সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিহার ভোটে এনডিএ -এর বিপুল জয়ের পরের দিনই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা চত্বরে লাড্ডু বিলি করেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। আনন্দ আর রাজনৈতিক বার্তা দুই মিলিয়েই তিনি তখন ঘোষণা করেছিলেন, ‘কলিঙ্গ হয়ে গিয়েছে। অঙ্গও হয়ে গেল। এ বার হবে বঙ্গ।’ অনেকেই ভেবেছিলেন, এই মন্তব্য নিছক রাজনৈতিক শব্দের ঝড়। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, দেখা যাচ্ছে কথাটির পিছনে রয়েছে খুব নির্দিষ্ট এক পরিকল্পনা। বিহারের ভোটে যেভাবে ‘মাঠ দখল’ করেছিল বিজেপি, সেই মডেল এবার পশ্চিমবঙ্গেও কার্যকর করতে চাইছে পদ্মশিবির। টার্গেট একটাই, তৃণমূলের বুথ শক্তিকে ভোঁতা করা। এখনই পশ্চিমবঙ্গে চলছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। প্রক্রিয়ার অর্ধেকেরও সময় পার হওয়ার আগেই বিজেপি ভোটের দিনের খেলা সাজাতে শুরু করেছে। রাজ্য বিজেপির একটি বড় অংশের দাবি, নির্বাচন কমিশন যেন ভোটের দিনের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোটোকল (SOP) বদল করে। তাদের যুক্তি, এই বদল তৃণমূলের বুথ দখল, ক্ষমতাকে অনেকটাই ঠাণ্ডা করে দেবে।
বিহারের ভোটে দেখা গিয়েছিল, রাজনৈতিক দলের পোলিং এজেন্টরা বাইরে বসে থাকেন, আর বুথের দরজায় থাকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া প্রহরা। ভিতরে ভোট পরিচালনা করেন সরকারি কর্মচারীরা, প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসাররা। বিজেপির দাবি, বাংলাতেও এই পদ্ধতি কার্যকর করা হোক। সেই কারণে বিহারের নির্বাচনের দিনের বহু ভিডিয়ো ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমনকী ক’য়েকটি ফুটেজ পাঠানো হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর কাছেও, যাতে দাবি তোলার সময় কমিশনের সামনে ‘প্রমাণ’ হাজির করা যায়।বিজেপির আরও একটি বড় দাবি, বুথের ভিতরে প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদেরও ‘ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা’ দেওয়া হোক। দলীয় নেতাদের কথায়, ‘এসআইআরের ফলে তৃণমূল কিছুটা ধাক্কা খাবেই। কিন্তু সেই ধাক্কার সত্যিকারের প্রতিফলন হবে ভোটের দিন। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই বুথে মুক্তভাবে ভোট দিতে পারবেন মানুষ। সরকারি কর্মচারীদের অনেকেই দিনের শেষে তৃণমূলের প্রভাবেই চলে যান।’
নিয়ম বদলের জন্য বিজেপি আরও উৎসাহ পেয়েছে কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত থেকে। এত দিন পর্যন্ত বুথ লেভেল এজেন্ট (BLA) হতে গেলে সংশ্লিষ্ট বুথের ভোটার হতে হত। ২০২৩ সালের নির্দেশিকাতেও সেই নিয়ম বহাল ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে কমিশন জানায়, বিএলএ হতে গেলে নির্দিষ্ট বুথের ভোটার হওয়া আর বাধ্যতামূলক নয়। সংশ্লিষ্ট বিধানসভার ভোটার হলেই হবে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান শুভেন্দু। তৃণমূল অবশ্য সরাসরি অভিযোগ তোলে, এটি বিজেপিকে সুবিধা করে দেওয়ার গোপন ‘মৈত্রী’। শাসকদলের অভিযোগ, ‘কমিশন যেন বিজেপির জন্য বিএলএ নিয়োগের এজেন্সি হয়ে গেছে।’ তবে তৃণমূল প্রকাশ্যে এই দাবি যতই উড়িয়ে দিক, আড়ালে দলের বহু নেতাই স্বীকার করছেন, বুথ শক্তি যদি ভোটের দিনে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে বহু জায়গায় সমস্যায় পড়তে পারে দল। কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) অবশ্য প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘বিজেপি বাংলা-বিরোধী। নিয়ম পাল্টালে কী হবে? ভোট শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই চতুর্থ বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হবেন।’
বিজেপির দিকে নজর ফেরালে দেখা যায়, তাঁরাও মানছেন যে আসল লড়াই ভোটের আগের রাত এবং ভোটের দিন। এক শীর্ষ বিজেপি নেতা স্বীকার করেন, ‘চার মাসে তৃণমূলের মতো বুথ শক্তি গড়ে তোলা অসম্ভব। তাই নিয়ম বদলের মাধ্যমেই কৌশলে খেলতে হবে।’ তাঁদের মতে, বহু বুথে বিজেপি এজেন্টই দিতে পারে না। সেখানে তৃণমূল ডামি প্রার্থী বসিয়ে সংখ্যাধিক্যের চাপে ‘মনস্তাত্ত্বিক দাপট’ তৈরি করে। সেই জায়গাটাই ভাঙতে চাইছে তারা। তবে রয়েছে অভ্যন্তরীণ সংশয়ও। কারণ ২০২১ নির্বাচনের আগে তৎকালীন বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের (Mukul Roy) উদ্যোগে নিয়ম বদল হয়েছিল। বিধানসভার ভোটার হলেই যে কোনও বুথে এজেন্ট বসানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছিল, অচেনা বুথের গতিবিধি বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে পড়ে অনেক বিজেপি এজেন্টেরই। ফলে লাভ খুব একটা হয়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই নিয়ম বদলের চাপ কি সংগঠনিক দুর্বলতা ঢাকবে? নাকি আবারও ভোটের দিনের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবে তৃণমূল? যেভাবে বিজেপি ‘বিহার মডেল’ সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে লড়াই আরও তীব্র হবে। আর সেই লড়াইয়ের ময়দান হবে বুথ, যেখানে প্রতিটি নিয়মই রাজনৈতিক অস্ত্র।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : G20 Modi Fentanyl Message | জি২০ সম্মেলনে মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মোদীর কড়া বার্তা, ফেন্টানিল নিয়ে উদ্বেগ




