সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, রায়পুর : রায়পুরের সন্ধ্যায় যেন আচমকাই ঝড় উঠল ঈশান কোণে। কয়েক ঘণ্টা আগেই যেখানে নিউ জিল্যান্ড ২০৮ রানের পাহাড় গড়ে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, সেখানেই ভারত ব্যাট হাতে নামার পর বদলে গেল ছবিটা। সাত বলের মধ্যেই দুই ওপেনার ফিরলেও আতঙ্ক ছড়াল না ভারতীয় শিবিরে। কারণ ক্রীজে তখন দাঁড়িয়ে ছিলেন ঈশান কিশান (Ishan Kishan) এবং অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav)। তাঁদের ব্যাট থেকেই জন্ম নিল ঐতিহাসিক রান চেজ, যা রায়পুরের দর্শকরা বহু দিন মনে রাখবেন। ২০৯ রান তাড়া করতে নেমে শুরুটা ছিল ভারতের জন্য দুঃস্বপ্ন। সঞ্জু স্যামসন (Sanju Samson) প্রথম ওভারেই ক্যাচ তুলে দেন। প্রথমবার জীবন পেলেও দ্বিতীয় সুযোগে আর রেহাই মেলেনি। অন্য দিকে অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma) প্রথম বলেই বড় শট মারতে গিয়ে শূন্য রানে ফেরেন। স্কোর বোর্ডে তখন চাপ, গ্যালারিতে নিস্তব্ধতা। ঠিক সেই মুহূর্তেই ম্যাচের রাশ নিজের হাতে তুলে নেন ঈশান ও সূর্য।

প্রথম বল থেকেই আগ্রাসী মেজাজে দেখা গেল ঈশান কিশানকে। বাঁহাতি এই ব্যাটার শিশির ভেজা আউটফিল্ডকে নিজের শক্তিতে পরিণত করেন। নিউ জিল্যান্ডের বোলারদের কোনও রকম সময় না দিয়েই একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকাতে থাকেন তিনি। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার আগেই ম্যাচের গতি ঘুরে যায় ভারতের দিকে। মাত্র ২১ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন ঈশান। তাঁর ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল, শতরান অনিবার্য। যদিও ঈশ সোধির (Ish Sodhi) বলে তাঁকে ৩২ বলে ৭৬ রানে থামতে হয়। ইনিংসে ছিল ১১টি চার ও ৪টি ছক্কা। শতরান না পেলেও বিশ্বকাপের দৌড়ে নিজের দাবি আরও জোরালো করে দিলেন ঈশান। অন্য প্রান্তে, প্রথমে একটু মেপে খেলছিলেন সূর্যকুমার যাদব। ঈশান ঝড় তুললেও অধিনায়ক ঝুঁকি নিতে চাননি। তবে সঙ্গী আউট হওয়ার পরই চেনা রূপে ফিরলেন সূর্য। মাঠের চার দিকে ছড়াতে লাগল তাঁর ট্রেডমার্ক স্কুপ, ফ্লিক আর ইনসাইড-আউট শট। ১৪ মাস পর টি-টোয়েন্টিতে অর্ধশতরান করে ক্রীজ ছুঁয়ে তিনি প্রণাম করলেন। যেন নিজের খারাপ সময় কাটিয়ে ফেরার বার্তা দিলেন ক্রিকেটদেবতাকে। শেষ পর্যন্ত ৩৭ বলে ৮২ রান করে অপরাজিত থাকেন সূর্য, মারেন ৯টি চার ও ৪টি ছক্কা।
সূর্যের সঙ্গে যোগ দেন শিবম দুবে (Shivam Dube)। দু’জনে মিলে ম্যাচটাকে যেন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করেন। তাঁদের অর্ধশতরানের জুটি দেখে মনে হচ্ছিল, কে কত তাড়াতাড়ি ম্যাচ শেষ করবেন, সেই প্রতিযোগিতা চলছে। শিবম ১৮ বলে ৩৬ রানে অপরাজিত থাকেন। ভারত মাত্র ১৫.২ ওভারে লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে। ২০০-র বেশি রান তাড়া করে এত বল বাকি থাকতে জয়, টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে ভারতের সেরা পারফরম্যান্সগুলির একটি।
এর আগে টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেন সূর্যকুমার যাদব। শিশিরের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত, যা পরে সঠিক প্রমাণিত হয়। নিউ জিল্যান্ডের শুরুটাও ছিল ঝোড়োভাবেই। ডেভন কনওয়ে (Devon Conway) ও টিম সেইফার্ট (Tim Seifert) ওপেনিং জুটিতে ৩.২ ওভারে তোলেন ৪৩ রান। প্রথম ধাক্কা দেন হর্ষিত রানা (Harshit Rana)। ৯ বলে ১৯ রান করে আউট হন কনওয়ে। পরের ওভারে বরুণ চক্রবর্তী (Varun Chakravarthy) ফেরান সেইফার্টকে। মাঝের ওভারগুলোতে ঝড় তোলেন রাচিন রবীন্দ্র (Rachin Ravindra)। স্পিনারদের আক্রমণ করে দ্রুত রান তুলছিলেন তিনি। গ্লেন ফিলিপ্স (Glenn Phillips) সঙ্গ দিলে নিউ জিল্যান্ডের স্কোর এগোয় দ্রুত। তবে এই জুটি ভেঙে দেন কুলদীপ যাদব (Kuldeep Yadav)। তিনি ফিলিপ্সকে ১৯ ও রাচিনকে ৪৪ রানে আউট করেন। এরপর ড্যারিল মিচেল (Daryl Mitchell), মার্ক চ্যাপম্যান (Mark Chapman) বড় রান করতে ব্যর্থ হন।।শেষদিকে অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার (Mitchell Santner) ঝোড়ো ইনিংস খেলেন। অর্শদীপ সিংকে তিনি (Arshdeep Singh) টার্গেট করে রান তোলেন। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ২০৮ রান তোলে নিউ জিল্যান্ড। ভারতের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টিতে এটিই তাদের সর্বোচ্চ স্কোর। তবু তা জয়ের জন্য যথেষ্ট হল না।
ভারতের বোলিংয়ে কুলদীপ নেন ২ উইকেট, হার্দিক পাণ্ড্য (Hardik Pandya), হর্ষিত রানা ও বরুণ চক্রবর্তী একটি করে উইকেট পান। তবে অর্শদীপের চার ওভারে ৫৩ রান খরচ কিছুটা হলেও চিন্তায় রাখবে টিম ম্যানেজমেন্টকে। জয়ের আনন্দের মধ্যেও এই দিকটা নজরে রাখতে চাইবেন কোচ গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir)। তবে, রায়পুরে ঈশান কিশানের ঝড় আর সূর্যকুমার যাদবের সূর্যোদয়ে ভারত শুধু ম্যাচই জেতেনি, পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছে, দেশের মাটিতে এই দলকে হারানো কতটা কঠিন। সিরিজ়ে ২-০ এগিয়ে সূর্যবাহিনী এখন আত্মবিশ্বাসের শিখরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : T20 World Cup India Captain, Suryakumar Yadav | টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে ঈশ্বরের দ্বারস্থ সূর্যকুমার, বৈকুণ্ঠ একাদশীতে সস্ত্রীক তিরুপতিতে পুজো দিলেন




