Sasraya News Sunday’s Literature Special | 23rd November 2025, Sunday | Edition 88| সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ২৩ নভেম্বর ২০২৫, রবিবার | সংখ্যা ৮৮

SHARE:

সম্পাকীয়

ময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বাহ্যিক পরিবর্তন এক নতুন কথা নয়। তবুও নতুন কারণ পুরনো মানুষ যেতে যেতেই আবার নতুনের আগমন ঘটে। এই যাওয়া আসার মাঝেই আছে টানাপোড়েন। ভালবাসার মধ্যে প্রকৃতি যখন সুন্দর হয়ে উঠে তখন সমস্ত প্রেম নীরব ও স্থির হয়ে যায় ফলে জীবনের চাওয়া পাওয়ার কোনও আড়ম্বর থাকে না। মনের ইচ্ছে এত দ্রুত কাজ করে যে সেখানে কোনও বিপরীত শক্তি প্রবেশ করতেই পারবে না। আসলে আমাদের ভিতরে আত্ম-অহংকার রাগ এত এত বেশি যে নিরলস ভালবাসাকে প্রেমে রূপান্তর করতে পারি না। এগুলো আমাদের সমাজের এক বিশেষ ভুল ক্রিয়া যেখানে আমিই মানে আমিত্ম যোগ এতই বেশি করে দেখি, সেখানে প্রেমের মৃত্যু ঘটে। মা-বাবার প্রেম, বন্ধু-স্বজনের প্রেম, আত্মীয়-পরিজনের প্রেম, সমাজের প্রেম, প্রকৃতির প্রেম এইভাবে প্রেম ভাগ হয়ে যায়।

বিশেষভাবে প্রেম যে এক উত্তরণ অভিন্ন চরম শক্তি তা ভুলে গিয়ে বিভাজন লিপ্ত হয়ে যায়। ফলে, আমার – আমার বিষয়ে প্রবেশ করেছি এই স্বয়ংতা আমাদের পরমতাকে নষ্ট করে দেয়। যদিও এই বিষয়ে ভালবাসা প্রেম এই বিষয়জনিত ভিন্ন শব্দে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে বা হয়। তাই ভালবাসা ও প্রেমের ব্যখ্যা ভারতীয় ভাষা বিশেষ করে সংস্কৃত হিন্দী বাংলা… ভাষা ছাড়া এর উদাহরণ আর অন্য কোনও ভাষায় ভালভাবে পাওয়া যায় না।🍁

 

 

 

🍂মহামিলনের থা

গুরু। আজ তোমাকে ভক্ত নামদেবজীর কথা বলিতেছি, শোন।

জন্মান্তরের পুণ্যফলে নামদেবের শ্রীনামের উপর অত্যন্ত বিশ্বাস হয়। বাল্যকাল হইতেই সর্বদা ‘বিটঠল’, ‘বিটঠল’ জপ করিতেন, জিহ্বা ‘রাম কৃষ্ণ হরি’ নাম নিয়ত ঘোষণা করিত৷ বাল্যে তাঁহার সরল বিশ্বাস, আকুল আহ্বানে ঠাকুরটী স্থির থাকিতে না পারিয়া তাঁহার দত্ত দুগ্ধ পান করিয়াছিলেন৷ ক্রমে তিনি একজন খুব বড় ভক্ত বলিয়া খ্যাতিলাভ করেন। এইরূপ জনশ্রুতি আছে— ভগবান বিটঠলদেব তাঁহার সহিত কথা কহিতেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

একবার কাশী প্রভৃতি তীর্থ ভ্রমণ করিয়া নিবৃত্তিনাথ, জ্ঞানেশ্বর, সোপানদেব, মুক্তাবাঈ, নামদেব ও অন্যান্য সাধুগণ গোরাকুমারের বাটীতে আগমন করেন। সাধুগণ উপবিষ্ট আছেন— সেখানে একটি থুপী পড়িয়াছিল, মুক্তাবাঈ জিজ্ঞাসা করিলেন— চাচাজী এটি কি জিনিষ?
গোরা বলিলেন— এটি থুপী।
মুক্তা বলিলেন— এতে কি হয়?
গোরা বলিলেন— এতে মাটীর ঘট ঠুকে দেখা হয় ঘট কাঁচা কি পাকা।

মুক্তাবাঈ রহস্য করিবার জন্য বলিলেন— আমরা তো সকলেই ঘট, একবার দেখুন না চাচা কে কাঁচা কে পাকা? আমাদেরও কাঁচা-পাকা জানা যাবে না?
গোরা ‘হাঁ’ বলিলেন ৷

সাধুগণ কৌতুক দেখিবার জন্য নীরবে হাস্য করিতে লাগিলেন। গোরাকুমার প্রত্যেকের মাথায় থুপীর দ্বারা দুই চারিবার আঘাত করত বলিলেন— না, এ পাকা৷
নামদেব ইহাতে নিজের এবং সাধুগণের অপমান বিবেচনা করিয়া ক্রুদ্ধ হইলেন ও বলিলেন— “খবরদার, তুমি ও থুপী আমার মাথায় দিও না, দিলে ভাল হইবে না, একি অন্যায় ব্যাপার?”
গোরা অন্যান্য সাধুগণের মাথায় থুপী ঠুকিয়া থপ্ থপ্ করিয়া নামদেবের মাথায় থুপী ঠুকিতে লাগিলেন৷ নামদেব অত্যন্ত বিরক্ত হইলেন। তখন গোরাজী বলিলেন— সাধুর মধ্যে এই ঘড়া কাঁচা! নামদেবকে বলিলেন— নামদেব! তুমি ভক্ত হইলেও এখনও তোমার অভিমান যায় নাই, যতদিন পর্য্যন্ত তুমি গুরুর শরণ গ্রহণ না করিবে ততদিন এইরূপ কাঁচাই থাকিবে৷ এইরূপ অপমানিত হইয়া তাঁহার অত্যন্ত দুঃখ হইল, তিনি পণ্ঢরপুর আসিয়া শ্রীবিটঠলদেবকে দুঃখের কথা নিবেদন করিলেন৷ বিটঠলদেব বলিলেন— গোরাজী যাহা বলিয়াছে তাহা সত্য, যতদিন পর্যন্ত তুমি গুরুশরণ গ্রহণ না করিবে ততদিন কাঁচাই থাকিবে৷ আমি তো তোমার সঙ্গে সর্ব্বদা আছি তাহা হইলেও কোন মানুষ-দেহধারী পুরুষকে গুরু স্বীকার করত তাঁহার সম্মুখে নত হইতে হইবে৷ উহার চরণে আপনার অহঙ্কার লীন করিতে হইবে৷ তুমি বিসোবা-খেচরকে গুরুরূপে বরণ কর৷

শিষ্য। ভগবৎসাক্ষাৎকার লাভ হইয়াছে, শ্রীভগবানের সহিত সর্ব্বদা কথাবার্ত্তা হইতেছে, তথাপি গুরুর প্রয়োজন?
গুরু৷ নামদেব সগুণ ভক্ত ছিলেন৷ বিটঠলদেবই ভগবান এতদতিরিক্ত ভগবদবিষয়ক আর কোন জ্ঞান ছিল না৷
শিষ্য৷ তারপর নামদেব কিভাবে গুরুলাভ করেন?
গুরু৷ শ্রীপাণ্ডুরঙ্গের আদেশে তিনি বিসোবা-খেচরের নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলেন ভাবী গুরুদেব এক শিবলিঙ্গের উপর চরণ স্থাপন করত শায়িত আছেন। অবশ্য নামদেব আসিতেছেন জানিয়াই এইরূপভাবে শয়ন করিয়াছিলেন। নামদেবকে দেখিয়া বলিলেন— “ওরে নামিয়া, আমি বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছি, আমার চরণ উঠিতেছে না, তুমি এক কাজ কর, ইহাকে এমন স্থানে রাখ যেখানে শিবলিঙ্গ নাই৷” নামদেব তাঁহার চরণ লইয়া যেস্থানে স্থাপন করিলেন সেই স্থানে শিবলিঙ্গ দেখিয়া অপর স্থানে রাখিলেন৷ সেই স্থানে শিবলিঙ্গ দর্শনে বিস্মিত হইয়া অন্যস্থানে রক্ষা করিলেন ৷ আট দিকের যে যে স্থানে চরণ রাখেন সেই সেই স্থানে শিবলিঙ্গের আবির্ভাব দর্শনে নামদেব শ্রীগুরুদেবের মহিমা বুঝিতে পারিয়া চরণ দুইটী দৃঢ়ভাবে বক্ষে ধারণ করত শরণ গ্রহণ করিলেন, নয়নজলে তাঁহার চরণ সিক্ত করিয়া দিলেন৷ বিসোবা মহারাজের কৃপা হইল,তিনি নামদেবের স্বরূপ সাক্ষাৎ করাইয়া দিলেন।🍁 [বানান সসম্পূর্ণ অপরিবর্তিত। — সম্পাদকমণ্ডলী]

🍁শ্রীশ্রীগুরুমহিমামৃত | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

🍂ধারাবাহিক উন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

৮.

মধ্যাহ্নের দিনরাত্রি 

দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল। একসময় যে দিনগুলো শুধু টিউশন, বাজার আর একঘেয়ে খাতার মধ্যে আটকে থাকত, সেগুলো এখন যেন নতুন কোনও স্রোত বয়ে আনছিল। হিরণ্যর মনে হচ্ছিল, তার জীবনে আবার আলো নেমে আসছে। আলোটা কোথা থেকে আসছে? হয়ত কবিতা কর্নারের সেই গান থেকে, হয়তো মীরার কণ্ঠ থেকে, হয়ত অবাধ্য পায়ের অদৃশ্য টান থেকে।

মীরা অবাক হয়ে তাকাল। তারপর মৃদু স্বরে বলল,
–আপনি এখনও কারও ছায়া বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাই না?
হিরণ্য চোখ নামিয়ে নিল। উত্তর দিল না। কিন্তু বুকের ভেতর গুঞ্জন চলল, হ্যাঁ, আমি এখনও অরুণিমার ছায়া বয়ে বেড়াচ্ছি।
বাড়ি ফেরার পথে অবাধ্য পা যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অন্যদিকে। মনে হচ্ছিল, একদিকে মীরা, অন্যদিকে অরুণিমা- দু’জনেই যেন তাকে ডাকছে। পা থামছে না, পথ থামছে না।

টিউশন থেকে ফেরার পথে মাঝে মাঝেই সে কবিতা কর্ণারে ঢুঁ মেরে আসত। সেখানে গেলে মীরাকে প্রায়ই পাওয়া যেত, কখনও রিহার্সালে, কখনও চুপচাপ বসে গান শুনছে, কখনও নিজের ডায়েরিতে কিছু লিখছে। অদ্ভুত এক স্বাভাবিক ভঙ্গি ছিল মেয়েটির মধ্যে, যেন সে কারও কাছ থেকে কিছু চায় না, তবু চারপাশে একধরনের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়।
প্রথম দিকে হিরণ্য শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। পরে ধীরে ধীরে কথাবার্তা শুরু হলো। মীরা হেসে বলল,
–আপনার কবিতার খাতাটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন? নিশ্চয়ই আছে।
হিরণ্য একটু হেসে জবাব দিল,
–লুকনো বললে ভুল হবে, ওগুলো আসলে কবর হয়ে আছে।
মীরা চোখ বড় বড় করে বলল,
–কবর খুঁড়ে আলো বের করতে হয়। ওটাই তো আসল কাজ।
শব্দগুলো হিরণ্যর বুকের ভেতর ঝাঁকুনি দিল। এতদিন ধরে যে কথাটা সে নিজেকে বলতে পারেনি, আজ অন্য কারও কণ্ঠে শুনে মনে হল, সত্যিই তো, শব্দ মরতে পারে না, ওরা শুধু ঘুমোয়।
একদিন সন্ধ্যেবেলা তারা দু’জনে চায়ের দোকানে বসেছিল। মীরা হাসতে হাসতে বলল,
–আপনার কবিতা শুনে মনে হয়, আপনি অনেক গভীরে গিয়েছিলেন একসময়। কিন্তু হঠাৎ থেমে গেলেন কেন?
হিরণ্য দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
–কারও চোখের জন্য লিখতাম। সেই চোখ একদিন হারিয়ে গেল। তাই লিখতেও থেমে গেলাম।
মীরা তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর নরম গলায় বলল,
–চোখ চলে যেতে পারে, কিন্তু শব্দ তো থেকে যায়। আপনি শব্দকে কেন শাস্তি দিলেন?
এই প্রশ্নে হিরণ্য নির্বাক হয়ে গেল। মনে হল, অরুণিমার মুখের ওপর মীরার মুখ বসে গেছে। অরুণিমা বলেছিল, আমাদের ছবিগুলো মুছে দিও। আর মীরা বলছে,
–শব্দকে কেন শাস্তি দিলেন? দু’টো প্রশ্ন যেন আঘাত করল ভেতরে।
সেই রাতেই হিরণ্য আবার লিখতে বসল। লিখল,
‘তুমি চোখ হারালে, আমি শব্দ হারালাম,
কিন্তু পা অবাধ্য থেকে গেল,
আমাকে টেনে আনল আবার আলোর দিকে।’
কলম থেমে থেমে কাঁপছিল, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছিল অবিরাম। মনে হচ্ছিল, অবাধ্য পা আবার তাকে কবিতার পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু যতই মীরার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল, অরুণিমার স্মৃতিও ততই তীব্র হয়ে উঠছিল। হিরণ্য মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করলেই দেখত, অরুণিমা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে সেই অপার অভিযোগ। ‘তুমি কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেলে?’
এ দ্বন্দ্বে হিরণ্যর দিন কেটে যাচ্ছিল। মীরার সঙ্গে কথা বললে তার ভেতরে আলো জাগত, আর রাত হলেই অরুণিমার ছায়া এসে বুক চেপে ধরত।
একদিন কবিতা কর্ণারে মীরা গান গাইছিল। গানের লাইনগুলো ছিল,
‘অতীতের ছায়া যদি আজও আমাকে ডাকে,
আমি কোথায় যাবো, কার কাছে ফিরব?’
হিরণ্যর চোখ ভিজে উঠল। মনে হল, গানটা যেন তার জন্যই লেখা। মীরা গাইছে, কিন্তু শব্দগুলো অরুণিমার ঠোঁট থেকে বেরোচ্ছে।
অনুষ্ঠান শেষে মীরা এগিয়ে এসে বলল,
–আপনি খুব চুপচাপ হয়ে গেলেন। গানটা ভাল লাগেনি?
হিরণ্য ম্লান হেসে বলল,
–ভাল লাগল, এতটাই যে সহ্য করতে পারলাম না।
মীরা অবাক হয়ে তাকাল। তারপর মৃদু স্বরে বলল,
–আপনি এখনও কারও ছায়া বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাই না?
হিরণ্য চোখ নামিয়ে নিল। উত্তর দিল না। কিন্তু বুকের ভেতর গুঞ্জন চলল, হ্যাঁ, আমি এখনও অরুণিমার ছায়া বয়ে বেড়াচ্ছি।
বাড়ি ফেরার পথে অবাধ্য পা যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অন্যদিকে। মনে হচ্ছিল, একদিকে মীরা, অন্যদিকে অরুণিমা-
দু’জনেই যেন তাকে ডাকছে। পা থামছে না, পথ থামছে না।
সে বুঝতে পারছিল না, এই টান তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। 🍁(চলবে)

 

 

🍂ট্রাভেলগ 

 

শিবখোলার দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, এখানে প্রকৃতি এখনও ততটাই সতেজ, যতটা হয়ত দশ বছর আগে ছিল। মানুষের ভিড় নেই, বাজারের কোলাহল নেই, নেই কোনও অযথা কংক্রিটের দখল। যেন প্রকৃতি নিজের মতো করে নিঃশব্দে বেঁচে আছে। সন্ধ্যে নামতেই পাহাড়ি পথটাও যেন অন্য রূপ ধারণ করল। হালকা কুয়াশা আর আলত শীতল হাওয়ায় নুরবাং চা-বাগানের আলো-ছায়ার খেলা যেন মোহময়ী।

 

শিবখোলা ভ্রমণ: নুরবাং চা-বাগানের বুকের ভেতর স্বর্গে একদিন

অভিরাজ চক্রবর্তী 

প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা স্বর্গ কি আদৌ দেখা যায়? যদি কেউ এমন প্রশ্ন করে, তাহলে শিবখোলা (Shivkhola) -এর নাম এক নিঃশ্বাসে বলা যায়। নুরবাং টি গার্ডেন (Nurbang Tea Garden) -এর সবুজ ঢালের ভেতর, ছোট ছোট ঝরনার কলকল আওয়াজ আর সুউচ্চ পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে প্রশান্তির এক অপরূপ আবাস নেচার’স ল্যাপ (Nature’s Lap)। আজকের এই ট্রাভেলগ সেই অভিজ্ঞতার কথাই বলবে, যেখানে প্রতিটি মোড়েই লুকিয়ে ছিল নতুন বিস্ময়, প্রতিটি বাতাসের ঝাপটায় ছিল পাহাড়ের স্নেহের আলিঙ্গন।

মন্দির থেকে একটু দূরে দাঁড়ালে দেখা যায়, পাহাড়ের ওপর ছড়িয়ে থাকা নুরবাং চা-বাগানের বিস্তৃত সবুজ। সেই অসীম সবুজের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সমস্ত ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ কোথাও গলে গেল পাহাড়ের হাওয়ায়। পাহাড় যেন নিজের কোলে আশ্রয় দিয়ে বলে দিচ্ছে, ফিরে এসো, যতবারই মন চাইবে। এখানকার সকালের প্রকৃতি ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় কুয়াশা জমে আছে, তার নিচে চা-বাগানের নরম সবুজ, আর মাঝেমধ্যে সূর্যের সোনালি আলো ছায়া তৈরি করছে।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি নামেনি। সিলিগুড়ির আকাশে কুয়াশার পাতলা কম্বল নেমে আছে। প্রথম আলোয় চোখ খুলতেই মনে হল, আজ যেন সূর্যও চুপচাপ পাহাড়ের পথে হেঁটে যাচ্ছে। নেচার’স ল্যাপ-এ যাত্রা শুরু করলাম হিল কার্ট রোড (Hill Cart Road / NH 55) ধরেই। শহরের উত্তাপ পেছনে ফেলে একটু একটু করে উঁচুতে উঠতে শুরু করতেই বাতাসের গায়ে যেন ঠাণ্ডার ছোঁয়া বাড়ছিল। মনে হচ্ছিল, শীতল নিঃশ্বাস নিয়ে পাহাড় ডেকে বলছে:৷ এসো, একটু বিশ্রাম করে যাও।

দার্জিলিংয়ের মোড়্গুলি পেরতেই পাহাড়ি পথের রূপ আরও স্বচ্ছ হয়ে উঠল। রাস্তার দুপাশে গাছের সারি, তার ফাঁক দিয়ে লাজুকভাবে উঁকি দিচ্ছিল সকালের সূর্য। দূরে কিছু জায়গায় দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ঘেঁষা ধোঁয়ার রেখাযেন প্রকৃতি নিজের হাতে একটি নরম ওয়াটারকালার তৈরি করেছে। সবটুকুই এত অর্গানিক, এত নিখুঁত যে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে নিজের শিল্পকর্ম সাজিয়ে রেখেছে। রংটং (Rongtong) পৌঁছতেই পাহাড়ি রেলস্টেশনের সেই আদুরে চেহারা চোখে পড়ল। রংটং রেলওয়ে স্টেশন (Rongtong Railway Station) ছোট, শান্ত, আর একেবারে ছবির মতো। পাশেই চা-বাগানের ঢাল, গোল গোল গাছের সারি যেন সবুজে মোড়া এক বিশাল কার্পেট। এখান থেকে রাস্তা আরও সরু হয়। গাড়ির জানালা খুলে দিতেই চা-বাগানের সুবাস নাকে এসে লাগল, একেবারে তাজা, সকালের শিশিরে ভেজা। মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতির সুগন্ধির দোকান খুলে বসেছে।

নুরবাং টি গার্ডেন-এর ভেতর দিয়ে যে রাস্তা গিয়েছে, তা এ যেন এক অনুভূতির যাত্রা। কখনও তীব্র বাঁক, কখনও খানিকটা উঁচু-নিচু, আবার কোথাও রাস্তার পাশে ছোট ছোট ঝর্ণা ঝুলে আছে পাহাড়ের গায়ে। জল পড়ার শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল সেই প্রায় ভুলে যাওয়া নীরবতা। মোবাইল নেটওয়ার্ক মাঝেমধ্যে গায়েব হয়ে যাচ্ছিল, অথচ অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, ঠিক এই নেটওয়ার্কহীনতাই যেন প্রয়োজন ছিল। যখন পৌঁছলাম নেচার’স ল্যাপ-এ, তখন পাহাড়ের গায়ে ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক সেকেণ্ডের জন্য আমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম। নীল আকাশ, নিচে সবুজ চা-বাগান, দূরে পাহাড়ের কুয়াশা, আর মাঝখানে পাখির কিচিরমিচির-এ যেন বাস্তব নয়, কোনও পুরনো কোনও চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হল, শিভখোলা শিব মন্দির (Shivkhola Shiva Temple)। ছোট্ট মন্দির, কিন্তু তার পরিবেশ এমন শান্ত যে নিজে থেকেই হাত জোড় হয়ে আসে। পাহাড়ের বাতাস গায়ে লাগলে মনে হয়, মন্দির আর প্রকৃতি যেন এক আধ্যাত্মিক কথোপকথনে ব্যস্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতে জানা গেল, মহাশিবরাত্রি বা বিশেষ উৎসবের সময় এটি হয়ে ওঠে দূরদূরান্তের ভক্তদের মিলনক্ষেত্র। মন্দিরের চারপাশে ঝিরঝিরে জলধারার শব্দ সেই ধ্যানী পরিবেশকে আরও গভীর করে তোলে।

মন্দির থেকে একটু দূরে দাঁড়ালে দেখা যায়, পাহাড়ের ওপর ছড়িয়ে থাকা নুরবাং চা-বাগানের বিস্তৃত সবুজ। সেই অসীম সবুজের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সমস্ত ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ কোথাও গলে গেল পাহাড়ের হাওয়ায়। পাহাড় যেন নিজের কোলে আশ্রয় দিয়ে বলে দিচ্ছে, ফিরে এসো, যতবারই মন চাইবে। এখানকার সকালের প্রকৃতি ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় কুয়াশা জমে আছে, তার নিচে চা-বাগানের নরম সবুজ, আর মাঝেমধ্যে সূর্যের সোনালি আলো ছায়া তৈরি করছে। কখনও মনে হয় পাহাড়ের গায়ে যেন কোনও চিত্রকর তুলির টান দিয়ে দিয়েছে। আবার কখনও মনে হয় ছবি নয়, এ তো পুরোপুরি জীবন্ত স্বপ্ন। লোকেশনটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হল, এখানে কোনও শব্দ নেই, কেবল প্রকৃতির সুর। বাতাসের শব্দ, বাগানের পাতার ঘর্ষণ, ঝর্ণার কলকল সব মিলিয়ে তৈরি করে এক অপার্থিব সিম্ফনি। আর এই নীরবতার মাঝেই দারুণভাবে টের পাওয়া যায়, প্রকৃতি আসলে কতটা উদার। স্থানীয় মানুষজন হাসিমুখে গল্প করেন। নেচার’স ল্যাপ -এর খরস্রোতা ছোট ঝর্ণার পা ডুবিয়ে বসা, গরম চা হাতে নেওয়া, আর পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকা- এই অনুভূতি ভোলার নয়। চা-বাগানের শ্রমিকদের দৈনন্দিন পরিশ্রম, তাদের জীবনের সরলতা সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন আরও বেশি মানবিক হয়ে ওঠে।

শিবখোলার দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, এখানে প্রকৃতি এখনও ততটাই সতেজ, যতটা হয়ত দশ বছর আগে ছিল। মানুষের ভিড় নেই, বাজারের কোলাহল নেই, নেই কোনও অযথা কংক্রিটের দখল। যেন প্রকৃতি নিজের মতো করে নিঃশব্দে বেঁচে আছে। সন্ধ্যে নামতেই পাহাড়ি পথটাও যেন অন্য রূপ ধারণ করল। হালকা কুয়াশা আর আলত শীতল হাওয়ায় নুরবাং চা-বাগানের আলো-ছায়ার খেলা যেন মোহময়ী। মনে হচ্ছে যেন পাহাড় দিনের শেষের গান গাইছে। ফেরার পথে রংটং -এর রেলস্টেশনে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েছিলাম। পাহাড়ের অন্ধকারে ট্র্যাকের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন শান্তি লাগছিল। ছোট্ট আলো, দূরে কালো পাহাড়, আর আকাশ ভরা তারা। এ যেন অসাধারণ সমাপ্তি। কোথাও মেলানকোলি।

শিবখোলা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে: সময়, গতি, ব্যস্ততা সবকিছুই একটু থামিয়ে রাখা যায়, যদি সত্যিই মন চায়। পাহাড়ের নীরবতা, চা-বাগানের সুবাস, আর নেচার’স ল্যাপ -এর পবিত্র শান্তি মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে জীবনভর মনে রাখার মতো যাত্রা।

 

 

🍂কবিতা 

 

শুভাশিস ভট্টাচার্য -এর একটি কবিতা

দগ্ধ নরম অন্ধকার 

নিভে-যাওয়া সন্ধের পর
একটি স্পর্শহীন তাপ হঠাৎ দেহ ভরে ওঠে
নরম কোনও কুয়াশা যেন
ধীরে ধীরে খুলে দেয় ত্বকের সব বন্ধ খুপরি

সেই নৈঃশব্দ উত্তাপে
ভাঙতে থাকে বহুদিনের নির্লিপ্ততা
অচেনা কাঁপন আসে
ছুঁয়ে দেয় মাটির গভীর, ঘুমিয়ে থাকা আগুন…

গন্ধে ভেজা বাতাসে
গোপন স্রোতের মতো ওঠানামা করে
অদ্ভুত দহন-
যার দিকচিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় শুধু শিরার ভেতর।

অন্ধকারের রেশমি ঘেরাটোপে
নরমভাবে জেগে ওঠে
প্রচণ্ড আকর্ষণের লুকানো ঝড়
যেন দেহের প্রতিটি বিন্দু
নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চায়
অসীম উষ্ণতার বিস্তারে।

শুধু দহন আর ভেজা সুর
গড়ে ওঠে গভীর নিবিড়…
হারিয়ে যায় সব উচ্চারণ, সব পরিচয়-
অবশিষ্ট শুধু তপ্ত, কাঁপন আর নীরবতা

 

শোভনা মাইতি -এর দু’টি কবিতা

নক্ষত্রবালক, নিঃশব্দ চলে যাওয়া

রাতের জানালায় ভেসে ওঠে এক নক্ষত্রবালক
চোখে তার পুরোনো নদের মতন গভীর অপেক্ষা।
হাওয়ার খসখস শব্দে ভিজে ওঠে তার অব্যক্ত দিনলিপি,
কেউ জানে না, কতবার নিজেকেই মুছে নতুন করেছে।

নক্ষত্র বালক হেঁটে যায় নিঃশব্দে, মেঘের গায়ে রেখেছে দাগ,
সমস্ত শহর ঘুমোলে সে জেগে থাকে স্বপ্নের ফাঁকেফাঁকে।
মনখারাপের পুরনো কুয়াশায় ডুবে থাকা বাতির নিচে
কেউ তাকে চিনতে পারে না— একান্ত একার মানুষ ছাড়া।

তার দূর যাত্রার পথে ফেলে যাওয়া ক্ষুদ্র পদচিহ্ন
কখনও কোনও কাহিনির অংশ হয় না
কিন্তু শহরের বটগাছ জানে,
সন্ধের রঙ বদলে যাওয়ার পিছনে
তারই নরম নিঃশ্বাস লুকিয়ে থাকে।

 

চাঁদের দিকে তাকিয়ে 

চাঁদের দিকে তাকিয়ে যখন হাসলে

দুলে-ওঠা চুলে লেগে থাকা নরম উষ্ণতা
আমার অলক্ষ্য পথচলায় ঢেলে দিল অচেনা ব্যাকুলতা।
তোমার চোখ দু’টি যেন নীরব নদীর ঢেউ
দেখলেই মনে হয়– সারা জীবন ওখানেই থেমে রই।

হাতের কাছে তোমার আঙুল এলে কাঁপে মন
অচেনা মধুর ভয়, ভরে ওঠে হৃদয় গহন।

তোমার কণ্ঠের ভেতর যেন প্রিয় এক ঘন্টার সুর
থেমে যায় বিষণ্ণ, শুরু হয় স্বপ্নের নীল নূপুর…

 

 

সংবেদন শীল -এর একটি কবিতা

এক ছাদের নিচে, একশো রকম দূরত্ব 

সেই থেকে আজ পর্যন্ত
আমরা এক ছাদের নিচে আছি
শোনো, এ বাক্যটার ভেতরে
একটা কিছু লুকিয়ে আছে
যেটা প্রতিরাতে জ্বলে
আর ভোর হলে আবার নিভে যায়
ঠিক আমাদের মতোই

মাঝরাতে জল খেতে উঠে
ফের অন্ধকারে ফিরে যাও
তখন বিছানার কোণে বসে
টালমাটাল পায়ের শব্দ গুনি
কারণ তাতে একটা ঠাণ্ডা নিশ্চয়তা থাকে
যে তুমি আছ

আমরা কথা বলি কম
তবু নীরবতার গায়ে
চুল রাখলে যেমন উষ্ণতা টের পাও
আমরাও তেমনই ছুঁই একে অন্যকে
অদৃশ্য স্পর্শের কৌশলে

 

 

তৈমুর খান -এর একটি কবিতা

জন্মান্তর 

জাগরণ স্থির হয়ে আছে
তবু রোজ পুনর্জাগরণ চাই
প্রতিটি সকাল কি একই হতে পারে?
প্রতিটি রাস্তা কি গন্তব্যে যায়?

কার কথা শুনব তবে?
অনেক কথার ভিড়ে অনেক সমুদ্রের পর
একটি ছোট্ট নদীর কাছে এসেছি আজ
আমার তৃষ্ণার কথা বলে যাব তাকে

দুই পাশে দাউদাউ আগুন সমাজ
যা পায় পোড়ায় শুধু উড়িয়ে দেয় ছাই
জন্মান্তর তবু ফিরে আসে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোজ এখানে দাঁড়ায়…

 

 

মমতা রায় চৌধুরী -এর একটি কবিতা

নিজেকে খুঁজে বেড়াই 

আমি মানুষ কিনা জানার জন্য
এবড়ো খেবড়ো পথে হাঁটছি হোঁচট খাচ্ছি
ব্যথা লাগছে। মনে হচ্ছে
হ্যাঁ আমি মানুষই বটে। রক্তে মাংসে গড়া মানুষ।
এবার ভাবছি আমার কি আছে সেই মান আর হুশ
চেতনার গভীর থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, ছুটে যাচ্ছি
বনের পথে হাঁটতে গিয়ে অবাক হয়ে গেছি
পশুদের ভেতরেও জেগে উঠেছে বিবেক
অথচ মানুষ হয়ে সেই মান আর হুঁশ
হারিয়ে গেছে অনেক গভীরে
নয়তো একটি ক্ষুধার্ত সারমেয়েকে দেখেও
ইচ্ছে করে না দু’মুঠো খাবার খাওয়াতে
ওর অসহায় দু’টো চোখের চাহনি
কখনও বিবেকে ধাক্কা দেয় না।
তবে আমি কিসের মানুষ
এই শর্তের পৃথিবীতে শুধুই স্বার্থ
যেখানে স্বার্থ সেখানে ভালবাসা
ভালোবাসা আবার এরকম হয় নাকি।
আস্তে আস্তে আমার বিবেক জাগ্রত হল
আমিও মানুষ হবার চেষ্টা করলাম
তাইতো অরণ্যের সবুজের হাতছানি
আমাকে পাগল করে দেয়,সবুজের প্রত্যাশায় ছুটে যাই বন থেকে বনের খোঁজে।
খুঁজে বেড়াই পশু পাখির নিঃস্বার্থ কলকাকলি
এখনো আমি খুঁজে বেড়াই সেই ক্ষুধার্ত সারমেয়কে
আর ওর দু’চোখে আমি দেখি কবে এই পৃথিবীর মানুষ ভালবাসতে শিখবে শর্ত ছাড়া, স্বার্থ ছাড়া।
আমি কি সেইভাবে মানুষ হতে পারব?

 

 

আশিস সরকার -এর একটি কবিতা

এত চুপ কেন 

এত চুপ কেন
এত নীরব কেন
এই নীরবতার কাছে আমার সব কিছু থেমে যায়।
নক্ষত্র অত বড় আকাশে নীরব থাকে, চুপটি থাকে,
চেয়ে দেখো-আলোর তরঙ্গ বিস্তারে ধ্বনির ছলনা,
শান্ত সমাহিত শব্দ কুশলতা- কেমন অনায়াসে মিলে মিশে যায় ব্রম্হান্ড নাভি থেকে ভেসে আসা- অনন্তের নীলাভ তরঙ্গে।

 

 

বিশ্বজিৎ মণ্ডল -এর একটি কবিতা

কাঠ

জ্বালানি কাঠের মত পুড়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত…
এ শরীর তো অঙ্গার

সোনা হতে পারিনি স্যাকরার প্রজ্বলিত আগুনে
পোড়া কয়লার কাঠজুড়ে আমার তেভাগা সংসার
নষ্ট আয়োজনে সাজিয়েছি, গৃহিণীর উঠোন
এভাবেই হা হুতাশে কেটে যাচ্ছে, চৌষট্টি পর্বের জীবন

বেলাশেষে জানলাম, এতকাল যাকে গঙ্গা বলে পুণ্যস্নান
করেছি, আসলে সেটা অভিশপ্ত কোন হ্রদ

আমি তো অসুন্দর বনের শুকিয়ে যাওয়া মরাকাঠ
ঈশ্বর তোমার দাবানলে এইবার পোড়াও—
আমার অচ্ছুত শরীর

 

 

প্রিয়াংকা নিয়োগী -এর একটি কবিতা 

আত্মসম্মানবোধ 

আত্মার সম্মান আত্ম সম্মান
যত্ন রক্ষণাবেক্ষণ আরাম
মর্যাদা শিরায় শিরায়।
আত্মার কষ্ট বড়ো কষ্ট
ধাক্কা খায় মনের গোত্র।
গুরুত্ব থাকুক আত্মার
আত্মশক্তি বিকশিত যাত্রার।
অপমানের সাথে সম্পর্ক না থাকুক…
মেঘের খেয়ালে খেয়ালী মন
আত্মমর্যাদায় সমৃদ্ধ থাকুক।

 

 

পরাণ মাঝি -এর দু’টি কবিতা

কে যাবি আয় 

ঘোড়ার ডিমের মস্করা। হঠাৎ বেজে ওঠে জীবন তারা। মিথ্যের বাকল খুলে গেলে ভেতরে সততার নদী। সভ্যতা জ্বলে; সময় ঘি ঢালে

জোট বাঁধো। রাজাকে পড়াতে যাবো
পেটে গামছা বাঁধার গল্প শোনাবো–
রাজা মানুষ হলে– বিচারের মুখে ন্যায় বসবে; মানুষ বাঁচবে। কে যাবি আয়…

 

উষ্ণ নেমপ্লেট 

জ্বলছে জিরো পাওয়ার; কী করে

জিরোও জ্বলে
শরীরও ভাসে
বাউন্ডারি জুড়ে টক মিষ্টি ঝাল; বউ কথা কও গান

শ্রেয়সী হুট খোলা রাত
টানটান শুয়ে আছে পাশবালিশ; সটান কোলাজ

হাপিত্যেশের নেট খুঁজছে আদরমাখা উষ্ণ নেমপ্লেট

তেষ্টার ভেতর ঘুমিয়ে শিশুমেঘ দেখছে স্বপ্ন- মা মা আকাশের মনোবিন্দু

 

 

দীপ্তি চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

কীটনাশক 

লুকিয়ে রেখেছি ক্ষত
জন্মজন্মান্তর কীট পোকাদের নিবাস
ক্ষত শুকিয়ে গেলে জীবেরা আশ্রয়হীন
তবুও কিছু অচেনা কীট
যত্ন করে রেখে দিই
বারোমাস
সময়ের অজুহাতে
তেলাপোকার মতো সংসার
স্বপ্ন মানে আশায় বাঁচা
আর শুধু টিকে থাকা।

 

শারাবান তহুরা -এর একটি কবিতা

ক্যানভাস 

আনন্দের ব্যক্তিত্বে সঙ্গোপনে পুড়েছি দাবানলে
আমরা বদলে যা-ই ক্ষণিকেই নিঃশব্দে নীরবে
এক অন্ধকার পৃথিবীর দ্বার ভেসে ওঠে ক্যানভাসে
জীবনের না বলা কথাগুলো
বেমালুম নির্জনে ডুব দেয়
আনন্দ চিরকাল বেঁচে আছে মনের শিরোনামে
আমার ভোরের পাখি আমার কবিতা
জীবনের গোপন গল্প
পাওয়া না-পাওয়া একাকার
জীবনের এ্যালবামে মিশে আছ আদিগন্ত
শত সহস্র প্রশ্নে দুর্বল দূরগামী।

 

 

 

🍂ধারাবাহিক রহস্য উন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

 

কিশাণগঞ্জের ফেলুদা


তাপস রায়

২৪.

বনবিহারীর গাড়ি ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’-এর সিকিউরিটির সকলেই চেনে। গাড়ি পার্কিং এ না ঢুকে সোজা নিচে নেমে গেল। তারপর গাড়ি থামিয়ে, নিজের শ্যালেট-এর দরজা চাবি দিয়ে খুলে ভেতরে নিয়ে গেলেন চানুমতিকে। দু’টি ঘরের একটি গেস্টরুম, অন্যটিতে থাকেন বনবিহারী। গেস্টরুমের দরজা খুলে দিয়ে বনবিহারী বললেন, ‘ভাবিজী, আজ তো রাত হয়ে গেল, কাল সকালে এখানেই গনেশজী, মানে আপনার বাবাকে নিয়ে আসব। আপনি একটু ফ্রেশ হয়ে নিন, আমি গাড়ি পার্ক করে উপর থেকে খাবার টাবার নিয়ে আসছি।’ যাবেন বলেও কিন্তু বনবিহারী গেলেন না। তিনি নিজের ঘরে ঢুকলেন। আলো জ্বাললেন না। তিনি জানেন চানুমতি এখন পোশাক পাল্টাবে।

মালবাবু আর তার কাছ থেকে টাকা চাইতে আসেননি। আসবেই বা কোন মুখে। একটা মানুষের জীবন যে তার কুকুর নষ্ট করে দিয়েছে। ডান দিকের কাঁধের নিচে গামলার মতো এক খাবলা মাংস নেয় সুশান্তর। তুলসি পান পরাগটা একটু বেশি কড়া লাগছে। শীতের দেশে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জড়ো হয়ে গিয়েছে। সুশান্ত ভাবল দিন দু’য়েক কালিম্পংয়ে থাকবে তারা। একটা পড়ে পাওয়া সুযোগ এসেছে প্রতিশোধ নেওয়ার। মালবাবুকে পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে। যদি নাও মরে, তার মতো আধ মরা হয়ে বেঁচে থাকলে সুশান্তর আরও সুখ।

এই ঘরের কোন ছিদ্র দিয়ে তা দেখা যাবে, জানেন। বাথরুমের গীজারের কোণে দু’পাশেই দু’টো ছিদ্র আছে।

**
চানুমতি ঘরে ঢুকে খুব তাড়াতাড়ি চানে গেল। দুপুরে ডাক্তার ঘর থেকে চলে যেতেই বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। সারা শরীর থেকে কেমন আঁশটে গন্ধ ছাড়ছে। অনেক অনেক দিন পর ডাক্তার তার শরীর থেকে কান্না সরিয়ে রেখে গোপন জল বের করতে পেরেছে। সে সব লেগে থেকে খচ খচ করছে। গীজার চালিয়ে দিয়ে গরম জলে একটা ভাল স্নান করতে চায় চানুমতি। চানুমতীর নগ্ন সৌন্দর্য দেখে বনবিহারী নাড়াচাড়া খেলেন। মনে মনে ভাবলেন, না আর একে কিশানগঞ্জে ফেরাবেন না। এখানে গনেশ ছেত্রীর কাছে থাকা মানেই তো তার কাছে থাকা। এই রিসর্টের রিসেপসনে বসতে পারবে সে। চানুমতিকে লুকিয়ে ফেলবেন। কিশানগঞ্জ থেকে আসার সময় দূরদৃষ্টি দেখিয়ে বনবিহারী চানুমতিকে রেল কোয়াটার থেকে আনতে যাননি। গান্ধীচকে ভিড়ের ভেতর গাড়িতে উঠেছে চানু্মতি। কালো কাচ ওঠানো ছিল। কেউ নজর করতে পারবে না।
অন্ধকার ঘরে আধঘন্টা কাটিয়ে বনবিহারী পা টিপে টিপে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। ডাইনিংয়ের বেয়ারাকে বললেন, সবে এসেছেন গাড়ি চালিয়ে। চান-টান না করে খেতে পারবেন না। রাতের খাবার তার ঘরে যেন দিয়ে আসে বেয়ারা। দুপুরে খাননি। একটু বেশি করেই যেন দেয়।
ধৈর্য রাখতে পারছেন না মালবাবু। এসপার ওসপার একটা হয়ে যাক। বার বার সেই নাম্বারে ফোন করছেন, কিন্তু কেউ ধরছে না। ছেলেটার জন্য চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। কেন ফোন ধরছে না সেই অপরিচিত কণ্ঠ! তবে কি সে মালবাবুর গতিবিধি জানার চেষ্টা করছে! ফেলুদাকেও পাচ্ছেন না যে কথাটা বলবেন। সেই যে আসছি বলে মাঝ পথে নেমে গেল, আর পাত্তা নেই। সেও ফোন ধরছে না। এতগুলো টাকা রয়েছে ট্রলি ব্যাগের ভেতর।
মালবাবু ডিকি লজে নিজের রুমের ভেতর একবার বিছানায় বসছেন, একবার উঠে পায়চারি করছেন। জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়েছেন। পাহাড়ের ঢালে অনেক গাছপালা। কোনও গাছের পাতার এমন রং, মনে হবে আগুন ধরে গিয়েছে। ফার, বার্চ, আর পাইনের ভিড় এদিকটার অরণ্যে। তবে দূর থেকে গাছগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না।
কে তার পেছনে লেগেছে, ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না তো চিহ্নিত করবেন কেমন করে! ফোন নম্বারটা পুলিশকে দিয়ে তাদের সাহায্য নেওয়া কি উচিত ছিল ! হয়ত ছিল। যদি ছেলেটার কোনও ক্ষতি করে দেয়! সেজন্যই তো অন্য কোনও ভাবনা আসেনি মালবাবুর মাথায়। তাছাড়া পুলিশে জানালে তার নিজের নানা ব্যবসাও তো
জানাজানি হয়ে যাবে। অমন সাধের চাকরি তার চলে যাবে। কত লোকে যে মালবাবু বলে খাতির করে, তা থাকবে না। এখনও বছর দশেকের চাকরি আছে। হেসে খেলে শুধু ওয়াগন থেকে মাল তাড়াতাড়ি ছাড়িয়েই বছরে দু-আড়াই কোটি এসে যায়। তারপর তো আছে কোনও ওয়াগন যদি কেউ ঝেঁপে দেবার তাল করে, তাকে সমর্থনের বিনিময়ে পারসেন্টেজ। সে-ও বড় কম টাকা নয়।
মাথা কাজ করছে না। এসপার ও্সপার কিছু একটা হয়ে গেলে হোক। পঞ্চাশ লক্ষই এনেছেন। ক্যাশ। জোগাড় করতে সময় লাগেনি। সবই থাকে তার বাথরুমের উপরের লফটে। ফেলে দেয়া নোংরা জিনিসপত্রের মধ্যে আরও দু-কোটির মতো আছে না তার বেশি আছে জানেন না। রোজই অফিস থেকে এসে বাথরুমে গিয়ে টাকার বান্ডিল ওই অন্ধকার গহবরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা তাঁর অভ্যাস। তাতে কী যেন শান্তি লাগে। রবিবারেও টাকা আসত, তা অবশ্য সুদের। কিন্তু গঙ্গারাম অন্তর্ধান করার পর থেকে তা বন্ধ হয়েছে। সে যাক। বনবিহারীর সঙ্গে নদী সংস্কারের নতুন টেন্ডারে কিছু টাকা লাগবে। যা আছে তাতে কুলিয়ে যাবে। বনবিহারীর কথা মনে আসতে মালবাবু একটু থম মেরে গেলেন। পায়চারী করা থামিয়ে দিলেন। হ্যাঁ, একমাত্র বনবিহারীই জানে, তার কিছু টাকাকড়ি আছে। বনবিহারীর সঙ্গে অনেক লাভজনক ব্যবসা করেছেন। এই তো সেদিন পঞ্চাশ লাখ ফেরৎ দিয়ে গেল। সে নয় তো! সে জানায়নি তো কাউকে!

**

এই দমবন্ধ অবস্থাটা মোটেও নেওয়া যাচ্ছে না। মাথা ঠিক থাকছে না। দুপুরের খাবারে প্রিয় পোস্তর বড়া আর হিং দেওয়া বিউলি ডালেও রুচি হয়নি। মালবাবু ঠিক করলেন, না ফেলুদার কথামতো ঘরের ভেতর বন্ধ থাকলে দম বন্ধ হয়ে মরে পড়ে থাকবেন। খানিকটা বাইরের হাওয়া দরকার। নিজের তালা-চাবি বের করলেন। এটা তার অভ্যাস। সুরক্ষার জন্য অন্য কারোর উপর ভরসা রাখলে চলে না। হোটেলের তালা না দিয়ে নিজের দামি তালা লাগিয়ে মালবাবু লজ ছেড়ে বেরিয়ে পরলেন। কালিম্পং বাজারের দিকটা পায়ে পায়ে ঘুরে আসা যেতে পারে। ইট ভাটার কর্মচারীরা পঁচিশজন মিলে ট্যুরে বেরিয়েছে। দু’টো বোলেরো ভাড়া করে এনেছে ইসলামপুর থেকে। কালিম্পং, দার্জিলিং, মিরিক হয়ে ফিরবে তারা পঁচিশে ডিসেম্বরের পর দিন। এই ক’দিন ভাটা বন্ধ। মালিক থাইল্যান্ড গিয়েছে ফ্যামিলি ট্যুরে। ওরাও বেরিয়ে পড়েছে, খানিকটা মস্তি নাহলে চলবে কেন। সুশান্ত নন্দী পান পরাগের পাতা দোকান থেকে কিনে দাঁতে কেটে সবটাই মুখে পুরে দিয়ে কাগজটা ফেলতে গিয়েই চমকে উঠল। পাশ দিয়ে যে লোকটা চলে গেল, তাকে যেন চেনে! ক’য়েক মুহূর্তের মধ্যেই মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ ভুলবে কীকরে। তার গোটা জীবন বরবাদ করে দেবার নেপথ্যের লোকটি এই। ওই সাঙ্ঘাতিক কুকুরটির মালিক। মালবাবু। গরীব লোককে মাল ধার দিয়ে তার জীবন জেরবার করে দেয়। সারা জীবনেও টাকা শোধ হয় না। সুশান্ত নন্দীর অবশ্য টাকা শোধ করতে হয়নি। মালবাবু আর তার কাছ থেকে টাকা চাইতে আসেননি। আসবেই বা কোন মুখে। একটা মানুষের জীবন যে তার কুকুর নষ্ট করে দিয়েছে। ডান দিকের কাঁধের নিচে গামলার মতো এক খাবলা মাংস নেয় সুশান্তর। তুলসি পান পরাগটা একটু বেশি কড়া লাগছে। শীতের দেশে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জড়ো হয়ে গিয়েছে। সুশান্ত ভাবল দিন দু’য়েক কালিম্পংয়ে থাকবে তারা। একটা পড়ে পাওয়া সুযোগ এসেছে প্রতিশোধ নেওয়ার। মালবাবুকে পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে। যদি নাও মরে, তার মতো আধ মরা হয়ে বেঁচে থাকলে সুশান্তর আরও সুখ। সে মালবাবুর পিছু নিল। মালবাবু অলস পায়ে ডেলো পাহাড়ের দিকের পথে হাঁটছেন। 🍁 (চলবে)

 

 

🍁কণাগদ্য

 

অমিত তো শেষ! শুধু বাকি রয়েছে নিংড়ানো দেহের অবশিষ্ট৷ আর রয়েছে বহু কষ্টে কবিতার খাতায় তোলা ঈশ্বর প্রদত্ত জ্ঞান৷ অমিত শেষ বটে, অমিত জানে না তার খাতার ভাঁজ অমরত্বের দ্বার খুলবে কিনা! তবে অমিত এটা জানে, তার কলমকে থামানোর দুঃসাধ্য কাজ কেউ করবে না৷

 

অমিত পাল -এর তিনটি কণাগদ্য

অমিত শেষ!

অমিত কেমন ভাবে শেষ হয়ে গিয়েছে! শিবপুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ পড়েও অমিত আর বেদ মন্ত্র পাঠের সুপাঠক হতে পারবে না৷ হতে পারবে না সুললিত একনিষ্ঠ ধর্ম প্রাণ সততা৷ অব্যক্ত পুংকেশর ও ডিম্বাশয়ের মতো অমিত নিজেকে আর ব্যক্ত করতে পারবে না৷ পারবে না নিজের জীবন চক্রকে ঘুরুতে৷
অমিত শেষ আজ! বেকারত্ব নামক ফুলকি অগ্নি স্ফুলিঙ্গের ন্যায় অমিতকে পুড়িয়ে ফেলছে বারবার৷ দাহ করেছে সুপ্ত থাকা অমিতের হৃদয়ের একরাশ দম্ভ৷ দেহাতিরিক্ত পোড়া ছাই এবার মহাকালের শরীরে ভস্মের ছাই এর সাথে নিমজ্জিত৷
কোথায় ইউনিভার্সিটির চত্বর? কোথায় কফির চুমুকে কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, গদ্য গ্রন্থ শেষ? কোথায় বা থরে থরে বই সাজানোর ইচ্ছা? কিংবা কোথায় বা হরিয়েছে কলেজ লাইফের প্রেম উচ্ছ্বাস— সবই তো এখন শেষ নিঃশ্বাস…
অমিত তো শেষ! শুধু বাকি রয়েছে নিংড়ানো দেহের অবশিষ্ট৷ আর রয়েছে বহু কষ্টে কবিতার খাতায় তোলা ঈশ্বর প্রদত্ত জ্ঞান৷ অমিত শেষ বটে, অমিত জানে না তার খাতার ভাঁজ অমরত্বের দ্বার খুলবে কিনা! তবে অমিত এটা জানে, তার কলমকে থামানোর দুঃসাধ্য কাজ কেউ করবে না৷

আচ্ছা কতদিন কাটিয়েছ বলো তো ঐ কলেজের বেরসিক বাগান চত্বরে? আচ্ছা কতগুলি রাজনৈতিক সংগঠন করেছ বলো তো? জানো কি, তুমি এখন আবার রাজনৈতিক ঘেরাটোপে লুকিয়ে আছে চাকরী নামক পুংধ্বনি৷ তোমার বাবা চাকরী করেন৷ আমি জানি— তোমার ইচ্ছা অনার্সটা টেনে নিয়ে গবেষণা পর্যন্ত এগোবে৷ তারপর চাকরীর আশা করব৷ আচ্ছা এবার বলো তো তোমার বার্ধক্যে তুমি খুব ভালবাসো কি?

অমিত শেষ হোক, দেহাবশেষ শূন্য কাঠের আগুনে ভস্মীভূত হোক৷ তবে অমিত জানে, তার কবিতা স্ফুলিঙ্গ গড়ে তুলবে নতুন দরজার খিল৷ খুলে দিলে হয়ত খুঁজে পেতে পারো অমৃত রস কিংবা বেকারত্বের জ্বালায় ভস্মীভূত হওয়ার গল্প…

ঐতিহ্য

দেখো টেমস নদীর হাওয়া আমার গায়ে লাগেনি৷ সন্ধ্যায় লেকের পাশ দিয়ে যায়নি কোনওদিন সৌন্দর্য্য হাতড়াতে৷ তবে আমি জানি এতে অমাইক এক উৎফুল্লতা আছে— আমি তা অনুভব করতে ব্যর্থ৷
অখ্যাত গাঁয়ের বেকার যুবক আমি৷ শঙ্করপুর আমার আদিবাস৷ এখনও আমি আমার গ্রামেই বর্তমান৷
পান থেকে চুন খসে পড়ার মতো মানুষরা কেমন গ্রাম ছাড়ছে! খুঁজতে চাইছে না মায়ের নাড়ী ছেঁড়ার গল্প৷ কোনো এক রাজনৈতিক অস্থিরতা, কোনও এক স্বার্থপরতা, কোনও এক সফলতার ভীতি বিরাজমান৷ তাই আজ অনেকে দেশান্তরী৷
বাইরের অনেক মানুষ আমার গ্রামের নাম হয়ত শোনেনি৷ এর মস্ত বড় কারণ জনসমাগমের বিরলতা৷ অখ্যাত, অজ্ঞাত পরিচয়ে নির্জীব হয়ে পড়ে আছে গ্রামটি৷ বেঁচে থাকা স্থায়ী বার্ধক্য নিজেদের মোহ কাটাতে চাইছে৷ তবে তারা আজও গ্রামের রুটিং মেনে চলে৷ পাল্টাতে পারেনি গ্রাম্য রণাঙ্গন৷
জনবিরলতা গ্রাস করলেও আমার গ্রামের ঐতিহাসিকতা ও পুরাতন ঐতিহ্য আছে অপার ভাণ্ডার স্বরূপ৷ হয়ত আমার গ্রামের ইতিহাস শুনলে সাংবাদিকতার বেহুশ অবস্থাও কাটতে পারে৷

বেকারত্ব

ফেলে আসা বিকেলের মতো রামচরিত, রামচরিত মানস, উত্তরামচরিতে সব ধুয়ে মুছে গিয়েছে জীবনের শ্রেণী বদলাতে বদলাতে৷ এখন বেকারত্বের জ্বালায় আবার এইগুলি গলাদ্ধকরন করছি৷ নাভিকুণ্ডকে ধুতরাফুল ও আকন্দফুলের সংমিশ্রণে জলাঞ্জলি দি৷
জানো কি তুমি বেকারত্ব কি? ইউনিভার্সিটির চত্বরে পুরাতন গাছের গোড়ায় থরে থরে সাজানো পাথরে মাথাঠুকেও এই বেকারত্ব কাটবে না ভাই৷ চলে এসো, নিজেকে ভাসাও ভাগীরথীর অপার অতলে৷ নদীর তল খুঁজতে থাকো৷ খোঁজো জলঝাঁঝির বংশবিস্তার৷ যেদিন ভাগীরথীর জলে নিজেকে মিশিয়ে দিতে পারবে সেদিনই কাটবে বেকারত্ব৷

আচ্ছা কতদিন কাটিয়েছ বলো তো ঐ কলেজের বেরসিক বাগান চত্বরে? আচ্ছা কতগুলি রাজনৈতিক সংগঠন করেছ বলো তো? জানো কি, তুমি এখন আবার রাজনৈতিক ঘেরাটোপে লুকিয়ে আছে চাকরী নামক পুংধ্বনি৷ তোমার বাবা চাকরী করেন৷ আমি জানি— তোমার ইচ্ছা অনার্সটা টেনে নিয়ে গবেষণা পর্যন্ত এগোবে৷ তারপর চাকরীর আশা করব৷ আচ্ছা এবার বলো তো তোমার বার্ধক্যে তুমি খুব ভালবাসো কি? রিলক্সসেশন, ইনজয়মেন্ট বলে একটা কথা আছে না— তা তুমি কতটা এর অংশীদার হবে!
যাই হোক ভাল আছি আমি৷ ভাল থেক৷ বেকারত্ব কাটিও৷ আমিও চেষ্টা চালাচ্ছি…🍁

 

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন