সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণের আইন আরও কড়া করার প্রস্তাব ঘিরে এবার বিতর্ক পৌঁছল আন্তর্জাতিক পরিসরেও। মেঘালয়ের তুরা কেন্দ্রের কংগ্রেস সাংসদ সালেং এ. সাংমা (Saleng A. Sangma) জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত Foreign Contribution (Regulation) Amendment Bill, 2026 বা FCRA সংশোধনী বিল নিয়ে তিনি একাধিক বিদেশি প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইংল্যান্ড, মেক্সিকো, আফ্রিকার কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের কাছে তাঁর আবেদন, ভারতের সরকারের সামনে বিলটি নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে ওঠা আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরা হোক। সাংমার এই উদ্যোগ সামনে আসার পর FCRA বিলের রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। কারণ, বিলটি এখন আর সরাসরি সংসদে পাশের পর্যায়ে নেই। ২০২৬ সালের ১২ অগস্ট লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিলটিকে যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ৩১ সদস্যের ওই কমিটির চেয়ারম্যান বিজেপি সাংসদ সঞ্জয় জয়সওয়াল (Sanjay Jaiswal)। কমিটিতে লোকসভা থেকে ২১ জন এবং রাজ্যসভা থেকে ১০ জন সদস্য রয়েছেন। বিলটি খতিয়ে দেখে শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার কথা রয়েছে।
FCRA সংশোধনী বিলের কেন্দ্রীয় বিতর্কের জায়গাগুলির মধ্যে রয়েছে বিদেশি অনুদানে তৈরি সম্পত্তির ভবিষ্যৎ। বর্তমান প্রস্তাব অনুযায়ী কোনও প্রতিষ্ঠানের FCRA নিবন্ধন বাতিল হলে, সংস্থা নিজে তা সমর্পণ করলে, অথবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বিদেশি অনুদান এবং সেই অর্থে তৈরি সম্পত্তি একটি কেন্দ্রীয় ভাবে নির্ধারিত Designated Authority-এর অধীনে যেতে পারে। এমনকী বিদেশি অর্থের পাশাপাশি অন্য অর্থেও তৈরি কোনও সম্পত্তি এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে বলে বিলের সারাংশে উল্লেখ রয়েছে। এই বিধান নিয়েই উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উদ্বেগ সামনে এসেছে। মেঘালয়ে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্র, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি অনুদানের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করে থাকে। তাঁদের আশঙ্কা, FCRA নিবন্ধন নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু ভবিষ্যতে বিদেশি অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা পরিকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সালেং সাংমা বিলটিকে ‘draconian’ বা অত্যন্ত কঠোর বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে কাজ করে আসা প্রতিষ্ঠানগুলির উপর প্রস্তাবিত বিধানের প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। তিনি মনে করছেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপত্তি সংসদীয় আলোচনায় যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিনিধিদের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তবে সাংমার এই পদক্ষেপ নিয়েই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক প্রশ্ন। ভারতের কোনও আইন নিয়ে আপত্তি থাকলে তার সাংবিধানিক ও সংসদীয় পরিসরেই সেই আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। FCRA সংশোধনী বিলও বর্তমানে সেই সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। ফলে বিদেশি কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের কাছে ভারতের একটি প্রস্তাবিত আইন নিয়ে সরকারের উপর চাপ তৈরির আবেদন কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। বিরোধী শিবিরের যুক্তি, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলির উদ্বেগ বৃহত্তর পরিসরে আলোচনায় আসতে পারে। অন্যদিকে শাসক পক্ষের বক্তব্য, ভারতের আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের বিষয় সংসদীয় কাঠামোর মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। উল্লেখ্য, কেন্দ্রের অবস্থানও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বক্তব্য, FCRA ব্যবস্থার উদ্দেশ্য বিদেশি অনুদানের ব্যবহারকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা এবং বিদেশি অর্থের অপব্যবহার রোধ করা। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত Designated Authority-এর মাধ্যমে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার যে কাঠামো তৈরি হচ্ছে, তার লক্ষ্য ব্যক্তিগত ভাবে কোনও সরকারি আধিকারিকের হাতে সম্পত্তি তুলে দেওয়া নয়। সরকারি FAQ-তে বলা হয়েছে, নিবন্ধন বাতিল বা অন্য কোনও কারণে FCRA অবস্থান শেষ হলে সম্পত্তি প্রথমে সাময়িক ভাবে কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকবে; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিবন্ধন পুনর্বহাল হলে সম্পত্তি ও অব্যবহৃত অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ধর্মীয় উপাসনাস্থলের ধর্মীয় চরিত্র বজায় রাখার কথাও সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে।
অন্যদিকে বিলটির সমালোচকেরা মূলত প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিধি এবং সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সংসদীয় কমিটির প্রথম দিকের আলোচনাতেও সম্পত্তি গ্রহণের বিধান নিয়ে সদস্যদের প্রশ্নের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে বিষয়টি শুধু বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কোনও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের পরিকাঠামো, তার ব্যবহার এবং FCRA নিবন্ধনের সঙ্গে সেই সম্পত্তির সম্পর্ক নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে. সাংমাও (Conrad K. Sangma) এর আগে গীর্জা ও ধর্মীয় সংগঠনগুলির উদ্বেগ কেন্দ্রের কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে প্রতিনিধি দলের বৈঠকের মাধ্যমে সংশোধনী নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছেন। FCRA বিল যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, গীর্জা, ধর্মীয় সংগঠন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উদ্বেগ খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে মেঘালয়ের আর এক সাংসদ জেমস পি. কে. সাংমাকে (James P. K. Sangma) FCRA বিল পরীক্ষা করা যৌথ সংসদীয় কমিটির বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। ফলে মেঘালয়ের পক্ষ থেকে সংসদীয় আলোচনার ভিতরেও মতামত জানানোর একটি অতিরিক্ত সুযোগ তৈরি হয়েছে। কমিটির প্রথম বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা বিলটি নিয়ে সদস্যদের সামনে বক্তব্য রাখেন।
FCRA আইন মূলত বিদেশি অনুদান গ্রহণ ও ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২৬ সালের সংশোধনী প্রস্তাবে সেই ব্যবস্থার পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে। ফলে একটি দিকে কেন্দ্রের দাবি, বিদেশি অর্থের ব্যবহারে জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন। অন্য দিকে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠনের আশঙ্কা নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে গিয়ে বৈধ সামাজিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ধর্মীয় কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি সমস্যায় পড়তে পারে। এই দুই অবস্থানের মধ্যেই এখন যৌথ সংসদীয় কমিটির পরবর্তী আলোচনার গুরুত্ব বেড়েছে। সালেং সাংমার বিদেশি প্রতিনিধিদের কাছে আবেদন তাই FCRA সংশোধনী বিলের বিতর্কে একটি আলাদা রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিলের বিষয়বস্তু, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলির উদ্বেগ এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার সিদ্ধান্ত, তিনটি বিষয় এখন একই আলোচনায় জড়িয়ে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সংশোধনীতে কী পরিবর্তন আসে, যৌথ সংসদীয় কমিটি কী সুপারিশ করে এবং কেন্দ্র সেই সুপারিশের কতটা গ্রহণ করে, তার উপরই পরবর্তী রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের দিক অনেকটাই নির্ভর করবে। আপাতত FCRA Bill 2026 নিয়ে আলোচনা সংসদের কমিটি, কেন্দ্রীয় সরকার, বিরোধী দল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে চলমান রয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nirmala Sitharaman on 10 percent growth | India economic growth : ৭.৮ শতাংশ থেকে ১০-এর ঘরে যেতে পারে! ভারতের অর্থনীতি নিয়ে বড় আশার কথা শোনালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন




