শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দীপাবলি (Diwali) বা আলোর উৎসব ভারতের অন্যতম মহা উদযাপিত উৎসব, যা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এক জীবনের উৎসব, আলোর জয়গান, মঙ্গল ও সমৃদ্ধির আহ্বান। ২০২৫ সালে দীপাবলি পড়ছে ২০ অক্টোবর, সোমবার, হিন্দু চন্দ্র ক্যালেন্ডারের কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে। পাঁচদিনব্যাপী এই উৎসব শুরু হবে ধনতেরাস (Dhanteras) দিয়ে এবং শেষ হবে ভাই দুজ (Bhai Dooj)-এর সঙ্গে।
এই সময়টিকে শুভ ও ঐশ্বর্যবাহী করে তুলতে প্রদীপ (Diyas) জ্বালানোর রীতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। প্রতিটি প্রদীপই প্রতীক আলো, জ্ঞান, মঙ্গল ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর জয়ের। দীপাবলির আগের দিনগুলোতে ধনতেরাস, ছোট দীপাবলি (Chhoti Diwali বা Kali Chaudas) এবং বড় দীপাবলি (Badi Diwali) প্রতিদিনের প্রদীপ জ্বালানোর আলাদা অর্থ, সংখ্যা ও স্থান নির্দিষ্ট রয়েছে। চলুন দেখি, এই পবিত্র দিনগুলোতে কতটি প্রদীপ জ্বালানো উচিত এবং কেন তা শুভ বলে বিবেচিত। দীপাবলির আগের দিন ধনতেরাস, যা “ধনত্রয়োদশী” নামেও পরিচিত, অর্থাৎ সম্পদের দেবতা কুবের (Kuber) ও স্বাস্থ্যদেব ধন্বন্তরীর (Dhanvantari) পূজার দিন। এই দিনে ১৩টি প্রদীপ জ্বালানো শুভ মনে করা হয়। প্রতিটি প্রদীপ জীবনের এক একটি শুভ দিককে নির্দেশ করে অর্থ, স্বাস্থ্য, সম্পদ, শান্তি, জ্ঞান, পরিবার, সম্পর্ক, সুখ, প্রাচুর্য, ভাগ্য, অধ্যবসায়, ধৈর্য ও আলোর প্রতীক। প্রদীপগুলি ঘরের প্রবেশদ্বারে, রান্নাঘরে ও পূজা ঘরে স্থাপন করা হয়। প্রবেশদ্বারের প্রদীপ অতিথি ও সমৃদ্ধিকে আহ্বান জানায়, রান্নাঘরের প্রদীপ স্বাস্থ্য ও প্রাচুর্য এনে দেয় এবং পূজা ঘরের প্রদীপ ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি নিবেদন করে। ছোট দীপাবলি বা কালী চৌদ্দশী, দীপাবলির আগের দিন পালিত হয়, যা পাপমোচন ও আত্মার শুদ্ধতার প্রতীক। এদিন ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়, যা চৌদ্দ ইয়মদূতের (Yam Doot) প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং অশুভ শক্তি দূর করার প্রতীক। অনেকে একটি বড় থালায় ১১টি প্রদীপ সাজিয়ে মাঝখানে একটি চারমুখী প্রদীপ (four-faced diya) স্থাপন করেন। প্রথমে এই প্রদীপটি জ্বালানো হয়, তারপর বাকিগুলি। কেউ কেউ প্রদীপে একটু গুড় বা চিনি যোগ করেন, জীবনের মাধুর্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে।
দীপাবলির প্রধান দিন বা বড় দীপাবলি, যা লক্ষ্মী পূজা (Lakshmi Puja) নামেও পরিচিত, সেদিন ঘর, বারান্দা ও উঠোনে অগণিত প্রদীপ জ্বালানো হয়। এই আলো শুধু ঘরের অন্ধকার নয়, জীবনের অন্ধকারও দূর করে। বিশ্বাস করা হয়, মা লক্ষ্মী (Goddess Lakshmi) সেদিন আলো অনুসরণ করে ঘরে প্রবেশ করেন। তাই ঘরের প্রতিটি কোণ, জানালা, বারান্দা, বাগান সব জায়গায় প্রদীপ জ্বালানো শুভ। কেউ কেউ ঘরের প্রতিটি ঘরে অন্তত ১১টি প্রদীপ জ্বালান, কেউ আবার বারান্দা ও প্রবেশপথে ২১টি প্রদীপ রাখেন, যা সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য ও আলোর আশীর্বাদের ঐতিহ্য। এই রীতি কেবল ধর্মীয় নয়, বরং মানসিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রদীপের নরম শিখা ঘরের মধ্যে ইতিবাচক শক্তি তৈরি করে, পরিবেশে শান্তি ও প্রশান্তি আনে। আধুনিক বিজ্ঞানও বলে, প্রদীপে ব্যবহৃত ঘি বা সরষের তেলের গন্ধ জীবাণু নাশক ও প্রশান্তিদায়ক।
আধ্যাত্মিক অর্থে, প্রদীপ জ্বালানো মানে নিজের অন্তরের অন্ধকার দূর করা। প্রতিটি প্রদীপ এক একটি আশা, এক একটি নতুন সূচনার প্রতীক। তাই পরিবারের সবাই মিলে প্রদীপ জ্বালানো মানে একসাথে আলো, ঐক্য ও ভালোবাসার পথ বেছে নেওয়া। তবে প্রদীপ জ্বালানোর সময় কিছু সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। আগুনের কাছাকাছি কাপড় বা কাগজ রাখবেন না, শিশুদের হাতের নাগালে প্রদীপ রাখবেন না এবং নিশ্চিত করুন যে প্রদীপ কখনও অযত্নে না থাকে। নিরাপত্তার পাশাপাশি শুদ্ধ মন ও প্রার্থনা, এই দুই-ই দীপাবলির আসল সৌন্দর্য।
এই বছর দীপাবলিতে আপনি চাইলে নিজের ঘরের প্রতিটি দিক উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে একটি করে প্রদীপ রাখতে পারেন, যা দিকপাল দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঘরে ভারসাম্য ও শান্তির প্রতীক। অনেক জ্যোতিষ বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের দীপাবলিতে যদি ঘরের উত্তর-পূর্ব কোণে ঘি-ভর্তি প্রদীপ রাখা হয়, তা সৌভাগ্য ও সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এছাড়াও, পূজার সময় “ওম মহালক্ষ্ম্যৈ নমঃ” মন্ত্র উচ্চারণ করলে আরও শুভ ফল মেলে। দীপাবলি কেবল আলোর উৎসব নয়, এটি আমাদের হৃদয়ের অন্ধকার দূর করার উৎসব। প্রতিটি প্রদীপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়– অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি ছোট আলোই তা দূর করতে যথেষ্ট। তাই ২০২৫ সালের দীপাবলিতে প্রদীপ জ্বালানোর সময় শুধু আলোকসজ্জা নয়, নিজের আত্মার মধ্যে আলো জ্বালানোর প্রার্থনা করুন।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Diwali Candles | দীপাবলির ঝলমলে বাজারে দুলছে লাড্ডু-মোমবাতি, রসমালাই-জিলিপি আকারের রঙিন আলোর খেলা




