সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি/ওয়াশিংটন: ভারতআমেরিকা (India-USA) বাণিজ্য সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে বড় স্বস্তি। মার্কিন শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা দফতর (US Customs and Border Protection) হোয়াইট হাউসের (White House) বিবৃতি উল্লেখ করে জানিয়েছে, ভারতীয় পণ্যের উপর আর ‘শাস্তিমূলক’ অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক নেওয়া হবে না। ৭ ফেব্রুয়ারি বা তার পরে গুদাম থেকে বার করা পণ্যের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। তবে পারস্পরিক শুল্ক বহাল থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) আগেই ঘোষণা করেছিলেন, ভারতীয় পণ্যে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে, সেই হারই কার্যকর থাকবে বলে স্পষ্ট করেছে মার্কিন প্রশাসন। এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন এবং কী শর্তে কমল শুল্ক? প্রেক্ষাপটে রয়েছে রাশিয়া (Russia) থেকে তেল আমদানির বিষয়টি। আমেরিকা আগে ভারতের উপর ২৫ শতাংশ ‘শাস্তিমূলক শুল্ক’ চাপিয়েছিল রুশ তেল কেনার অভিযোগে। কিন্তু সাম্প্রতিক বাণিজ্য-সমঝোতার পর ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ‘রাশিয়া থেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে তেল আমদানি বন্ধ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত।’ সেই কারণেই শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
কিন্তু, নতুন দিল্লির অবস্থান আরও সতর্ক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সরকারের তরফে সরাসরি বলা হয়নি যে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। সংসদীয় স্তরে জানানো হয়েছে, ‘ভারত তার ১৪০ কোটি মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।’ বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে নতুন দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। নানা টানাপোড়েন ও কূটনৈতিক দফায় দফায় বৈঠকের পর গত সপ্তাহে মোদী ও ট্রাম্পের টেলিফোন আলাপচারিতার পর বাণিজ্য-সমঝোতার ঘোষণা আসে। সেই ঘোষণার পরই প্রকাশ্যে আসে শুল্ক কমানোর বিষয়টি।
মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ৭ ফেব্রুয়ারি বা তার পরে গুদামজাত ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে না। তবে ১৮ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক বহাল থাকবে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ শুল্কমুক্তি নয়, বরং শাস্তিমূলক অংশ প্রত্যাহার। এই সিদ্ধান্তে ভারতীয় রফতানিকারকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। বিশেষ করে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, প্রকৌশল পণ্য ও কৃষিপণ্য রফতানিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞেরা। কিন্তু রুশ তেল আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের একাধিক কর্তা দাবি করেছেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধে সম্মত হয়েছে। যদিও নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিক ভাবে এমন কোনও প্রতিশ্রুতির কথা স্বীকার করেনি। পাশাপাশি সংসদীয় প্যানেলে স্পষ্ট করা হয়েছে, সস্তা ও উচ্চমানের অপরিশোধিত তেল যেখানে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই আমদানি চালু থাকবে। কংগ্রেস সাংসদ শশী তারুর (Shashi Tharoor) -এর নেতৃত্বাধীন বিদেশ বিষয়ক সংসদীয় প্যানেলের বৈঠকে বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রী (Vikram Misri) -সহ বিদেশ মন্ত্রকের শীর্ষ কর্তারারা উপস্থিত ছিলেন। সূত্রের খবর, বৈঠকে প্রশ্ন ওঠে, ভারত কী সত্যিই রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে? জবাবে জানানো হয়, জ্বালানি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দেশীয় তেল সংস্থাগুলি, তারা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজারদর বিচার করেই পদক্ষেপ করবে। অর্থাৎ সরকার সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করছে না; বরং সিদ্ধান্তের দায়ভার অনেকটাই সংস্থাগুলির উপর ছেড়ে দিচ্ছে।
এই অবস্থানকে অনেকেই ‘কৌশলী ভারসাম্য’ বলে ব্যাখ্যা করছেন। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা, দু’দিকেই নজর রাখতে চাইছে ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা, রাশিয়া-ইউক্রেন (Russia-Ukraine) সংঘাতের প্রভাব এবং পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার জটিলতা এসব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। সংসদীয় প্যানেলে আরও জানানো হয়েছে, বাণিজ্য-সমঝোতা চূড়ান্ত ঘোষণা হলেও এখনও আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্রে সই হয়নি। সূক্ষ্ম শর্তাবলি নিয়ে দুই দেশই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে চুক্তির বিস্তারিত কাঠামো জানতে দেশবাসীকে আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নামানো ভারতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। তবে রুশ তেল ইস্যুতে স্পষ্টতা না থাকলে ভবিষ্যতে আবারও চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে তেল আমদানি বন্ধ করা ভারতের পক্ষে অর্থনৈতিক ভাবে কঠিন হবে। উল্লেখ্য, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতা ও রুশ তেল আমদানি প্রশ্নে পরিস্থিতি এখনও পরিবর্তনশীল। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুল্ক কমার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে নজর রাখতে হবে আগামী দিনগুলিতে। আপাতত স্বস্তির হাওয়া বইলেও, আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবা-কাঠামোয় পরবর্তী চাল কী হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Indian farmers benefit US trade deal | কৃষিতে ‘ট্রাম্প কার্ড’ খেলেই বাজিমাত নতুন দিল্লির, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতায় শুল্ক ছাড়ে লাভবান হবেন ভারতীয় কৃষকরাই




