বিনীত শর্মা ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘদিন সহবাসের পর কুষ্ঠি না মেলার অজুহাতে বিয়ে করতে অস্বীকার করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে, এমনি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করল দিল্লি হাই কোর্ট (Delhi High Court)। এই পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত এক যুবকের জামিনের আবেদন খারিজ করেছে আদালত। ‘প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ক স্থাপন, পরে কুণ্ডলী না মেলার কারণ দেখিয়ে বিয়ে এড়ানো আইনসম্মত নয়’ শুনানিতে এমন মন্তব্যই উঠে আসে বলে উল্লেখ। উল্লেখ্য, ১৭ ফেব্রুয়ারি বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস এবং পরবর্তী সময়ে বিয়েতে অস্বীকৃতির অভিযোগ সংক্রান্ত একটি মামলা দিল্লি হাই কোর্টে ওঠে। অভিযুক্ত যুবক জামিনের আবেদন করেন। মামলাটি শোনেন বিচারপতি Swarna Kanta Sharma (স্বর্ণকান্ত শর্মা)। শুনানির সময় তিনি বলেন, ‘আগে বিয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সেই ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পরে কুণ্ডলী না মেলার অজুহাতে বিয়ে না করা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৯ ধারার আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’

মামলার নথি অনুযায়ী অভিযোগকারী তরুণীর দাবি, তিনি অভিযুক্তের সঙ্গে প্রায় আট বছর ধরে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েই যুবক তাঁর সঙ্গে সহবাস করেন। সময়ের সঙ্গে বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলেও অভিযুক্ত নাকি জানান, কুষ্ঠি না মেলায় তিনি বিয়ে করতে পারবেন না। এই ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের করেন তরুণী। পরে পরিস্থিতি অন্য মোড় নেয়। অভিযোগ রয়েছে, যুবক পুনরায় বিয়ের আশ্বাস দেন। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে তরুণী প্রথম অভিযোগ প্রত্যাহার করেন। কিন্তু বিয়ে আর হয়নি। আবারও ওই তরুণী থানায় অভিযোগ জানান। দ্বিতীয়বার দায়ের হওয়া মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই বিষয়টি আদালতে গড়ায়। অভিযুক্ত পক্ষ জামিনের আবেদন করলে তা খারিজ হয়।
আদালতে শুনানির সময় বিচারপতি বলেন, ‘বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘ সময় সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পরবর্তীতে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণ দেখিয়ে সরে আসা আইনের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়, যদি প্রাথমিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে থাকে।’ তাঁর মতে, এমন ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং উদ্দেশ্য বিচার করা প্রয়োজন।উল্লেখ্য, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, যা সাম্প্রতিক ফৌজদারি আইন সংস্কারের অংশ, সেখানে প্রতারণামূলক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ‘যদি প্রমাণিত হয় যে বিয়ের আশ্বাস কেবলমাত্র সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল, এবং পরে তা অস্বীকার করা হয়েছে, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।’ অভিযোগকারী তরুণীর বক্তব্য, ‘আমি বিশ্বাস করেছিলাম। দীর্ঘ আট বছর একসঙ্গে থেকেছি। শেষে কুষ্ঠি না মেলার কথা বলে সব সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া হয়।’ তাঁর দাবি, এই ঘটনার ফলে তিনি মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন।
অভিযুক্তের আইনজীবী অবশ্য আদালতে যুক্তি দেন, ‘দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিতেই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিয়ের প্রসঙ্গে মতবিরোধ হওয়া অপরাধ হতে পারে না।’ তবে আদালত প্রাথমিকভাবে সেই যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি। জামিনের আবেদন খারিজ করে বিচারপতি জানান, মামলার তদন্ত চলুক, তারপরই পরবর্তী পদক্ষেপ। এই পর্যবেক্ষণ সামাজিক ও আইনি পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশেষত দীর্ঘস্থায়ী লিভ-ইন সম্পর্ক এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত মামলায় আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আইন প্রযোজ্য, এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফল গুরুতর হতে পারে, যদি তা প্রতারণার পর্যায়ে পৌঁছয়। আইন বিশেষজ্ঞ মহলে মত উঠেছে, এমন মামলায় প্রমাণের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিশ্রুতি আদৌ ছিল কি না, তা কি বিশ্বাসযোগ্য, এবং সম্পর্কের প্রকৃতি কী ছিল? সব দিক বিবেচনায় নিয়েই আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আপাতত অভিযুক্তকে হেফাজতেই থাকতে হবে। দিল্লি হাই কোর্টের এই মন্তব্য ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলায় নজির হিসেবে উত্থাপিত হতে পারে। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ক স্থাপন এবং পরে কুষ্ঠি না মেলার মতো কারণ দেখিয়ে সরে আসার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা যে তৈরি হতে পারে, তা এবার আরও একবার সামনে এল। এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে নজর রয়েছে আইনজ্ঞদের। আদালতের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তও আইনের কাঠামোর বাইরে নয়, এই বার্তাই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election Phases | এক দফা না তিন? পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের সূচি নিয়ে দিল্লীতে তুমুল জল্পনা, কেন্দ্রীয় বাহিনীই চাবিকাঠি




