সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ছ’মাসের বিরতির পর ফের ভারতকে বিরল খনিজ (Rare Earth Minerals) রফতানি শুরু করল চীন (China)। কিন্তু এই পুনরারম্ভের পেছনে রয়েছে একাধিক শর্ত, যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক খাতে ব্যবহার না করার নির্দেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। বেজিংয়ের এই পদক্ষেপে নতুনভাবে নড়ে উঠেছে এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য।চীনের বাণিজ্য মন্ত্রকের (Chinese Ministry of Commerce) তরফে নিশ্চিত করা হয়েছে, তারা ভারতের চারটি সংস্থাকে বিরল খনিজ সরবরাহের অনুমতি দিয়েছে। এই সংস্থাগুলি হল, হিতাচি (Hitachi), কন্টিনেন্টাল (Continental), জে-শিন (J-Shin) এবং ডিই ডায়মন্ডস (D.E. Diamonds)। তবে সেই অনুমতির সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে কড়া শর্ত চীন থেকে আমদানি করা কোনও খনিজ উপাদান আমেরিকায় (United States) রফতানি করা যাবে না এবং সামরিক প্রকল্পে তা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বেজিংয়ের যুক্তি, বিরল খনিজ পণ্যগুলো তাদের জাতীয় সম্পদ এবং বিশ্ব শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে এগুলির রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। কারণ, একাধিক দেশের মাধ্যমে এই খনিজগুলি সামরিক গবেষণা ও অস্ত্র নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক চীনা কূটনীতিক বলেন, “আমরা বিশ্বে শান্তি চাই। তাই নিশ্চিত করতে চাই যে, আমাদের উৎপাদিত খনিজ কখনও যুদ্ধের ইন্ধন না জোগায়।” চীনের এই নীতি বিশ্বব্যাপী বিরল খনিজ বাজারে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। কারণ, পৃথিবীর মোট বিরল খনিজ সরবরাহের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে চীন থেকে। বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন (Electric Vehicles), পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি (Renewable Energy) ও চিপস শিল্প এই খনিজের ওপর নির্ভরশীল। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়।
চীন গত ছ’মাস আগে বিরল খনিজ রফতানিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তখন থেকেই ভারত, আমেরিকা এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা করছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই পদক্ষেপ ছিল একটি ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping) এবং মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর আলোচনার পর থেকে কিছুটা নরম হয়েছে বেজিংয়ের অবস্থান। ট্রাম্প বৈঠকের পর দাবি করেছিলেন, “চীনের সঙ্গে বিরল খনিজ নিয়ে সমস্যার সমাধান হয়েছে। আমেরিকার জন্য সরবরাহে আর কোনও বাধা থাকবে না।”
কিন্তু, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি হলেও ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন। ভারতীয় সংস্থাগুলিকে রফতানি শুরু করার আগে চীন বাধ্য করেছে ‘এন্ড ইউজার সার্টিফিকেট’ (End-User Certificate) জমা দিতে। এই নথিতে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, আমদানি করা খনিজ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হবে। চীনের কর্তারা প্রতিটি নথি খতিয়ে দেখে তবেই অনুমোদন দিচ্ছেন। আপাতত প্রথম পর্যায়ে চারটি কোম্পানি ছাড়পত্র পেলেও, এখনও বেজিংয়ের টেবিলে ৫০টিরও বেশি আবেদন পড়ে আছে। চীনের এমন কৌশলী অবস্থানকে বিশ্লেষকরা বলছেন “জিও-ইকনমিক ওয়েপন” (Geo-economic Weapon)। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক অর্জুন দত্ত (Arjun Dutta) মন্তব্য করেছেন, “বিরল খনিজের মাধ্যমে চীন কেবল অর্থনৈতিক প্রভাব নয়, কূটনৈতিক চাপও সৃষ্টি করছে। এটি এক প্রকার নিয়ন্ত্রিত সরবরাহনীতির দৃষ্টান্ত।”
ভারত সরকার এই পরিস্থিতিতে বিকল্প প্রস্তুতি নিচ্ছে। দিল্লির এক বাণিজ্য মন্ত্রক সূত্র জানায়, “চীনের উপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো হবে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া (Australia), ভিয়েতনাম (Vietnam) ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে নতুন সরবরাহ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।” বিরল খনিজ, বিশেষ করে নিওডিমিয়াম (Neodymium), ডিসপ্রোশিয়াম (Dysprosium), ও ল্যানথানাম (Lanthanum) প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের জন্য অপরিহার্য উপাদান। বর্তমানে ভারতের ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল এবং নবায়নযোগ্য শক্তি খাতের দ্রুত বৃদ্ধির কারণে এই খনিজগুলির চাহিদা অত্যন্ত বেশি। তাই চীনের এই রফতানি নিয়ন্ত্রণ ভারতীয় শিল্পের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। চীনের তরফে ‘রফতানি নিয়ন্ত্রণ নীতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে বিরল খনিজের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইলেকট্রিক গাড়ি, সোলার প্যানেল, এবং ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম তৈরির খরচে। ভারতের শিল্পমহলে আশঙ্কা, চীনের এই নীতি যদি আবারও কঠোর হয়, তবে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। অটোমোবাইল শিল্পের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের অনেক ইউনিট চীনা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প সরবরাহ চেইন তৈরি করতে সময় লাগবে।” তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ভারতের ভূগর্ভে প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন টন বিরল খনিজ মজুদ আছে বলে অনুমান। সরকার “ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিনারেল মিশন” (National Critical Mineral Mission) চালু করেছে, যার লক্ষ্য দেশীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আগামী দশকে আত্মনির্ভর হওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

চীনের শর্তসাপেক্ষ রফতানি একদিকে দিল্লিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, আবার অন্যদিকে শর্তভঙ্গ হলে রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে। ফলে নতুন এই অধ্যায় চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “চীনের রেয়ার আর্থ কূটনীতি এখন বিশ্বের শক্তি ভারসাম্যের প্রতীক। ভারত চাইলে এই চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপ দিতে পারে, তবে তার জন্য এখনই কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।”
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ বাইশ-তম কিস্তি)




