সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বেজিং:জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের পথে চিন। যুদ্ধ কিংবা বড় ধরনের জাতীয় সঙ্কট দেখা দিলে শুধু সামরিক বাহিনীর উপর নির্ভর না করে দেশের নাগরিক, বেসরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি সম্পদকেও প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহার করতে পারবে সরকার। এমনই বিধান রাখা হয়েছে সংশোধিত জাতীয় প্রতিরক্ষা আইনে। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের (Xi Jinping) নেতৃত্বাধীন সরকারের এই পদক্ষেপ ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চিনের কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত একদলীয় সংসদ ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস (National People’s Congress) গত ২৮ আগস্ট জাতীয় প্রতিরক্ষা আইনের সংশোধনী অনুমোদন করেছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে সংশোধিত আইন কার্যকর হওয়ার কথা। নতুন বিধানে জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রয়োজন হলে সরকার দেশের বিভিন্ন নাগরিক সম্পদ ও সামাজিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সম্পদ ব্যবহার কিংবা অধিগ্রহণের পথও রাখা হয়েছে।
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে সরকারের নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে নাগরিক ও সংস্থাগুলির উপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। সরকারি পদক্ষেপে কেউ বাধা দিলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধ বা বড় জাতীয় সঙ্কটের সময়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শুধু সেনাবাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং নাগরিক পরিকাঠামোকেও তার সঙ্গে যুক্ত করার কাঠামো তৈরি করছে বেজিং। সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের (ANI) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশোধিত জাতীয় প্রতিরক্ষা আইনে রয়েছে ১৪টি পর্ব এবং ৮২টি অনুচ্ছেদ। পুরনো কাঠামোর তুলনায় নতুন বিধানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার দিকটি গুরুত্ব পেয়েছে। যুদ্ধের প্রচলিত প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা এবং আধুনিক সামরিক সক্ষমতার বিভিন্ন ক্ষেত্রকেও আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence), ড্রোন প্রযুক্তি, মহাকাশ প্রযুক্তি ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রকে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে চিনের প্রতিরক্ষা নীতিতে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা যে ক্রমশ বাড়ছে, সংশোধিত আইনের কাঠামোতেই তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে। নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য নির্ধারণ থেকে শুরু করে সামরিক অভিযানের একাধিক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। মহাকাশ প্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তিও আগামী দিনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এই ক্ষেত্রগুলিকে জাতীয় প্রতিরক্ষা আইনের আওতায় এনে চিন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির কাঠামো তৈরি করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রতিরক্ষা নিয়ে পর্যবেক্ষণকারীদের একাংশ।
আইনের এই সংশোধন শুধু সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অর্থনৈতিক ও বেসরকারি ক্ষেত্রকেও জাতীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে পরিবহণ, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন কিংবা অন্যান্য নাগরিক পরিকাঠামো কী ভাবে কাজে লাগানো হবে, সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই নতুন বিধানকে দেখা হচ্ছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দিকে তাকিয়েও চিনের এই পদক্ষেপ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে চিনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, অন্য দিকে তাইওয়ানকে ঘিরে বেজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা প্রভৃতি সবকিছুর মধ্যেই চিন নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পথে এগোচ্ছে। তাই নতুন আইনকে কেন্দ্র করে তাইওয়ান নিয়েও নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চিন। অন্য দিকে, তাইওয়ানের নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে ও দ্বীপটির নিরাপত্তার সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে ঘিরে চিন ও আমেরিকার মধ্যে টানাপড়েন চলছে। সেই পরিস্থিতিতে চিনের প্রতিরক্ষা আইনে নাগরিক ও বেসরকারি সম্পদকে প্রয়োজনে জাতীয় প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু সংশোধিত আইনকে সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসাবে দেখার আগে এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করা প্রয়োজন। আধুনিক যুদ্ধ ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। সাইবার হামলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, মহাকাশ ব্যবস্থা এবং তথ্যযুদ্ধ এখন সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চিনের নতুন আইন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে খাপ খাওয়ানোর উদ্যোগ হিসাবেও দেখা হচ্ছে। আগামী ১ অক্টোবর সংশোধিত আইন কার্যকর হওয়ার পর জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে সরকার কী ভাবে বেসরকারি ক্ষেত্র এবং নাগরিক সম্পদকে কাজে লাগায়, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেজিং আগামী দিনে কতটা দ্রুত এগোয়, তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। চিনের জাতীয় প্রতিরক্ষা আইনের এই পরিবর্তন তাই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কৌশলগত সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Uzbekistan Uranium Deal, PM Narendra Modi Tashkent | তাসখন্দে বড় চুক্তি মোদীর, উজবেকিস্তান থেকে দীর্ঘস্থায়ী ইউরেনিয়াম আনবে ভারত! সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত প্রধানমন্ত্রী




