তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের তারকা ব্যাটার জেমাইমা রদ্রিগেজ (Jemimah Rodrigues) বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলেছিলেন, কিন্তু মনের ভেতরের যুদ্ধে ছিলেন সম্পূর্ণ একা। এক দিনের বিশ্বকাপ চলাকালীন এমন তীব্র মানসিক অবসাদ তাঁকে গ্রাস করেছিল যে মাঝপথেই টুর্নামেন্ট থেকে সরে এসে দেশে ফিরে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছিল। নিজের এই কঠিন অভিজ্ঞতার কথা এক সাক্ষাৎকারে অকপটে জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর কথায় উঠে এসেছে, একজন ক্রিকেটার মাঠে যতটা চাপ সামলান, তার বাইরেও কতটা অদৃশ্য লড়াই থাকে। জেমাইমা বলেন, ‘‘বিশ্বকাপ শুরু হতেই যেন একটা অজানা চাপ আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল। কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছিল না, কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঠিক নেই। ভিতরের অস্থিরতাটা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল।’’ তিনি জানান, টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, ততই গাঢ় হয়েছে তাঁর অবসাদ। ব্যাট হাতে নামলে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছিলেন না। ফিল্ডিং করার সময়ও মনে হত শরীর যেন শুনছে না।

অবসাদ এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে খেলাটার আনন্দটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। জেমাইমার কথায়, ‘‘যাঁরা এ ধরনের মানসিক অবস্থার ভেতর দিয়ে গিয়েছেন, তাঁরাই বোঝেন এর গভীরতা। একেক সময় নিজেকে অসাড় মনে হত। কোনও কাজে মন বসত না। অনুভূতি প্রকাশ করতে গেলেও যেন সব কিছু আটকে যাচ্ছিল।’’ কিন্তু কী ভাবে বেরিয়ে এলেন এই অন্ধকার থেকে? জেমাইমা জানান, একসময় তিনি বুঝলেন একা লড়াই করে কোনও লাভ নেই। সমস্যাটা কাউকে বলতেই হবে। তাই নিজের দুই ঘনিষ্ঠ সতীর্থ, অরুন্ধতী রেড্ডি (Arundhati Reddy) এবং স্মৃতি মান্ধানা-এর (Smriti Mandhana) সঙ্গে ভাগ করে নেন তাঁর দুঃসময়ের কথাগুলি। অরুন্ধতী প্রতিদিন তাঁর খবর নিতেন, বুঝতেন তাঁর নীরবতার ভাষা। স্মৃতি প্রায়ই তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন, চাপ কমাতে পাশে দাঁড়াতেন।জেমাইমা বলেন, ‘‘অরুই প্রথম বুঝেছিল আমি ভিতরে ভেঙে পড়ছি। ও- আমাকে একদিনও নজরের বাইরে রাখেনি। স্মৃতি আমাকে শান্ত রাখার জন্য নানা ভাবে সাহায্য করেছিল। ওদের না থাকলে হয়তো আর খেলতেই পারতাম না।’’
সতীর্থদের পাশে পাওয়া বড় শক্তি হলেও চূড়ান্ত ভরসার জায়গা ছিলেন মা। নিজে ফোন করে সবকথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন জেমাইমা। তাঁর মা তখন বলেছিলেন এমন কথা, যা পুরোটা বদলে দেয় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। জেমাইমা আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, ‘‘মাকে সব বলতে গিয়ে আমি কেঁদে ফেলি। তখন মা বলেন, ‘তুমি যদি বাড়ি ফিরে আসতে চাও, চলে এসো। আমার কাছে তোমার খুশিটাই সবচেয়ে বড়।’ মায়ের ওই কথাটাই আমাকে নতুন সাহস দেয়। বুঝলাম, পারফরম্যান্স নয়, মানুষ হিসেবে আমি তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’’ উল্লেখ্য, সেমিফাইনালের আগে মনের ভার কমাতে অরুন্ধতীকে সঙ্গে নিয়ে চার্চে যান তিনি। সেখানে প্রার্থনা করে খানিকটা শান্তি অনুভব করেন। এরপরই আসে তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংস, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে ১২৭ রানের দুরন্ত ব্যাটিং। ম্যাচ জিতে গেলেও আবেগ চেপে রাখতে পারেননি, মাঠেই কেঁদে ফেলেন ২৫ বছরের এই ক্রিকেটার।
সেই ইনিংস শুধু দলের জয়ই নিশ্চিত করেনি, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া জেমাইমাকে ফের নিজের ভরসা ফিরিয়ে দিয়েছে। এই লড়াই শুধু ক্রিকেটীয় নয়, এ ছিল মানসিক শক্তি, সমর্থন, পরিবার ও সতীর্থদের পাশে থাকার এক অনন্য উদাহরণ।প্রসঙ্গত, ভারতীয় ক্রিকেটে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার আলোচনাও নতুন করে সামনে এনেছেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়ে বহু তরুণ খেলোয়াড়, বিশেষত মহিলা ক্রিকেটারদের জন্য একটি দিশা দেখালেন জেমাইমা, যে সাহায্য চাইতে লজ্জা নেই, আর কোনও কঠিন পথই অতিক্রম করা অসম্ভব নয় যদি পাশে থাকে পরিবার, বন্ধু ও সতীর্থদের শক্ত হাত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Jemimah Rodrigues Smriti Mandhana | বন্ধুর কান্নায় ভেঙে পড়লেন জেমিমা, স্মৃতি মন্ধানার কঠিন সময়ে বিগ ব্যাশ ছেড়ে পাশে থাকার সিদ্ধান্ত




