সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে বড়সড় বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (European Union বা EU) প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি। দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনার পর অবশেষে এই চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানালেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেন (Ursula von der Leyen)। তাঁর কথায়, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন এমন একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্যচুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে, যার ফলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি বিশাল নতুন বাজার তৈরি হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজার বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হতে পারে।
মঙ্গলবার একটি বিবৃতিতে উরসুলা জানান, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহেই তিনি ভারত সফরে আসতে চলেছেন। দাভোস সফরের ঠিক পরেই নয়াদিল্লি আসার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের কথায়, ‘আমাদের এখনও কিছু বিষয় চূড়ান্ত করার কাজ বাকি রয়েছে, তবে আমরা এমন এক বাণিজ্যচুক্তির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, যাকে অনেকেই ‘সকল চুক্তির জননী’ বলে উল্লেখ করছেন।’ এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ইউরোপীয় নেতৃত্ব এই চুক্তিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।কূটনৈতিক সূত্রের খবর, আগামী ২৭ জানুয়ারি ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সই হতে পারে। তার আগে, ২৫ জানুয়ারি তিন দিনের সফরে ভারতে আসছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিয়ো লুই সান্তোস ডি কোস্টা (Antonio Luis Santos da Costa) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেন। ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে চলা ভারত-ইইউ সম্মেলনে যোগ দেবেন এই দুই শীর্ষ ইউরোপীয় নেতা। সম্মেলনের ফাঁকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) সঙ্গে তাঁদের পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি কৌশলগত অংশীদারি, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক নানা ইস্যু নিয়েও আলোচনা হবে বলে সূত্রের দাবি।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির পেছনে রয়েছে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ। এক দিকে চিনের (China) আগ্রাসী উৎপাদননীতি এবং একচেটিয়া বাজার দখলের কৌশল ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে, আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) -এর আমলে শুরু হওয়া উচ্চ শুল্কনীতির চাপ এখনও অনেকাংশে রয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজে নেওয়া ইইউ-এর কাছে অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। একই রকম সমস্যার মুখে রয়েছে ভারতও। ফলে দু’পক্ষের স্বার্থ এক জায়গায় এসে মিলেছে।ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের এক শীর্ষ সূত্রের দাবি, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দর কষাকষি এখনও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে রয়েছে। সেই কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত চুক্তি চূড়ান্ত করতে চাইছে নয়াদিল্লি। লক্ষ্য একটাই, মার্কিন শুল্কনীতির ফলে ভারতীয় রফতানিকারীরা যে ধাক্কা খাচ্ছেন, তা ইউরোপ ও ব্রিটেনের বাজারে রফতানি বাড়িয়ে কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া। বর্তমানে ভারতের মোট রফতানির প্রায় ১৭ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলিতে যায়। আমদানি হয় প্রায় ৯ শতাংশের সামান্য বেশি। এই পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ভারসাম্যে ভারতের অবস্থান তুলনামূলক ভাবে সুবিধাজনক।
তবে এই চুক্তি করতে গিয়ে সব ক্ষেত্রেই সমঝোতা হয়নি। জানা গিয়েছে, কৃষিপণ্যের মতো স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত ক্ষেত্রগুলি আপাতত চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রে শুল্কছাড় বা বাজার খুলে দেওয়া নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কৃষক স্বার্থ জড়িত থাকায় এই বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্র। অন্য দিকে, ইউরোপের আগ্রহ মূলত শিল্পপণ্য, পরিষেবা ক্ষেত্র, প্রযুক্তি, সবুজ শক্তি এবং ডিজিটাল বাণিজ্য ঘিরেই। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় শিল্পের সামনে নতুন সুযোগের দরজা খুলে যাবে। ইউরোপীয় বাজারে শুল্ক কমলে ভারতীয় ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং টেক্সটাইল শিল্প বিশেষ ভাবে লাভবান হতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় সংস্থাগুলির জন্যও ভারতের বিশাল ভোক্তা বাজার আরও সহজলভ্য হবে। ফলে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
প্রসঙ্গত, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে উল্লেখ। ২০০ কোটির বাজারকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহাসিক চুক্তি ভবিষ্যতে বিশ্ব বাণিজ্যের সমীকরণ কতটা বদলে দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Trump tariff on Europe, Greenland controversy NATO | গ্রিনল্যান্ড বিতর্কে আট বন্ধু দেশকেই শাস্তি! ইউরোপের উপর শুল্ক-খাঁড়া ট্রাম্পের, ২৫ শতাংশের হুঁশিয়ারিতে আন্তর্জাতিক উত্তাপ




