প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : ভিগান ডায়েট এখন জীবনযাপনের দর্শন হয়ে উঠছে, এমনটাই মনে করছেন বহু তারকা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং প্রাণীকল্যাণ, এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে ভিগান জীবনধারা। সেই তালিকায় নতুন সংযোজন বলিউড অভিনেত্রী জেনেলিয়া ডি’সুজা (Genelia D’Souza)।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে জেনেলিয়া জানান, শরীরের কথা ভেবেই তিনি ধীরে ধীরে মাছ-মাংস এবং পরে সমস্ত প্রাণিজ উপাদান পরিত্যাগ করে ভিগান হয়ে উঠেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, এই পরিবর্তনের ফলে শরীর ও মনের উপর পড়েছে ইতিবাচক প্রভাব।

সোহা আলি খানের (Soha Ali Khan) ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেনেলিয়া জানান, ২০১৭ সালেই তিনি আমিষ খাবার ছেড়ে নিরামিষভোজী হন। তবে সেই সময় তিনি পুরোপুরি ভিগান ছিলেন না।
অভিনেত্রীর কথায়, ‘২০১৭ সাল থেকেই আমি মাংস খাওয়া বন্ধ করি। তখন আমি নিরামিষাশী হয়েছিলাম, কিন্তু পুরোপুরি ভিগান ছিলাম না। দুধ, পনির খেতাম, মাঝেমধ্যে ডিমও থাকত। ভিগান হওয়ার সিদ্ধান্তটা মূলত নিজের স্বার্থেই নিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম, এতে শরীর ভাল থাকবে।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সিদ্ধান্ত আরও গভীর হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ ভিগান জীবনধারা মেনে চলছেন।জেনেলিয়া জানান, তিনি জন্মেছেন একটি আমিষভোজী পরিবারে। ফলে নিরামিষ বা ভিগান খাবার সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল খুবই সীমিত। অভিনেত্রীর বক্তব্য, ‘নিরামিষ খাবার বলতে আমি একসময় শুধু আলু, মটরশুঁটি আর পনিরকেই বুঝতাম। কিন্তু নিরামিষাশী হওয়ার পর বুঝলাম, এই খাদ্যাভ্যাস কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে।’
জেনেলিয়া নিজেকে একজন প্রাণীপ্রেমী বলেও উল্লেখ করেন। তবে আগে মাংস খেতে ভালবাসলেও মা হওয়ার পর তাঁর মানসিকতায় বড় পরিবর্তন আসে। জেনেলিয়ার কথায়, ‘মা হওয়ার পর থেকেই কোনও প্রাণীকে মেরে খাওয়ার ভাবনাটা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ভিগান হওয়ার দিকে আমার ঝোঁক বাড়ে।’

এই পরিবর্তনের প্রভাব শরীরেও স্পষ্টভাবে টের পেয়েছেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, ‘আমিষ ও দুগ্ধজাত খাবার ছেড়ে দেওয়ার পর থেকেই শরীরে ইতিবাচক বদল দেখতে শুরু করি। খাওয়ার পর নিজেকে অনেক হালকা লাগত, হজমের কোনও সমস্যা হত না।’
জেনেলিয়ার মতে, ভিগান ডায়েট তাঁকে শুধু শারীরিক স্বস্তিই দেয়নি, মানসিকভাবেও আরও সচেতন ও শান্ত করেছে।উল্লেখ্য, কোভিড-১৯ অতিমারির সময় থেকেই জেনেলিয়া এবং তাঁর স্বামী রীতেশ দেশমুখ (Riteish Deshmukh) সম্পূর্ণভাবে প্রাণিজ খাবার ত্যাগ করেন। শুরুতে সিদ্ধান্তটি ছিল স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ থেকেই। তবে ধীরে ধীরে পরিবেশ ও প্রাণী সুরক্ষার বিষয়টিও তাঁদের ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জেনেলিয়া বলেন, ‘প্রথমদিকে এটা ছিল একেবারেই শরীরের কথা ভেবে নেওয়া সিদ্ধান্ত। পরে পরিবেশ এবং প্রাণীদের সুরক্ষা নিয়ে আমি আরও সচেতন হয়ে উঠি। প্রথম বছরে আমি সব নিয়ম নিখুঁতভাবে মানতে পারিনি, এখনও আমি নিখুঁত নই। কিন্তু প্রতিদিন শিখছি এবং চেষ্টা করছি।’

উল্লেখ্য যে, ভিগান ডায়েট নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন হল, পুষ্টির ঘাটতি। এ প্রসঙ্গে পুষ্টিবিদ কিনিতা প্যাটেল করিয়ে দেন, খাদ্যাভ্যাস যাই হোক না কেন, ভুলভাবে অনুসরণ করলে ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাঁর বক্তব্য, ‘এখন মাংসাশীদের মধ্যেও ভিটামিন বি-১২-এর ঘাটতি দেখা যায়। তাই এটি শুধুমাত্র ভিগান হওয়ার কারণে হয়, এমনটা বলা ঠিক নয়। যে কোনও ডায়েট অনুসরণ করার আগে নিয়মিত প্যাথোলজি পরীক্ষা, রিপোর্ট বিশ্লেষণ এবং ক্লিনিক্যাল ডেটা দেখা জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভিগান খাবার সব পুষ্টি জোগাতে নাও পারে, কিন্তু প্রয়োজনে সঠিক সাপ্লিমেন্ট নিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। এর জন্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ অবশ্যই দরকার।’
অন্যদিকে, জেনেলিয়ার অভিজ্ঞতা নতুন করে আলোচনায় এনেছে ভিগান ডায়েটের উপকারিতা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনায় ভিগান খাদ্যাভ্যাস মানলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমতে পারে, হজমশক্তি উন্নত হয় এবং শরীরের প্রদাহজনিত সমস্যা হ্রাস পায়। পাশাপাশি পরিবেশগত দিক থেকেও ভিগান জীবনধারা কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে সাহায্য করে, এমনটাই দাবি করা হয় বিভিন্ন গবেষণায়।
বলিউডে জেনেলিয়া একা নন। বিরাট কোহলি (Virat Kohli), সোনম কপূর (Sonam Kapoor), রিচা চড্ডা (Richa Chadha), অক্ষয় কুমার (Akshay Kumar) -এর মতো তারকারাও ভিগান বা উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তবে জেনেলিয়ার বক্তব্যে যে বিষয়টি আলাদা করে নজর কেড়েছে, তা হল তাঁর সততা, নিজেকে ‘নিখুঁত’ না বলে প্রতিদিন শেখার প্রক্রিয়ার কথা স্বীকার করা। ভিগান ডায়েট নিয়ে জেনেলিয়া ডি’সুজার অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। শরীরের যত্ন, পরিবেশের দায়িত্ব এবং প্রাণীদের প্রতি সহমর্মিতা, এই তিনের সমন্বয়েই যে একটি সচেতন জীবনধারা গড়ে তোলা সম্ভব, সেটাই যেন অভিনেত্রীর অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India steel industry protection | দেশীয় শিল্প রক্ষায় কড়া পদক্ষেপ! চিনের সস্তা ইস্পাত ঠেকাতে তিন বছরের জন্য আমদানিতে শুল্ক চাপাল ভারত




