সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির টানাপোড়েনের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেল ও সারের দামে লাগাতার ঊর্ধ্বগতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ (Nirmala Sitharaman) দেশের আর্থিক পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের উপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন, ‘ফুয়েল’, ‘ফার্টিলাইজ়ার’ এবং ‘ফরেক্স’। তাঁর বক্তব্য, এই তিনটি বিষয়ের উপর নজর রাখাই এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে তিনি দেশের নাগরিকদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে বড় প্রভাব ফেলেছে। গত কয়েক দিনে একাধিক দফায় পেট্রোলের দাম বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ১১ দিনের মধ্যে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ৭.৩৮ টাকা। কলকাতা (Kolkata) -সহ দেশের বিভিন্ন শহরে এর প্রভাব পড়েছে। কলকাতায় পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ১১৩.৫১ টাকায় পৌঁছেছে, আর ডিজ়েলের দাম বেড়ে হয়েছে ৯৯.৮২ টাকা। পরিবহণ খরচ বাড়ায় বাজারদরেও চাপ পড়ছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে সাধারণ মানুষের পকেটে। একটি কর্মসূচীতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নির্মলা বলেন, ‘তিনটি এফ ফুয়েল (জ্বালানি), ফার্টিলাইজ়ার (সার) এবং ফরেক্স (বিদেশি মুদ্রা) এই তিন ক্ষেত্র এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দাবি করছে।’ তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে শুধু পরিবহণ খরচই বাড়ছে না, বরং শিল্প এবং কৃষি ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ছে।
সারের দাম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। তাঁর কথায়, সারের মূল্যবৃদ্ধি ‘কল্পনাতীত’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কৃষি নির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সারের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্যশস্যের দামে। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক কারণগুলিকেও দায়ী করেছেন নির্মলা। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওই অঞ্চলের অস্থিরতা শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়ছে বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনেও।’ তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াতে বিলম্ব হচ্ছে, ফলে পরিবহণ ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি মুদ্রাবাজারেও চাপ তৈরি হচ্ছে, যা আমদানি-রফতানির উপর প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) -এর গুরুত্বও এই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবহণ করা হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে এই পথে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ভারত যেহেতু বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে, তাই এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সাম্প্রতিক আহ্বানের কথাও উল্লেখ করেছেন নির্মলা। তিনি জানিয়েছেন, বিদেশি মুদ্রা সঞ্চয় রক্ষার জন্য অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো প্রয়োজন। বিশেষ করে সোনা কেনা এবং বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংযম দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, কেন্দ্র সরকার ইতিমধ্যেই জ্বালানির দামে শুল্ক কমিয়ে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে এর ফলে সরকারের রাজস্বে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার প্রভাব পড়েছে। তবুও পরিস্থিতি সামাল দিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। শুধু জ্বালানি বা সার নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্ষেত্র নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নির্মলা। তাঁর বক্তব্য, অনেক সংস্থা সময়মতো অর্থ প্রদান করছে না, যার ফলে প্রায় ৮.১ লক্ষ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, বকেয়া অর্থ ৪৫ দিনের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে। তা না হলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রসঙ্গে তিনি ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক ভিত শক্ত রয়েছে। তবে এই সময়ে নাগরিকদের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা জরুরি। তিনি বলেন, ‘দেশবাসীর মধ্যে অযথা ভয় ছড়ানো উচিত নয়।’ রাজনৈতিক মহলে তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দিতেই তিনি এই মন্তব্য করেছেন। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান হল, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা চলবে। জ্বালানি, সার এবং বিদেশি মুদ্রা এই তিনটি ক্ষেত্র এখন দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব, অভ্যন্তরীণ বাজারের চাপ এবং নীতি নির্ধারণ আগামী দিনে এই তিনটি বিষয়ই অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nirmala Sitharaman Lok Sabha speech | লোকসভায় বাংলায় আক্রমণ! চা-শ্রমিক ইস্যুতে তৃণমূলকে তোপ নির্মলা সীতারমণ-এর, রাজনৈতিক অঙ্কে বাড়ছে উত্তাপ



