সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দিল্লির (Delhi) রাস্তায় পথকুকুরের (Stray Dogs) আক্রমণে ভয়াবহভাবে জখম হয়েছিলেন একজন যুবতী। এখন সেই ঘটনার প্রায় দশ মাস পর দিল্লি পুরসভার (Municipal Corporation of Delhi) কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি জানালেন তিনি, ক্ষতিপূরণের অঙ্কটা প্রায় ২০ লক্ষ টাকা! শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক ট্রমা ও আর্থিক ক্ষতির হিসেব মেনে দিল্লি হাই কোর্টে (Delhi High Court) তিনি এখন ন্যায়বিচারের আশায় দাঁড়িয়ে।
আক্রান্ত যুবতীর নাম প্রিয়াঙ্কা রাই (Priyanka Rai)। চলতি বছরের মার্চ মাসে দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগর (Malviya Nagar) -এর খিড়কি ভিলেজ রোডের কাছে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটে। মোটরবাইকের পিছনে বসে যাচ্ছিলেন প্রিয়াঙ্কা। হঠাৎই একদল পথকুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা শরীর জখম হয়ে যায়, তিনি রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।প্রায় এক বছর কেটে গেলেও সেই দিনের ভয়াবহতা এখনো তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। চিকিৎসা ও মানসিক ট্রমা কাটাতে প্রিয়াঙ্কা মাসের পর মাস সময় কাটিয়েছেন। অবশেষে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁর দাবি, “এটা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, এটা প্রশাসনিক অবহেলারও উদাহরণ। শহরের রাস্তায় যদি নিরাপত্তা না থাকে, তবে নাগরিকের কর দেওয়া অর্থ কোথায় যাচ্ছে?”

ক্ষতিপূরণের হিসাব কেমন করে নির্ধারিত হল?
প্রিয়াঙ্কা রাই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন ২০২৩ সালের পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট (Punjab and Haryana High Court) -এর নির্দেশ অনুসারে। সেই নির্দেশে বলা হয়েছিল, কুকুরের কামড়ে শরীরে কতটা ক্ষত হয়েছে, কতগুলি দাঁতের দাগ রয়েছে, এবং ত্বক বা মাংস খুবলে নেওয়া হয়েছে কি না, তার উপর নির্ভর করবে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক।
সেই সূত্র অনুযায়ী –
>প্রতি ০.২ সেন্টিমিটার ক্ষতের জন্য ২০,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত।
>প্রিয়াঙ্কার শরীরে প্রায় ১২ সেন্টিমিটার গভীর ক্ষত হওয়ায় তিনি দাবি করেছেন ১২ লক্ষ টাকা।
>এ ছাড়াও, তাঁর শরীরে রয়েছে ৪২টি দাঁতের দাগ, প্রতি দাঁতের দাগ বাবদ ১০,০০০ টাকা করে দাবি করেছেন, অর্থাৎ আরও ৪.২ লক্ষ টাকা।
>মানসিক যন্ত্রণা, ভয়, সামাজিক ও পেশাগত ক্ষতির জন্য দাবি করেছেন অতিরিক্ত ৩.৮ লক্ষ টাকা।
সব মিলিয়ে মোট ক্ষতিপূরণের দাবি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা।
পুরসভার দায়িত্ব প্রশ্নের মুখে
দিল্লি পুরসভার (MCD) বিরুদ্ধে প্রিয়াঙ্কার আইনজীবী অভিযোগ করেছেন, “পুরসভার দায়িত্ব শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কুকুরদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। যদি সঠিকভাবে টিকাকরণ ও ধরপাকড়ের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এমন দুর্ঘটনা ঘটত না।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনিচ্ছুক পুরসভার এক কর্তা বলেন, “আমরা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছি। দিল্লির বিভিন্ন অঞ্চলে পথকুকুরের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আমাদের টিকাকরণ ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রকল্পে বাধা তৈরি করছে তহবিলের সংকট।”
বর্তমান আতঙ্ক ও সামাজিক ক্ষোভ
দিল্লিতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পথকুকুরের কামড়ের ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়েছে। দিল্লি পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাজধানীতে প্রায় ৮০,০০০ -এর বেশি মানুষ কুকুরের কামড়ে আহত হয়েছেন। বহু এলাকা যেমন মালব্য নগর, হজখাস, সারিতা বিহার ও রোহিণীতে (Rohini) প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে নতুন অভিযোগ। উল্লেখ্য, পশুপ্রেমী সংগঠনগুলির মতে, সমস্যার মূল কারণ সচেতনতার অভাব ও অব্যবস্থা। অ্যানিমাল ওয়েলফেয়ার বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (Animal Welfare Board of India) -এর এক সদস্য বলেন, “রাস্তার কুকুরদের প্রতি নিষ্ঠুরতা নয়, সুশৃঙ্খল টিকাকরণ ও খাদ্যের ব্যবস্থা করলেই সমস্যা অনেকটা কমবে। কিন্তু প্রশাসন তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ।”
অন্যদিকে নাগরিকদের দাবি, প্রাণী অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নাগরিক নিরাপত্তাও মৌলিক অধিকার। শহরে অবাধে ঘুরে বেড়ানো কুকুরের দল এখন ভয় তৈরি করছে বিশেষত বয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে।
আদালতে মামলার পরবর্তী ধাপ
দিল্লি হাই কোর্টে এই মামলা এখন শুনানির অপেক্ষায়। আদালত প্রাথমিকভাবে পুরসভাকে নোটিস পাঠিয়েছে। হাই কোর্ট জানিয়েছে, “এই মামলার মাধ্যমে নাগরিক নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব, দুটোই বিচারাধীন। শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আটকাতে পুরসভা কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা নিয়েও জবাব দিতে হবে।” আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আদালত প্রিয়াঙ্কার দাবির পক্ষে রায় দেয়, তাহলে এটি নজিরবিহীন একটি সিদ্ধান্ত হবে। এর পর থেকে নাগরিকরা সরাসরি প্রশাসনের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন, যা শহুরে নিরাপত্তা আইন প্রয়োগে নতুন দিশা দেখাবে। প্রিয়াঙ্কা বলেন, “আমি কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি না। শুধু চাইছি, আর যেন কেউ এমন যন্ত্রণা না পায়।”
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : IIT Kanpur, Delhi Artificial Rain, Pollution Control | দিল্লির আকাশে কৃত্রিম বৃষ্টি : দূষণ রুখতে মেঘে বীজ বপনের বৈজ্ঞানিক অভিযান শুরু




