সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, আহমেদাবাদ ★ গুজরাট: হাতে ম্যারেজ সার্টিফিকেট থাকলেই হিন্দু বিবাহ আইনের চোখে একটি বিয়েকে বৈধ বলে ধরে নেওয়া যাবে না। হিন্দু রীতি মেনে বিবাহ অনুষ্ঠান হয়েছে কি না, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনই এক মামলার শুনানিতে তা জানিয়ে দিল গুজরাট হাইকোর্ট (Gujarat High Court)। আদালতের পর্যবেক্ষণ, শুধুমাত্র নথি তৈরি করলেই হিন্দু বিবাহ সম্পূর্ণ হয় না। সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় রীতি মেনে বিবাহের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি মামলায় ম্যারেজ সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও বিয়ের দাবি খারিজ করে দিয়েছে আদালত। ঘটনাটি ঘিরে মামলা শুরু হয়েছিল এক প্রবাসী ভারতীয়কে কেন্দ্র করে। যুক্তরাজ্যে কর্মরত ওই ব্যক্তির অভিযোগ, তাঁর কর্মস্থলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মেয়ে দাবি করেছেন যে তিনি নাকি ওই ব্যক্তির স্ত্রী। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই মহিলা আমেদাবাদে ওই ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে নিজেকে তাঁর আইনত বিবাহিত স্ত্রী বলে দাবি করেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে জানান, তাঁদের মধ্যে হিন্দু রীতি মেনে কোনও বিবাহ অনুষ্ঠানই হয়নি। এমনকি তাঁরা কখনও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে বসবাসও করেননি বলে তিনি দাবি করেন।
মামলাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ওই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তাঁর নামে থাকা বিয়ের নথিতে সই জাল করা হয়েছে। অর্থাৎ, যে নথির ভিত্তিতে ওই মহিলা বৈবাহিক সম্পর্কের দাবি করছেন, তার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আবেদনকারী। বিষয়টি প্রথমে আমেদাবাদের পারিবারিক আদালতে যায়। সেখানে শুনানির সময় ওই মহিলা লিখিতভাবে স্বীকার করেন যে তাঁদের মধ্যে হিন্দু শাস্ত্রীয় রীতি মেনে কোনও বিয়ে হয়নি। একসঙ্গে বসবাসের ঘটনাও ছিল না বলে মামলার নথিতে উঠে আসে। তবু পারিবারিক আদালত আবেদনকারী ব্যক্তির দাবি মেনে নেয়নি। বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে তাঁর আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে গুজরাট হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন ওই ব্যক্তি। তাঁর বক্তব্য ছিল, যখন বিবাহের মৌলিক অনুষ্ঠানই হয়নি বলে অপর পক্ষ নিজেই স্বীকার করছেন, তখন শুধু একটি ম্যারেজ সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে তাঁকে বিবাহিত বলে দেখানো যায় না।
মামলাটি শুনতে গিয়ে বিচারপতি ইলেশ জে. ভোরা (Justice Ilesh J. Vora) ও বিচারপতি আর. টি. বাছানি (Justice R. T. Bachani) -এর বেঞ্চ হিন্দু বিবাহের আইনি কাঠামো খতিয়ে দেখে। আদালত আবেদনকারী ব্যক্তির পক্ষেই রায় দেয় এবং ওই বিবাহের দাবি গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানায়। আদালতের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে ছিল হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (Hindu Marriage Act, 1955) -এর সংশ্লিষ্ট বিধান। আদালত জানায়, হিন্দু বিবাহকে কেবলমাত্র একটি প্রশাসনিক নথি বা লেনদেনের মতো দেখা যায় না। বিবাহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টির আইনি গুরুত্ব রয়েছে। কোনও ব্যক্তি বা দম্পতির কাছে একটি সার্টিফিকেট থাকলেই সেই নথি বিবাহের যাবতীয় শর্ত পূরণ করেছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
হিন্দু বিবাহ আইনের ৭ নম্বর ধারায় বিবাহের অনুষ্ঠান নিয়ে বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট রীতি ও প্রথা অনুসারে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার বিষয়টিকে সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেক হিন্দু বিবাহে অগ্নিসাক্ষী করে সাত পাক বা সপ্তপদীর মতো রীতি পালন করা হয়। কোন রীতি প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় ও প্রচলিত প্রথার উপর নির্ভর করতে পারে। তবে বিবাহের জন্য প্রযোজ্য রীতি অনুসারে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়া আইনি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দিকে, আইনের ৮ নম্বর ধারা বিবাহের নিবন্ধন সংক্রান্ত। আদালতের ব্যাখ্যায়, রেজিস্ট্রেশন মূলত সম্পন্ন হওয়া বিবাহের নথিভুক্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ বিবাহের মূল অনুষ্ঠানই যদি না হয়ে থাকে, শুধুমাত্র নিবন্ধনের কাগজ হাতে থাকলেই হিন্দু বিবাহের সব আইনি শর্ত পূরণ হয়ে যায় না।
এই মামলায় আবেদনকারীর বক্তব্যের সঙ্গে অপর পক্ষের লিখিত স্বীকারোক্তিও আদালতের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যিনি নিজেকে ওই ব্যক্তির স্ত্রী বলে দাবি করেছিলেন, তিনিই যখন জানাচ্ছেন যে হিন্দু রীতি মেনে বিবাহ অনুষ্ঠান হয়নি, তখন শুধুমাত্র ম্যারেজ সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই বলে আদালত সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখ্য, গুজরাট হাইকোর্টের এই রায় তাই হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠান, রীতি এবং নিবন্ধনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। আদালতের সিদ্ধান্তের মূল কথা হল, বিবাহ নিবন্ধনের নথি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি নিজে থেকে এমন কোনও সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না, যার জন্য আইনে নির্ধারিত মৌলিক শর্ত পূরণ হয়নি। ফলে হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে কেবল কাগজপত্র নয়, বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পদ্ধতিও আইনি বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকল।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Shreyas Iyer Backup, Gautam Gambhir World Cup Plan | শ্রেয়সের বিকল্প তৈরি করছে ভারত! বিশ্বকাপের আগে তিলককে নিয়ে বড় পরিকল্পনা গম্ভীর-আগরকরদের, নজরে অফ স্পিনও




