সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গে আয়োজিত দু’দিনের জি২০ সম্মেলনে (G20 Summit) একাধিক বিশ্বনেতা উপস্থিত থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বয়কট’ ঘোষণা করায় আন্তর্জাতিক মহলে নজর ছিল শূন্যস্থানে কারা প্রভাব বিস্তার করবেন সেই দিকে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেছিলেন, ট্রাম্পের অনুপস্থিতিতে মঞ্চ জুড়ে নিজের কূটনৈতিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের সুযোগ নিতে পারেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙ (Xi Jinping)। কিন্তু সেই সম্ভাবনা খানিক ব্যাহত করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। সমগ্র সম্মেলনের প্রারম্ভেই তিনি জোরালোভাবে তুললেন আন্তর্জাতিক মাদক-সন্ত্রাসের ইস্যু, বিশেষ করে বিশাল বিতর্কিত মাদক ‘ফেন্টানিল’-এর দাপটের প্রসঙ্গ।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারত অভিযোগ করে এসেছে, পাকিস্তান (Pakistan) সীমান্ত এলাকা, বিশেষত পাঞ্জাবের মাধ্যমে নিয়ম করে মাদক পাচারের চেষ্টা চালায়। বিএসএফ সীমান্তে ড্রোন আটকানোর ঘটনাগুলো এই আশঙ্কাকে বহুবার সত্য প্রমাণ করেছে। গোয়েন্দাদের দাবি, অস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোনে করে মাদকও পাঠানো হয় পাকিস্তানের দিক থেকে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে মোদীর বার্তা নিঃসন্দেহে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে সরাসরি ইঙ্গিতবহ।এবার মোদীর বক্তৃতায় উঠে এসেছে আরও কঠোর এক নাম, ফেন্টানিল (Fentanyl)। এই সিন্থেটিক ড্রাগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ এক মহামারির জন্ম দিয়েছে। বেদনানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, মাদক হিসেবে এর প্রভাব হেরোইনের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ফেন্টানিল আমেরিকায় সঙ্কট তৈরি করেছে দাবি করে তিনি প্রকাশ্যেই বহুবার দায় চাপিয়েছেন চিনের ওপর। তাঁর অভিযোগ ছিল, চিন থেকেই এই মাদক আমেরিকায় ঢুকছে। ফলে মোদীর মুখে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফেন্টানিলের নাম উচ্চারিত হওয়া শুধুমাত্র মাদক-বিরোধী বার্তাই নয়, বরং তা ঘুরিয়ে চিনের বিরুদ্ধেও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
প্রারম্ভিক বক্তব্যের একটি অংশ পরে নিজের সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন মোদী। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে লেখেন, “মাদক পাচারের চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে ফেন্টানিলের মতো ভয়ংকর মাদকের ছড়িয়ে পড়া রুখতে এবং মাদক-সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে আনতে জি২০ গোষ্ঠীকে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে ভারত প্রস্তাব রেখেছে।” তিনি আরও জোর দেন, মাদক-সন্ত্রাসের পেছনে থাকা অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে জি২০ দেশগুলিকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
জি২০ -এর এ বছরের সম্মেলন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই প্রথম আফ্রিকা মহাদেশে অনুষ্ঠিত হল এই সম্মেলন। এবং ঠিক এই সময়েই ভারত তার সভাপতিত্বের পরবর্তী কৃতিত্ব হিসেবে স্মরণ করিয়ে দিল আফ্রিকান ইউনিয়নকে (African Union) জি২০ -এর স্থায়ী সদস্য করে তুলতে নয়াদিল্লির ভূমিকার কথা। জোহান্সবার্গের মঞ্চ থেকে মোদী প্রস্তাব দেন, জি২০ দেশগুলো মিলিতভাবে একটি ‘নলেজ ভল্ট’ বা জ্ঞানের ভান্ডার তৈরি করুক, যেখানে প্রতিটি দেশের নিজস্ব ঐতিহ্য, উন্নয়ন মডেল ও স্বকীয় অভিজ্ঞতা সংরক্ষিত থাকবে। তাছাড়া কোনও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়, দুর্যোগ বা মহামারির মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে একটি ‘হেলথকেয়ার রেসপন্স টিম’ গঠনের কথাও বলেন তিনি। তার বক্তব্য, “জি২০ -এর সদস্য দেশগুলির বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এমন একটি দল থাকলে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে জরুরি পরিস্থিতিতে তা দ্রুত পাঠানো সম্ভব হবে।” কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে এই প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন এই সম্মেলন বর্জন করলেন তা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে বিভিন্ন জল্পনা। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা (Cyril Ramaphosa) -এর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েই এই পদক্ষেপ। তবে তার অনুপস্থিতিতে জি২০ -এর মঞ্চে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চর্চিত হল, তা হল মোদীর কঠোর সুরে দেওয়া মাদক-সন্ত্রাস বিরোধী বার্তা। যদিও কোনও দেশের নাম তিনি উল্লেখ করেননি, তবুও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফেন্টানিলের প্রসঙ্গ তোলা নিঃসন্দেহে একটি পরোক্ষ কূটনৈতিক সংকেত। যে সংকেতের সমান্তরাল দুই দিক, পাকিস্তানকে সীমান্ত-মাদক পাচার ঠেকাতে চাপ দেওয়া, এবং চিনকে বেআইনি ফেন্টানিল বাণিজ্যে নীরব ভূমিকার জন্য সতর্ক করা। জি২০ সম্মেলনের এই সূচনা তাই শুধু আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মন্ত্র নয়, তা মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট বৈশ্বিক অবস্থান, যেখানে ভারত তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করল আরও একবার।
ছবি সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India own space station | PM Narendra Modi : ভারত তৈরি করবে নিজস্ব স্পেস স্টেশন, ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




