সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন রাঁচি: সরকারি নেমপ্লেট, গাড়ির সামনে বড় করে লেখা ‘গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’, আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তা আর প্রশাসনিক ভাষার দাপট, সব মিলিয়ে দেখলে যে কাউকেই বিশ্বাস করানো সম্ভব। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। ঝাড়খণ্ডে (Jharkhand) পুলিশের জালে ধরা পড়ল এক ভুয়ো আইএএস। অভিযুক্ত যুবকের নাম রাজেশ কুমার (Rajesh Kumar)। নিজেকে ২০১৪ সালের ওড়িশা ক্যাডারের (Odisha Cadre) আইএএস অফিসার বলে তিনি পরিচয় দিতেন। এমনকী দাবি করেছিলেন, বর্তমানে ভুবনেশ্বরে (Bhubaneswar) চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার বা সিওএ (Chief Accounts Officer, CAO) পদে কর্মরত। কিন্তু পুলিশের সামান্য সন্দেহ আর অনুসন্ধানেই ভেঙে পড়ে দীর্ঘদিন ধরে সাজানো এই ভুয়ো পরিচয়ের ভিত।
হুসেইনাবাদ থানার (Hussainabad Police Station) সূত্রে উল্লেখ, একটি জমি বিবাদ সংক্রান্ত মামলার কারণে থানায় হাজির হয়েছিলেন রাজেশ কুমার। সেখানে তিনি নিজেকে আইএএস অফিসার হিসেবে পরিচয় দেন এবং নিজের পদমর্যাদা জাহির করতে থাকেন। কোন কোন জেলায় পোস্টিং ছিল, কোন দপ্তরে কাজ করেছেন, সবই অনর্গল বলে যান। তাঁর কথাবার্তা ও আত্মবিশ্বাসে প্রথমে কেউ বিশেষ সন্দেহ করেননি। তবে থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের (SHO) মনে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাজের ধরন ও কথাবার্তার সঙ্গে রাজেশের দাবির কিছু অমিল নজরে আসে। সেই সন্দেহ থেকেই শুরু হয় প্রাথমিক অনুসন্ধান। বিভিন্ন সরকারি সূত্র মারফত রাজেশ কুমারের পরিচয় যাচাই করার চেষ্টা করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি কোনও সরকারি আধিকারিক নন। আইএএস হওয়া তো দূরের কথা, তাঁর নামে কোনও ক্যাডার রেকর্ডই নেই। এর পরেই রাজেশকে আটক করে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। তদন্তকারী এক আধিকারিক জানান, ‘প্রথমে রাজেশ নিজের দাবি আঁকড়ে ধরেছিলেন। কিন্তু টানা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ধীরে ধীরে তাঁর গল্পে ফাঁকফোকর ধরা পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি স্বীকার করেন যে, দীর্ঘ সাত বছর ধরে নিজেকে ভুয়ো আইএএস পরিচয়ে পরিচিত করিয়ে আসছেন।’ পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে রাজেশ জানান, তিনি চার বার ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষায় বসেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হন। আইএএস হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর বাবার। ছেলেকে প্রশাসনিক অফিসার হিসেবে দেখার ইচ্ছা পূরণ করতে না পারার হতাশা থেকেই এই ভুয়ো পরিচয়ের পথ বেছে নেন রাজেশ।
পুলিশ সূত্রে খবর, বাবার ‘ইচ্ছাপূরণ’ করতে গিয়ে প্রথমে ভুয়ো পরিচয়পত্র তৈরি করেন রাজেশ। পরে একটি গাড়ি ভাড়া নেন। সেই গাড়ির সামনে ভুয়ো নেমপ্লেট লাগানো হয়, যেখানে বড় করে লেখা ছিল ‘গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’। এই সাজসজ্জা আর আত্মবিশ্বাসী আচরণের জোরেই বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে আইএএস অফিসার বলে পরিচয় দিতেন তিনি। সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিতেন। কোথাও কোথাও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।এক পুলিশ আধিকারিকের জানান, ‘রাজেশ কোথায় কোথায় এই ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করেছেন, কারা তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এবং তিনি কোনও আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ তদন্তে উঠে এসেছে, গত সাত বছরে তিনি একাধিক জায়গায় নিজেকে উচ্চপদস্থ আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সুবিধা আদায় করেছেন। যদিও ঠিক কী পরিমাণ সুবিধা বা আর্থিক লাভ তিনি করেছেন, তা এখনও তদন্তাধীন। বস্তুত, এই ঘটনায় প্রশাসনিক মহলেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। একজন সাধারণ যুবক কী ভাবে এতদিন ধরে আইএএস পরিচয়ে ঘুরে বেড়াতে পারলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের সমাজে এখনও ‘আইএএস’ শব্দটির প্রতি এক ধরনের ভয় ও শ্রদ্ধা কাজ করে। সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছে রাজেশ কুমারের মতো প্রতারকেরা। ভুয়ো নেমপ্লেট, সরকারি গাড়ির ছাপ আর আত্মবিশ্বাসী আচরণ, এই তিনটি জিনিস একসঙ্গে থাকলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে।
বর্তমানে রাজেশ কুমারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা, ভুয়ো পরিচয়ে সরকারি আধিকারিক সেজে বেআইনি সুবিধা নেওয়া এবং নথি জালিয়াতির একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছে। পাশাপাশি, এই ঘটনায় কোনও চক্র জড়িত আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনা ফের একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, প্রশাসনিক পরিচয়ের অপব্যবহার কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি দপ্তরগুলিকেও আরও সতর্ক হতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। ভুয়ো আইএএস রাজেশ কুমারের কাহিনি এখন ঝাড়খণ্ড জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে, আর তাঁর সাত বছরের প্রতারণার জাল কতদূর ছড়িয়েছিল, তার উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mobile Recharge Cost in India | মোবাইল রিচার্জের বাড়তি চাপ: সংকটে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার, জরুরি পদক্ষেপের দাবি




