবার সেটাই ভাবছিলাম। শেষের দিকে অনেক কিছুই বাকি ছিল, তাই শান্ত থাকতে চেয়েছি।” কিন্তু, ইনিংসের শেষ পর্যায়ে তাঁকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সেটি স্বীকার করেও তিনি কৃতিত্ব দিয়েছেন সতীর্থদের। “আমি তখন নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু শরীর বলছিল থামো। তখন দীপ্তি (Deepti Sharma) প্রতি বলে আমার সঙ্গে কথা বলছিল, উৎসাহ দিচ্ছিল। আমি জানি, একা আমি কিছুই করতে পারিনি। সতীর্থদের ছাড়া এই ইনিংস অসম্ভব ছিল।”
দর্শকদের প্রতিও তাঁর গভীর কৃতজ্ঞতা। “প্রত্যেক দর্শক, যারা মাঠে উল্লাস করছিলেন বা বাড়িতে বসে প্রার্থনা করছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের জন্যই আজকের জয়। তাঁদের বিশ্বাসই আমাকে শক্তি দিয়েছে,” বলেন জেমাইমা। প্রসঙ্গত, ভারতের এই জয় নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছে। ভারতীয় দলের মেয়েরা এবার শুধুমাত্র খেলার জন্য মাঠে নামেননি, তাঁরা নেমেছিলেন এক বিশ্বাস, এক সংগ্রাম, এক জেদের কেন্দ্রীভূত শক্তি হয়ে। আর সেই আবেগই দেশের কোটি মানুষকে এক সুরে গেয়ে তুলেছে “চলো ভারত!”

রবিবার ফাইনালে নামবে ভারত। জেমাইমা চান, সেই দিনও যেন তাঁর চোখের জল ঝরে, কিন্তু আনন্দে। “আজ কেঁদেছি খুশিতে। ফাইনালেও যেন এমন কান্না আসে, সেটাই চাই,” বলে তিনি শেষ করেন মাইক্রোফোন হাতে। সত্যিই, তাঁর এই কান্না আজ কোটি ভারতীয়ের মুখে হাসি এনে দিয়েছে। মাঠে যেমন তাঁর ব্যাট কথা বলেছে, তেমনই মাঠের বাইরে তাঁর কথাগুলো এখন মানুষের মনে অনুপ্রেরণা হয়ে বাজছে। এই ইনিংস হয়তো কেবল ক্রিকেটের নয়, এটি এক তরুণীর মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং ঈশ্বরবিশ্বাসের গল্প, যা ভারতের নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকেও আলোকিত করে দেবে নিঃসন্দেহে।
ছবি : সংগৃহীত




