সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক প্রস্তুতি কী অবস্থায়, কোথায় অতিরিক্ত সতর্কতার প্রয়োজন, কোন কোন অঞ্চলকে ‘সেন্সিটিভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, এসব খতিয়ে দেখতে রাজ্য ও কেন্দ্রের মোট ২৫টি সংস্থাকে নিয়ে বৃহস্পতিবার কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল (Manoj Kumar Agarwal) -এর দফতরে এই বৈঠকটি হয়, যা নির্বাচন-পূর্ব প্রস্তুতি পর্বে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রশাসনের অনেকেই।
কমিশন সূত্রে জানা যায়, এটি একটি ‘রুটিন প্রি-ইলেকশন কনসালটেশন’ হলেও চলতি রাজনৈতিক আবহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ বছরের আলোচনাটি আরও গভীর ও তথ্যনির্ভর ছিল। সিইও মনোজকুমার আগরওয়াল আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “নির্বাচন ঘোষণার পরে প্রতিটি সংস্থার পারস্পরিক সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। মাঠপর্যায়ে যাতে কোনও সমস্যার সৃষ্টি না হয়, সেই লক্ষ্যেই আগেভাগে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।” এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের ডিজি, কলকাতা পুলিশের পুলিশ কমিশনার, বিএসএফ (BSF), এসএসবি (SSB), সিআইএসএফ (CISF) এবং আরপিএফ (RPF) -এর প্রতিনিধিরা। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে ডাকা হয়েছিল কলকাতায় ইডির বিশেষ ডিরেক্টরকেও। নিরাপত্তা ও আর্থিক নজরদারির দিকটি খতিয়ে দেখতেই তাঁদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান সিইও দফতরের এক আধিকারিক।
প্রাক-নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কমিশন প্রতিটি সংস্থার কাছ থেকে তাদের নিজস্ব অঞ্চল বা বিভাগের পরিস্থিতি সংক্রান্ত রিপোর্ট সংগ্রহ করেছে। কোথায় বেআইনি আর্থিক লেনদেনের ঝুঁকি রয়েছে, কোন এলাকার সীমান্তে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন, কোথায় আইনশৃঙ্খলার সম্ভাব্য সমস্যা রয়েছে, এসব তথ্যই নির্বাচনের আগে কমিশনের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় বড় ভূমিকা পালন করবে। বৈঠকে পরিবহণ দফতরের সচিব, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কর্তা এবং উপকূলরক্ষী বাহিনীর প্রতিনিধিকে ডেকে কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, নির্বাচনের সময় মানুষের চলাচল, সংবেদনশীল পণ্য পরিবহণ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নজরদারিতে কোনও ফাঁক রাখা যাবে না। পরিবহণ দফতরের এক কর্তা বৈঠকে জানান, “নির্বাচনের সময় অতিরিক্ত নজরদারি ও রুট ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই তৈরি করা হচ্ছে।”
এ দিন আয়কর দফতর, এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ, শুল্ক দফতর এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আঞ্চলিক ডিরেক্টরও বৈঠকে তাঁদের রিপোর্ট জমা দেন। নির্বাচন ঘোষণার পর বেআইনি অর্থের প্রবাহ রোধ ও হঠাৎ নগদ অর্থের গতিবিধি নজরে রাখতে কমিশন তাদের বিশেষ ভূমিকা চিহ্নিত করেছে। আয়কর বিভাগের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, “নির্বাচন-সংক্রান্ত আর্থিক অসাধুতা রুখতে বিশেষ টিম তৈরি থাকবে এবং কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী রিপোর্ট দেওয়া হবে।”
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ডাক বিভাগ, বন দফতর, এমনকি বিভিন্ন পরিকাঠামো সংক্রান্ত সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদেরও ডাকা হয়। ডাক বিভাগের ভূমিকা সম্পর্কে কমিশনের বক্তব্য, “ভোটার তালিকা, পোস্টাল ব্যালট এবং নির্বাচনী নথিপত্র নিরাপদে পরিবহণে কোনও ঝুঁকি রাখা যাবে না।” বনদফতরের প্রতিনিধি জানান যে, জঙ্গল লাগোয়া কিছু এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হবে। কমিশন স্পষ্ট করে দেয়, নির্বাচনের আগে এমন বৈঠকগুলি মূলত নিরাপত্তা, প্রশাসনিক কাঠামো, পরিবহণ, আর্থিক নজরদারি এবং কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ সমন্বয় কতটা মজবুত, তা যাচাই করতেই ডাকা হয়। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এই বৈঠকে যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই আগামী দিনে জেলাভিত্তিক নিরাপত্তা মোতায়েন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর চাহিদা, বিশেষ নজরদারি অঞ্চল নির্ধারণ এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের কাজের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হবে। একজন শীর্ষ কমিশন কর্তার কথায়, “নির্বাচনের সময় কোনও অংশেই যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত না হয়, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। কমিশন আগেভাগেই প্রতিটি দফতরকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার নির্দেশ দিচ্ছে।”
বৈঠকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর একজন কর্তা জানান, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে আগাম নজরদারি বাড়ানো হবে। তাঁর কথায়, “প্রতিবার নির্বাচনের সময়ে কিছু সীমান্ত অঞ্চলকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়, এ বারও সেই জায়গাগুলিতে বিশেষ ফোর্স মোতায়েনের পরিকল্পনা চলছে।” উল্লেখ্য যে, সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন এবার আগের তুলনায় আরও সমন্বিত ও সুসংগঠিতভাবে রাজ্য প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করতে চাইছে। রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ার আগেই এই ধরনের বিস্তৃত বৈঠক কমিশনের প্রস্তুতি কতটা দৃঢ়, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগাম তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে কমিশন দ্রুত মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করবে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kolkata High Court Club election results, BJP supported lawyers win | কলকাতা হাই কোর্ট ক্লাব নির্বাচনে বিজেপি সমর্থিত আইনজীবীদের ঐতিহাসিক জয়, ‘পরিবর্তনের হাওয়া বইছে আইনি অঙ্গনেও’ বললেন শমীক ভট্টাচার্য




