সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে (Gyanesh Kumar) অপসারণের প্রস্তাব আনার জন্য নোটিস প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ নিয়ে আইনি পরামর্শ নেওয়ার কাজও চলছে বলে বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’। এর আগে চলতি বছরের মার্চে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে সংসদের দুই কক্ষে নোটিস দিয়েছিল বিরোধী দলগুলি। লোকসভায় জমা দেওয়া নোটিসে ১৩০ জন সাংসদের স্বাক্ষর ও রাজ্যসভায় ৬৩ জনের স্বাক্ষর ছিল বলে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ। পরে এপ্রিল মাসে লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই নোটিসগুলি গ্রহণ করেননি। ওই দুই সিদ্ধান্তের কোনও কারণ প্রকাশ্যে জানানো হয়নি বলে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এবার ফের কেন এই উদ্যোগ? তার পেছনে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) অন্দরের কাজকর্ম নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সাঁধু (Sukhbir Singh Sandhu) আর বিবেক জোশী (Vivek Joshi) কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন, নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তি, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া, আবেদনপত্রের পরিবর্তন ও ভোটার তালিকার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় ছিল।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি ক্ষেত্রে দুই নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য ছিল, তাঁদের জানানো বা অনুমোদন ছাড়াই কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়াকে ঘিরে কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। নতুন ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন নিয়েও আপত্তি উঠেছিল। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, দুই নির্বাচন কমিশনার ওই পরিবর্তনকে অনুমোদনহীন বলে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে নির্বাচন কমিশনের তরফে প্রকাশিত অবস্থানও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ -এর কমিশন-সংক্রান্ত আপডেট অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ১৪টি নোটের অস্তিত্ব, তারিখ বা বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি তোলে না, তবে সেগুলিকে ‘পরামর্শ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, গত এক বছরে কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি ঐকমত্যের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। ফলে বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ও কমিশনের বক্তব্য, দুই দিকই এই বিতর্কের অংশ হয়ে রয়েছে।
বিরোধীদের নতুন পদক্ষেপের ক্ষেত্রে এসআইআর-ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই বিরোধী দলগুলির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের টানাপড়েন চলছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির পদ্ধতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। অন্য দিকে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনকে নির্বাচনী তালিকার নির্ভুলতা বজায় রাখার প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে কেন্দ্র সরকার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করে। সেই আইনে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটির কথা বলা হয়েছে। কমিটিতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্য, যাঁকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করেন। এর আগে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভারতের প্রধান বিচারপতির ভূমিকা ছিল, নতুন ব্যবস্থায় সেই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যকে রাখা হয়েছে।
এই নিয়োগ কাঠামো নিয়েও বিরোধীদের আপত্তি রয়েছে। জ্ঞানেশ কুমারই নতুন আইনের অধীনে নিয়োগ পাওয়া প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বলে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর কার্যকালের সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতও বেড়েছে। বিরোধী দলগুলি এই বিষয়গুলিকে একসঙ্গে তুলে ধরে তাঁর অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে জ্ঞানেশ কুমার বা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের রাজনৈতিক অভিযোগ এবং প্রমাণিত আইনি দায়, দুই বিষয়কে এক করে দেখা যায় না; অপসারণের প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট অভিযোগ ও সাংবিধানিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। আইনের দিক থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতো একই পদ্ধতি ও একই ভিত্তিতে অপসারণ করা যায়। ২০২৩ সালের ‘চিফ ইলেকশন কমিশনার অ্যান্ড আদার ইলেকশন কমিশনার্স অ্যাক্ট’-এর ১১ নম্বর ধারাতেও একই বিধান রয়েছে। সেখানে অপসারণের ক্ষেত্রে ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’ বা অক্ষমতার মতো সাংবিধানিক ভিত্তির বিষয়টি প্রযোজ্য।
প্রস্তাবটি সংসদে গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর নিয়ম। লোকসভায় কোনও অপসারণের নোটিস গ্রহণের জন্য অন্তত ১০০ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন। রাজ্যসভায় প্রয়োজন অন্তত ৫০ জন সাংসদের স্বাক্ষর। নোটিস গ্রহণ করা হলে অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে তদন্তের ব্যবস্থা হতে পারে। এরপর অপসারণের প্রস্তাব দুই কক্ষেই উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হতে হবে। সংসদের দুই কক্ষেই প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অপসারণ কার্যকর হয়। অর্থাৎ শুধু নোটিস জমা দেওয়া বা প্রয়োজনীয় সাংসদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করলেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো যায় না। প্রথমে নোটিস গ্রহণযোগ্য কি না, তার পর অভিযোগের তদন্ত এবং শেষে দুই কক্ষে নির্ধারিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা, প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিরোধীরা নতুন করে নোটিস দিলে সেটি সংসদের দুই কক্ষে কী অবস্থান নেয়, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
এখনও পর্যন্ত ভারতে কোনও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে এই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হয়নি। ফলে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের নতুন উদ্যোগ সফল ভাবে সংসদের পরবর্তী ধাপে পৌঁছয় কি না, সে দিকেই নজর থাকবে। আপাতত কংগ্রেস সূত্রের দাবি অনুযায়ী, দুই কক্ষের জন্য পৃথক নোটিস তৈরির কাজ চলছে এবং আইনি পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য, এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবি, এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই নতুন করে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। বিরোধী শিবিরের প্রস্তাব সংসদে আদৌ গৃহীত হয় কি না, নোটিসে কোন কোন অভিযোগ রাখা হয় ও পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কোন পথে এগোয়, এখন সেই প্রশ্নগুলির উত্তরই গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত জ্ঞানেশ কুমারই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন এবং নির্বাচন কমিশনের সরকারি তালিকাতেও তাঁর নাম সেই পদেই রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Uzbekistan Uranium Deal, PM Narendra Modi Tashkent | তাসখন্দে বড় চুক্তি মোদীর, উজবেকিস্তান থেকে দীর্ঘস্থায়ী ইউরেনিয়াম আনবে ভারত! সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত প্রধানমন্ত্রী




