সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : এক সময় রাস্তায় সাইকেল নিয়ে বেরলেই পরিচয় লুকোতে হত। মুখ ঢাকতে হত, পোশাক বদলে পুরুষের ছদ্মবেশ নিতে হত। কখনও উড়ে আসত পাথর, কখনও রাস্তায় বাধার মুখে পড়তে হত। সেই আফগানিস্তান ছেড়ে এক দিন পালাতে হয়েছিল প্রাণের ভয়েও। আর সেই দেশকেই কয়েক বছর পর এশিয়ান গেমসে রুপোর পদক এনে দিলেন ফারিবা হাশিমি (Fariba Hashimi)। ২৩ বছরের আফগান সাইক্লিস্টের এই যাত্রা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্ন আঁকড়ে থাকার! আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে (Aichi-Nagoya Asian Games) মহিলাদের রোড রেসে দ্বিতীয় হয়ে রুপো জিতেছেন ফারিবা। চিনের গুয়ো লি (Guo Li) সোনা পেয়েছেন ও হংকংয়ের লেউং উইং ই (Leung Wing Yee) জিতেছেন ব্রোঞ্জ। ফারিবার এই সাফল্য আফগানিস্তানের মহিলা ক্রীড়াবিদদের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ২০০২ সালের পর এশিয়ান গেমসে আফগানিস্তানের প্রথম মহিলা পদকজয়ী হয়েছেন তিনি। অলিম্পিক্সেও অংশ নেওয়া এই সাইক্লিস্ট এ বার এশিয়ান গেমসের মঞ্চে নিজের দীর্ঘ লড়াইয়ের একটি বড় স্বীকৃতি পেলেন।
আরও পড়ুন : Mirabai Chanu Asian Games Silver | ১২ বছরের অপেক্ষা শেষ! এশিয়ান গেমস-এ পদক মীরাবাইয়ের!
রুপো জেতার পরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ফারিবা জানিয়েছেন, এশিয়ান গেমসে আসার আগে তাঁর লক্ষ্য ছিল পোডিয়ামে ওঠা ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পরে আবেগ ধরে রাখা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর কথায়, ‘এই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’ একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এই পদক তাঁর একার নয়। আফগানিস্তানের বহু মহিলা যে নিজেদের জীবনে নানা স্বপ্ন নিয়ে এগোতে চান, তাঁদের কথাও তিনি মনে রেখেছেন। ফারিবার শৈশবের গল্প শুনলে এশিয়ান গেমসের রুপো আরও অন্য অর্থ বহন করে। উত্তর আফগানিস্তানের ফারিয়াব প্রদেশে (Faryab Province) বেড়ে ওঠা ফারিবা কৈশোরেই সাইক্লিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। নিজের সাইকেল ছিল না। বোন ইয়ুল্দুজ হাশিমির (Yulduz Hashimi) সঙ্গে প্রতিবেশীর কাছ থেকে সাইকেল ধার করে অনুশীলন করতেন। মেয়েদের সাইকেল চালানোকে ঘিরে সামাজিক বাধা ছিল এতটাই বেশি যে তাঁদের নিজেদের পরিচয় আড়াল করে রাস্তায় নামতে হত।
ফারিবা জানিয়েছেন, অনুশীলনে যাওয়ার সময় প্রায়ই তাঁকে ছেলের পোশাক পরতে হত। মুখও ঢেকে রাখতেন, যাতে কেউ তাঁকে চিনতে না পারে। কারণ পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেলে আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। কৈশোরে সাইক্লিং শেখার সেই সময় পাথর ছোড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বোন ইয়ুল্দুজও একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। এক বার রাস্তায় একটি রিকশা বা অটোর ধাক্কায় ইয়ুল্দুজের কব্জি ভেঙে যায়। তবু দুই বোন সাইক্লিং ছাড়েননি। ফারিবার কথায়, তাঁর নিজের কাছে সাইক্লিং ছিল মুক্তির অনুভূতি। সাইকেলে চড়ে তিনি নিজেকে পাখির মতো মনে করতেন। কিন্তু নিজের এলাকায় মেয়েদের জন্য সেই স্বাধীনতা স্বাভাবিক ছিল না। ফলে তাঁর স্বপ্ন পূরণের রাস্তা শুরু থেকেই সহজ ছিল না। পরিবারও উদ্বিগ্ন ছিল। মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে ফারিবার বাবা এক সময় তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, তাঁরা কি সত্যিই সাইক্লিং চালিয়ে যেতে চান। তাঁর ভয় ছিল, এই সিদ্ধান্তের জন্য মেয়েদের প্রাণহানিও ঘটতে পারে।
২০২১ সালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তালিবান (Taliban) আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পরে মেয়েদের শিক্ষা, চলাফেরা ও জনজীবনে অংশগ্রহণের উপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। খেলাধুলার ক্ষেত্রেও আফগান মহিলাদের সুযোগ ব্যাপক ভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। সেই সময় ফারিবা ও তাঁর বোন ইয়ুল্দুজকে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যেতে হয়। ইতালিতে (Italy) গিয়ে নতুন করে জীবন ও ক্রীড়াজীবন গড়ে তোলেন তাঁরা। ইতালিতে গিয়ে ফারিবার সাইক্লিং কেরিয়ারে নতুন দরজা খুলে যায়। প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আলেসান্দ্রা কাপেলোত্তো (Alessandra Cappellotto) -এর সহায়তা তাঁর পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে ইতালিতেই থাকেন এবং অনুশীলন করেন ফারিবা। তাঁর বোন ইয়ুল্দুজও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাইক্লিস্ট। দুই বোনই ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক্সে (Paris Olympics 2024) অংশ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ আফগানিস্তানের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া সেই গোপন সাইক্লিং ধীরে ধীরে তাঁদের নিয়ে গিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়ামঞ্চগুলির একটিতে।
প্যারিস অলিম্পিক্সে পদক না পেলেও ফারিবার যাত্রা থামেনি। এশিয়ান গেমসে আসার আগে মহিলাদের ব্যক্তিগত টাইম ট্রায়ালেও অংশ নেন তিনি এবং সপ্তম স্থান অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল রোড রেস। সেখানে ২২ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় হয়ে শেষ করেন তিনি। তাঁর সময় ছিল ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ৫ সেকেন্ড। চিনের গুয়ো লির সঙ্গে তাঁর সময় একই হলেও ফিনিশিংয়ের ব্যবধানে ফারিবা দ্বিতীয় হন। এই সাফল্যের আর একটি দিকও সামনে এসেছে। এশিয়ান গেমসে ফারিবার সঙ্গে থাকা আফগান দলের পরিকাঠামো খুব বড় ছিল না। নিজের সাইকেলের দেখভালের কাজও তাঁকে করতে হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, দলের সঙ্গে কোনও পূর্ণ সময়ের মেকানিক ছিলেন না। প্রয়োজন হলে নিজের সাইকেল নিজেই পরিষ্কার ও মেরামত করেছেন। জাপানি দলের সদস্যরাও তাঁকে সাইকেল সংক্রান্ত কাজে সহায়তা করেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। রুপোর পদক হাতে নিয়ে ফারিবা তাই নিজের অতীত ভুলে যাননি। সেই অতীতকেই সামনে রেখে তিনি আফগানিস্তানের মেয়েদের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি একা নন। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় থাকা বহু মহিলা একই ধরনের স্বপ্ন দেখেন এবং তাঁর সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের স্বপ্নের যোগ খুঁজে পান।
ফারিবার কাছে পদকটি আফগান মহিলাদের জীবনে নিজেদের পছন্দ এবং স্বপ্নের জায়গা থাকা উচি, এই দাবির সঙ্গেও তাঁর বক্তব্য জড়িয়ে রয়েছে। সবচেয়ে বড় স্বপ্ন অবশ্য এখনও বাকি। নিজের দেশে ফিরে এক দিন আফগানিস্তানের রাস্তায় সাইকেল চালাতে চান ফারিবা। আরও বেশি আফগান মহিলা যেন ভয় ছাড়াই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন, সেটাই তাঁর আশা। তিনি চান পরবর্তী প্রজন্মকে আর দেশ ছেড়ে পালাতে না হয়। আফগানিস্তানের মাটিতে থেকেই মেয়েরা খেলাধুলা করতে পারুক। উল্লেখ্য, ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সও এখন তাঁর পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। প্যারিসের অভিজ্ঞতার পরে এশিয়ান গেমসের রুপো তাঁকে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ফারিবার গল্পে পদকের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে সেই পথ, যে পথে এক সময় নিজের পরিচয় গোপন করে সাইকেল চালাতে হয়েছিল। সেই একই ক্রীড়াবিদ আন্তর্জাতিক মঞ্চে আফগানিস্তানের পতাকা হাতে পোডিয়ামে দাঁড়াচ্ছেন। যাই হোক, একটি ধার করা সাইকেল থেকে শুরু হয়েছিল পথচলা। পথে ছিল সামাজিক বাধা, আক্রমণের ভয়, দেশ ছাড়ার যন্ত্রণা এবং পরিবার থেকে দূরে থাকার দীর্ঘ সময়। তার পরও ফারিবা থামেননি। এশিয়ান গেমসের রুপো তাই তাঁর কেরিয়ারের একটি পদক হলেও, আফগানিস্তানের মেয়েদের জন্য তাঁর নিজের তৈরি পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকও হয়ে থাকল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women vs Japan Asian Games 2026, India women semi final Asian Games | ব্যাট হাতে নামতেই হল না হরমনপ্রীত-স্মৃতিকে, ৫ ওভারে জাপানকে উড়িয়ে এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে ভারত




