সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পুজোর আবহের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে (BJP West Bengal) বড়সড় সাংগঠনিক পরিবর্তন। রাজ্য কমিটি থেকে একাধিক পরিচিত নেতা ও মন্ত্রীকে সরিয়ে নতুন মুখকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়েছে। যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় (Sharbari Mukherjee), মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul), তাপস রায় (Tapas Roy) ও জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (Jagannath Chattopadhyay) -এর মতো নেতাদের সাংগঠনিক দায়িত্বে আর রাখা হয়নি। পাশাপাশি যুব মোর্চা, মহিলা মোর্চা, ওবিসি মোর্চা ও এসসি মোর্চার নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত নতুন সাংগঠনিক বিন্যাসে একাধিক জেলায় সভাপতির পদেও বদল হয়েছে। দলের নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই দল ও সরকারের দায়িত্ব আলাদা রাখার বিষয়টি সামনে এসেছিল। সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মন্ত্রিসভায় থাকা নেতাদের সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের খবর।
অগ্নিমিত্রা পাল, তাপস রায় এবং জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে রাজ্য সরকারের মন্ত্রী। ফলে তাঁদের প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি দলীয় সাংগঠনিক পদ সামলানোর পরিবর্তে সংগঠনের কাজে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা হয়েছে। তবে শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। তিনি মন্ত্রী নন, যাদবপুরের বিধায়ক ও রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। নতুন কমিটিতে তাঁকে সাধারণ সম্পাদকের পদে রাখা হয়নি। সাম্প্রতিক কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর সংগঠন থেকে বাদ পড়ার সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত এবং সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তবে বিজেপির তরফে তাঁর অপসারণের কারণ হিসেবে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত অভিযোগকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সামনে আনা হয়েছে কি না, তা পৃথক বিষয়। অন্যদিকে, নতুন কমিটিতে মহিলা মোর্চার নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন হয়েছে। এত দিন এই দায়িত্বে ছিলেন ফাল্গুনী পাত্র (Falguni Patra)। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব পেয়েছেন অভিনেত্রী অঞ্জনা বসু (Anjana Basu)। বাংলা টেলিভিশনের পরিচিত মুখ অঞ্জনা বসু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে দলের সাংগঠনিক পরিসরে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। এবার মহিলা মোর্চার রাজ্য সভানেত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
যুব মোর্চাতেও নেতৃত্ব বদল হয়েছে। ডা. ইন্দ্রনীল খাঁকে (Dr Indranil Kha) সরিয়ে আমতার বিধায়ক অমিত সামন্তকে (Amit Samanta) যুব মোর্চার সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের তরুণ সংগঠনকে সামনে রেখে এই পদটি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। বিধায়ক হিসেবে অমিত সামন্তের রাজনৈতিক ভূমিকার পাশাপাশি এবার যুব সংগঠন পরিচালনার দায়িত্বও তাঁর হাতে এল। ওবিসি মোর্চায় নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন ধনঞ্জয় ঘোষ (Dhananjay Ghosh)। অন্য দিকে এসসি মোর্চার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিশ্বজিৎ বিশ্বাসকে (Biswajit Biswas)। অর্থাৎ শুধু রাজ্য কমিটির শীর্ষ পদে পরিবর্তন নয়, বিজেপির বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক শাখাতেও নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় নতুন নেতৃত্বকে জায়গা দেওয়ার প্রবণতাই এই পরিবর্তনে দেখা যাচ্ছে।
রাজ্য কমিটির পাশাপাশি জেলা স্তরেও বড় পরিবর্তন করা হয়েছে। সাতটি সাংগঠনিক জেলার সভাপতির পদে নতুন মুখ আনা হয়েছে। বনগাঁ, বারাসত, শ্রীরামপুর, আরামবাগ, মেদিনীপুর, বর্ধমান এবং কাটোয়া সাংগঠনিক জেলায় নেতৃত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে। বারাসতে দীপঙ্কর চক্রবর্তী (Dipankar Chakraborty), বনগাঁয় নৃপেন বিশ্বাস (Nripen Biswas), শ্রীরামপুরে শশী সিং (Shashi Singh), আরামবাগে প্রশান্ত দিগর (Prashanta Digar), মেদিনীপুরে সৌমেন তিওয়ারি (Soumen Tiwari), বর্ধমানে আশিস পাল (Ashis Pal) এবং কাটোয়ায় মানিক রায় (Manik Ray) নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন বলে রাজ্য বিজেপি সূত্রের খবর। জেলা সংগঠনে এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। কলকাতা ও হাওড়া-সহ একাধিক পুরসভায় ভোটের প্রস্তুতি সামনে রেখে বিজেপি সংগঠনকে নতুন ভাবে সাজাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুজোর পরে স্থানীয় স্তরের নির্বাচনী কর্মসূচী শুরু হলে বুথ থেকে জেলা পর্যন্ত সংগঠনের সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেই কারণেই রাজ্য নেতৃত্ব একসঙ্গে একাধিক স্তরে পরিবর্তন করছে বলে দলীয় সূত্রের বক্তব্য। তবে এই রদবদল থেকে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ফল সম্পর্কে কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকেও বঙ্গ বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন হয়েছিল। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ নতুন রাজ্য কার্যকারিণী গঠনের খবর প্রকাশ্যে আসে। তার পর মিডিয়া, সমাজমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি ও মুখপাত্রদের দায়িত্বেও রদবদল করা হয়। অর্থাৎ রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) -এর নেতৃত্বে বিজেপির সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এক ধাপে হয়নি; কয়েকটি পর্যায়ে কমিটি ও বিভিন্ন শাখার দায়িত্ব নতুন করে সাজানো হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদেও সম্প্রতি অমিতাভ চক্রবর্তীকে (Amitabh Chakraborty) পুনর্নিযুক্ত করা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর বিজেপির জাতীয় স্তরে বিভিন্ন রাজ্যের সাংগঠনিক দায়িত্বে একাধিক পরিবর্তনের ঘোষণা হয়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অমিতাভ চক্রবর্তীর দায়িত্ব বহাল থাকার পাশাপাশি জাতীয় স্তরের সাংগঠনিক কাঠামোয়ও পরিবর্তন হয়েছে। ফলে রাজ্য ও জাতীয়, দুই স্তরেই বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে নতুন রাজ্য কমিটিতে কয়েকটি পরিচিত মুখের গুরুত্বও বেড়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রাজু বিস্তাকে (Raju Bista) রাজ্য কমিটিতে সহ-সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লকেট চট্টোপাধ্যায় (Locket Chatterjee), সৌমিত্র খাঁ (Soumitra Khan), জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো (Jyotirmoy Singh Mahato) এবং শশী অগ্নিহোত্রী (Shashi Agnihotri) -এর মতো নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বে রাখা হয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। রাজ্য বিজেপির এই রদবদল এমন সময়ে হল, যখন দলের সামনে স্থানীয় নির্বাচন, সাংগঠনিক বিস্তার ও সরকারের সঙ্গে দলীয় সংগঠনের দায়িত্বের সমন্বয়ের মতো একাধিক বিষয় রয়েছে। মন্ত্রীদের প্রশাসনিক কাজে বেশি সময় দিতে হবে, আর দলীয় সংগঠনের দৈনন্দিন কাজের জন্য পৃথক নেতৃত্ব তৈরি করা হবে, ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতির প্রয়োগে এমন কাঠামোই সামনে এসেছে। অগ্নিমিত্রা পাল, তাপস রায় ও জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো মন্ত্রীদের সাংগঠনিক পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত সেই কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু, শর্বরী মুখোপাধ্যায়কে রাজ্য কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরানো নিয়ে দলের বাইরে ও ভিতরে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রে মন্ত্রিত্বের প্রশ্ন নেই। উল্লেখ্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে বিতর্ক এবং তাঁর কিছু বক্তব্যের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক মহলের অনুমানকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। বিজেপির ঘোষিত সাংগঠনিক পরিবর্তনের মূল কাঠামোয় অবশ্য ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতি এবং নতুন নেতৃত্বকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিই সামনে রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, রাজ্য কমিটি থেকে জেলা সংগঠন এবং বিভিন্ন মোর্চা, একসঙ্গে একাধিক স্তরে পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোয় একটি নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছে। সামনে স্থানীয় নির্বাচন ও পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এই নতুন টিম কী ভাবে কাজ করে, তার উপরই সংগঠনের কার্যকারিতা সম্পর্কে পরবর্তী ছবি পাওয়া যাবে। আপাতত শমীক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বঙ্গ বিজেপির নতুন সাংগঠনিক টিমে পুরনো ও নতুন মুখের সমন্বয়ই সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।




