সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : জঙ্গলের পথে একটি মৃত হাতির দেহ পড়ে আছে (Elephant behaviour towards dead elephants)। সময় পেরিয়েছে, শরীরের অস্তিত্বও অনেকটাই মুছে গিয়েছে। পড়ে রয়েছে হাড়, খুলি কিংবা দাঁতের অংশ। সাধারণত সেখানে আর জীবিত কোনও প্রাণীর ফিরে আসার কথা নয়। কিন্তু হাতিদের ক্ষেত্রে ছবিটা অন্য রকম। মৃত সঙ্গীর দেহের অবশিষ্টাংশের কাছে তারা ফিরে আসে, শুঁড় দিয়ে ছুঁয়ে দেখে, গন্ধ নেয়, কখনও দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থানও করে। এবার দক্ষিণ কেনিয়ায় দীর্ঘদিন আগে মারা যাওয়া একটি আফ্রিকান সাভানা হাতির হাড়ের কাছে হাতিদের বারবার ফিরে আসার ঘটনা ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। গবেষণাটি হাতিদের মৃত্যু-পরবর্তী আচরণ নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এনেছে।
‘আফ্রিকান জার্নাল অফ ইকোলজি’ -তে (African Journal of Ecology) ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট প্রকাশিত গবেষণায় দক্ষিণ কেনিয়ার একটি হাতির মৃত্যুর স্থানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। গবেষকেরা সেখানে ক্যামেরা বসিয়ে প্রায় সাড়ে তিন মাস নজর রাখেন। ওই সময়ে হাতিদের মোট ৩৪টি পৃথক আগমনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সেখানে আসা হাতিদের অনেকেই পড়ে থাকা হাড়ের কাছে গিয়ে শুঁড় দিয়ে তা ছুঁয়েছে, গন্ধ নিয়েছে এবং কিছু সময় ধরে পরীক্ষা করেছে। গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হল, নথিবদ্ধ ঘটনাগুলির ৮৫.৩ শতাংশের সঙ্গে একাকী পুরুষ হাতি অথবা পুরুষ হাতিদের ব্যাচেলর দলের যোগ ছিল। এখানেই তৈরি হচ্ছে হাতিদের আচরণ নিয়ে নতুন কৌতূহল। এত দিন মৃত হাতির দেহের কাছে জীবিত হাতিদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বহু পর্যবেক্ষণ থাকলেও তার বেশির ভাগই মৃত্যুর পরপরই কী ঘটে, তা ঘিরে। কিন্তু দীর্ঘদিন আগে মারা যাওয়া হাতির অবশিষ্টাংশের কাছে কয়েক মাস পরেও হাতিদের ফিরে আসার ঘটনা অন্য একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে, মৃত সঙ্গীর উপস্থিতির কোনও স্মৃতি কি তাদের আচরণকে প্রভাবিত করে?
গবেষকেরা অবশ্য এই প্রশ্নের সরল উত্তর দিচ্ছেন না। হাতিরা মানুষের মতো করে কোনও জায়গাকে ‘সমাধিস্থল’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে ফিরে আসে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ এখনও নেই। মৃত হাতির হাড়, খুলি বা দাঁতের প্রতি তাদের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে, সেটি গবেষণায় বারবার দেখা গেলেও তার মানসিক অর্থ মানুষের শোকপ্রকাশের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। গবেষণার পর্যবেক্ষণ থেকে আচরণের ধরন জানা যায়, কিন্তু সেই আচরণের অন্তর্নিহিত অনুভূতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো আরও কঠিন। হাতির মৃতদেহ ও দেহাবশেষ নিয়ে আগ্রহের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। ২০০৫ সালে ‘বায়োলজি লেটার্স’ (Biology Letters) -এ প্রকাশিত একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় আফ্রিকান হাতিদের সামনে হাতির খুলি, দাঁত এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বস্তু রাখা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর খুলি বা সাধারণ প্রাকৃতিক বস্তুর তুলনায় হাতিরা নিজেদের প্রজাতির খুলি ও হাতির দাঁতের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। সেই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আত্মীয়তার প্রশ্ন।
দীর্ঘদিন ধরে এমন ধারণা রয়েছে যে হাতিরা হয়ত নিজেদের পরিচিত বা আত্মীয় মৃত হাতির হাড় আলাদা করে চিনতে পারে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় মৃত আত্মীয় হাতির খুলি অন্য হাতির খুলি থেকে আলাদা করে বেছে নেওয়ার মতো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, মৃত আত্মীয়ের প্রতি কোনও নির্দিষ্ট স্মৃতি কাজ করছে কি না, সে বিষয়ে গবেষণার ফল এখনও নিশ্চিত নয়। বরং হাতির নিজের প্রজাতির দেহাবশেষের প্রতিই সামগ্রিক আকর্ষণ থাকার সম্ভাবনা উঠে এসেছে। এই তথ্য সাম্প্রতিক কেনিয়ার পর্যবেক্ষণকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ, হাড়ের কাছে ফিরে আসা হাতিদের আচরণকে শুধুমাত্র পুরনো পরিচিতির স্মৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। হাতির দেহাবশেষের প্রতি তাদের প্রজাতিগত কৌতূহলও এর একটি কারণ হতে পারে। আবার গন্ধ, স্পর্শ, স্থান-স্মৃতি কিংবা সামাজিক আচরণের মতো একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে কি না, সেটিও গবেষণার বিষয়।
হাতিদের সামাজিক জীবনও এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকান হাতিদের পরিবারভিত্তিক দলে সাধারণত মা হাতি এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে সামাজিক কাঠামো তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে একই দলের সদস্যরা একসঙ্গে চলাফেরা করে। ফলে কোনও সদস্যের মৃত্যু দলের অন্যদের আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে কোনও প্রাণীর আচরণে পরিবর্তন দেখা গেলেই সেটিকে মানুষের মতো শোকের অনুভূতি বলে ধরে নেওয়া যায় না। আচরণের পর্যবেক্ষণ এবং সেই আচরণের মানসিক ব্যাখ্যা এই দু’টি বিষয় আলাদা। শুধু আফ্রিকান হাতি না, এশীয় হাতিদের (Asian Elephant) ক্ষেত্রেও মৃত্যুর সময় বা মৃত্যুর পরে একই ধরনের কৌতূহল দেখা গিয়েছে। ভারতীয় বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (Indian Institute of Science) ও কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের (Kyoto University) গবেষকদের করা পর্যবেক্ষণে মুক্তভাবে বিচরণকারী এশীয় হাতিদের তিনটি ঘটনায় মৃত বা মৃত্যুপথযাত্রী হাতির কাছে এগিয়ে যাওয়ার আচরণ নথিবদ্ধ হয়েছিল। তারা মৃতদেহ শুঁকে দেখেছে, পরীক্ষা করেছে এবং মৃত্যুর আগে অসুস্থ হাতির ক্ষেত্রে শারীরিক ভাবে তাকে সহায়তা করার আচরণও দেখা গিয়েছে।
এই তিনটি ঘটনার মধ্যে বিশেষ করে একটি বিষয় গবেষকদের নজর কেড়েছিল। মৃত্যুপথযাত্রী বাছুরের পাশে থাকা একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী হাতি ঘন ঘন উচ্চস্বরে ডাকছিল। অন্য হাতিরা মৃত বা মৃত্যুর মুখে থাকা সদস্যের কাছে এগিয়ে গিয়ে শুঁড় দিয়ে পরীক্ষা করেছিল। এই পর্যবেক্ষণ থেকে গবেষকেরা মনে করেন, এশীয় হাতিরাও নিজেদের প্রজাতির সদস্যের মৃত্যু সম্পর্কে কোনও ধরনের সচেতনতা বা মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তবে এখানেও গবেষণাটি সম্ভাবনার কথা বলেছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। মৃত হাতির হাড়ের কাছে ফিরে আসার ঘটনাকে আরও একটি দিক থেকে দেখা যায়। হাতিদের শুঁড় তাদের প্রধান স্পর্শ ও ঘ্রাণগ্রহণের অঙ্গ। কোনও বস্তু সম্পর্কে জানতে তারা শুঁড় ব্যবহার করে। ফলে মৃত হাতির হাড়ের কাছে গিয়ে বারবার শোঁকা বা স্পর্শ করা তাদের তথ্য সংগ্রহের স্বাভাবিক আচরণের অংশও হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের প্রজাতির দেহাবশেষের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখানোর পরীক্ষামূলক ফল এই আচরণকে সাধারণ কৌতূহলের চেয়ে আলাদা মাত্রা দেয়।
সাম্প্রতিক কেনিয়ার গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। পর্যবেক্ষণটি কোনও সদ্য মৃত হাতিকে ঘিরে ছিল না; বরং অনেক আগেই মারা যাওয়া একটি পুরুষ আফ্রিকান সাভানা হাতির মৃত্যুর স্থানে করা হয়েছিল। ক্যামেরায় বারবার হাতিদের ফিরে আসার ঘটনা ধরা পড়েছে। ফলে মৃত্যুর পর কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে হাতিদের আচরণ পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু, এই গবেষণা থেকে ‘হাতিরাও মানুষের মতো সমাধিস্থলে যায়’ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। গবেষণাপত্রে দীর্ঘদিনের মৃত হাতির হাড়ের কাছে হাতিদের উপস্থিতি ও তাদের স্পর্শ-ঘ্রাণের আচরণ নথিবদ্ধ হয়েছে। কেন তারা ফিরে আসে, তার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট জায়গাকে মানুষের কবর বা সমাধিস্থলের সমতুল্য হিসেবে তারা বুঝতে পারে কি না, তার প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া যায়নি। প্রাণীর আচরণকে তার নিজস্ব পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বোঝার প্রয়োজন রয়েছে। হাতিদের এই আচরণ তাই প্রাণীজগতের মৃত্যু-চেতনা নিয়ে গবেষণার একটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
নিজেদের প্রজাতির মৃত সদস্যের দেহাবশেষের প্রতি এত গভীর আগ্রহ অন্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। কেন হাতিরা হাড়, খুলি বা দাঁতের কাছে ফিরে আসে, সেই আচরণে স্মৃতি, ঘ্রাণ, সামাজিক সম্পর্ক, কৌতূহল এবং পরিবেশগত তথ্য, কোনটির কতটা ভূমিকা রয়েছে, তা জানতে আরও লম্বা গবেষণা প্রয়োজন। দক্ষিণ কেনিয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বহু বছরের গবেষণা, আফ্রিকান হাতির নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা ও এশীয় হাতির মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ। সব মিলিয়ে হাতিদের সামাজিক আচরণ ও মৃত্যুর প্রতি প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণার পরিসর আরও বড় হচ্ছে। আর সেই গবেষণা আমাদের সামনে এমন এক প্রাণীজগতের ছবি তুলে ধরছে, যেখানে মৃত্যু কেবল জীবনের সমাপ্তি নয়, মৃত সদস্যের দেহাবশেষও জীবিতদের আচরণে দীর্ঘ সময় ধরে কোনও না কোনও প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Smriti Mandhana record, Smriti Mandhana highest run scorer | ইতিহাস লিখলেন স্মৃতি মন্ধানা! টি-২০ ক্রিকেটে সবাইকে টপকে নতুন রেকর্ড ভারতের তারকার




