সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন ফেলে দিয়েছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহকারী চন্দ্রনাথ রথের (Chandranath Rath) খুনের ঘটনা। মধ্যমগ্রামে প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হওয়া এই ঘটনার তদন্তে এ বার বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করল রাজ্য সরকার। তদন্তে রাজ্য পুলিশের আধিকারিকদের পাশাপাশি রাখা হয়েছে সিআইডি (CID)-র আধিকারিকদেরও। ঘটনায় ইতিমধ্যেই একাধিক সূত্র হাতে এসেছে বলে পুলিশমহলের খবর। একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মধ্যমগ্রামের ঘটনাস্থল এবং হাসপাতাল চত্বর ঘিরে কড়া নিরাপত্তা দেখা যায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ডিজি প্রবীণ কুমার (Praveen Kumar) ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পৌঁছন। তার আগের রাতেই সেখানে যান রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত (Siddhanath Gupta)। যদিও তদন্তের স্বার্থে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি, তবু সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, অপরাধে ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা একটি চারচাকা গাড়ি ইতিমধ্যে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, গাড়িটির নম্বরপ্লেট ভুয়ো হতে পারে। কারণ নম্বরপ্লেট অনুযায়ী সেটি শিলিগুড়ির হলেও, তদন্তকারীদের সন্দেহ গাড়ির পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে গুলি এবং ব্যবহৃত কার্তুজও উদ্ধার করেছে পুলিশ। সেই সব নমুনা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। বুধবার রাতেই ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। চন্দ্রনাথ যে গাড়িতে ছিলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। গাড়ির সামনের দুটি আসনে রক্তের দাগ পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফরেনসিক আধিকারিকেরা গাড়ির বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। গুলির দিক, দূরত্ব এবং হামলার কায়দা খতিয়ে দেখে হামলাকারীদের সংখ্যা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনার তদন্তে সিআইডি-র প্রবেশকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল। বৃহস্পতিবার সকালেই সিআইডি-র একটি দল মধ্যমগ্রামে পৌঁছে যায়। স্থানীয় পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে যৌথ ভাবে তদন্তের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। কারা এই হামলার পিছনে থাকতে পারে, তার উত্তর খুঁজতে রাজনৈতিক যোগ, ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং পূর্বপরিকল্পিত হামলার দিকগুলি একসঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর থেকেই মধ্যমগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যে আবাসনে চন্দ্রনাথ থাকতেন, সেখান থেকে যশোর রোড পর্যন্ত পুরো এলাকা পুলিশি নিরাপত্তার বলয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরাও মোতায়েন রয়েছেন। আপাতত ওই রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, হামলাকারীরা কোন পথ দিয়ে এসেছিল এবং কী ভাবে এলাকা ছেড়েছে, তা বোঝার জন্য গোটা এলাকা সিল করে রাখা হয়েছে। চন্দ্রনাথ রথের দেহ বৃহস্পতিবার ভোরে মধ্যমগ্রামের হাসপাতাল থেকে বারাসত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত হবে। হাসপাতাল সূত্রে খবর, তিন সদস্যের বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। টিমে রয়েছেন এক জন বিভাগীয় প্রধান এবং দু’জন সহকারী অধ্যাপক। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ময়নাতদন্তের কাজ করা হবে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। গুলির প্রবেশপথ, আঘাতের ধরন এবং মৃত্যুর সঠিক সময় নির্ধারণের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিজেপি (BJP)-র রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) বারাসত হাসপাতালে যাওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনায় আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে আরও চাপ বাড়তে পারে। ইতিমধ্যেই বিরোধী শিবির থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও প্রশাসনের দাবি, দ্রুত তদন্ত এগোচ্ছে এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। উল্লেখ্য, চন্দ্রনাথ রথ দীর্ঘদিন ধরে শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে এই খুনকে ঘিরে রাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। তদন্তকারীরা চন্দ্রনাথের সাম্প্রতিক গতিবিধি, ফোনের কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ব্যক্তিদের তালিকা খতিয়ে দেখছেন। আশপাশের এলাকার একাধিক ক্যামেরার ফুটেজ ইতিমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে খবর।
পুলিশ সূত্রে খবর, হামলাকারীরা পরিকল্পনা করেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল। হামলার সময় ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া কার্তুজ থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের ধরন নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ঘটনার পিছনে বড় কোনও চক্র থাকতে পারে। সেই কারণেই সিট গঠন করে বহুস্তরীয় তদন্তের পথে হাঁটছে প্রশাসন। রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ, সকলের নজর এখন এই তদন্তের দিকে। কে বা কারা চন্দ্রনাথ রথকে নিশানা করল, কেনই বা এই হামলা, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোটা রাজ্য। সিট গঠনের পর তদন্তে গতি আসবে বলেই মনে করা হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে বলে অনুমান প্রশাসনিক সূত্রের।
ছবি: প্রতীকী




