সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে বিস্তৃত ইস্তাহার প্রকাশ করল ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। দলের শীর্ষ নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘সংকল্পপত্র’ প্রকাশ করেন। ভোটের আগে এই ইস্তাহারেই তুলে ধরা হয়েছে নারী, যুবক, কৃষক থেকে শুরু করে শহর ও শিল্প, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে ঘিরে একাধিক প্রতিশ্রুতি। ইস্তাহার প্রকাশ করে অমিত শাহ বলেন, ‘ভয়মুক্ত ও ভরসাযোগ্য বাংলা গড়াই আমাদের লক্ষ্য।’ তিনি আরও দাবি করেন, গত কয়েক দশকে রাজ্যের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে এবং নতুন সরকার এলে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন দিশা দেখানো হবে।

এই ইস্তাহারের অন্যতম বড় দিক হল আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি। বিজেপি জানিয়েছে, মহিলাদের এবং বেকার যুবকদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যুবকদের এককালীন ১৫ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে যাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের জন্য বয়সে ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করেছে বিজেপি। ইস্তাহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় এলে সরকারি কর্মীদের ডিএ দেওয়া হবে নিয়ম মেনে। এই প্রতিশ্রুতি স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের কর্মচারী মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
নারী নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে এই ইস্তাহারে। রাজ্যের সমস্ত সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডলে মহিলা থানা এবং প্রতিটি পুলিশ জেলায় বিশেষ মহিলা ডেস্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অমিত শাহ বলেন, ‘আমাদের শাসনে কোনওদিন এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে না, যেখানে মহিলাদের রাতের সময় বাইরে বেরোনো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে।’ পাশাপাশি পরিবহণ ব্যবস্থাতেও বড় ঘোষণা রয়েছে। বিজেপি জানিয়েছে, মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যাত্রার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে ‘মাফিয়ারাজ’-এর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। জমি সংক্রান্ত জটিলতা ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং সরকারে এলে প্রথম ছয় দিনের মধ্যেই একটি কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে।
শিল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়নেও জোর দিয়েছে বিজেপি। তাজপুর ও কুলপিতে ‘ডিপ সি পোর্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া চারটি নতুন উপনগরী তৈরির কথাও উল্লেখ রয়েছে, যা ভবিষ্যতের শহরায়ণকে নতুন মাত্রা দেবে বলে দাবি দলের। হলদিয়া বন্দরের উন্নয়নের জন্য পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। এছাড়াও কলকাতাকে ঘিরে বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা সামনে এনেছে বিজেপি। শহরের জন্য আগামী ১০ বছরের একটি ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করা হয়েছে, যার লক্ষ্য শহরকে আন্তর্জাতিক মানের নগরীতে রূপান্তর করা। একই সঙ্গে কলকাতাকে ‘লিভিং সিটি’ হিসেবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার কথাও বলেন অমিত শাহ।
উত্তরবঙ্গের উন্নয়নকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই ইস্তাহারে। বিভিন্ন জেলায় এমস (AIIMS), আইআইটি (IIT), আইআইএম (IIM) এবং ফ্যাশন ডিজ়াইনিং ইনস্টিটিউট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া উত্তরবঙ্গে একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবায় জোর দিয়ে একটি আধুনিক ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও একাধিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কৃষকদের ধানের নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ এবং প্রধানমন্ত্রী কিসান প্রকল্পের (PM Kisan Scheme) আর্থিক সহায়তা বাড়িয়ে মোট ৯ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এতে কেন্দ্রের ৬ হাজার টাকার সঙ্গে রাজ্যের ৩ হাজার টাকা যুক্ত করা হবে। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বিজেপি। চৈতন্য মহাপ্রভুকে (Chaitanya Mahaprabhu) কেন্দ্র করে আধ্যাত্মিক সার্কিট উন্নয়ন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) -এর নামে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং থিয়েটারের জন্য আধুনিক ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কুড়মালি (Kurmali) ও রাজবংশী (Rajbanshi) ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
দার্জিলিংকে (Darjeeling) হেরিটেজ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে এবং পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি ‘বন্দেমাতরম মিউজ়িয়াম’ স্থাপনের প্রস্তাবও ইস্তাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তরে অমিত শাহ স্পষ্ট করে জানান, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বাংলারই কেউ হবেন।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা কোথাও ক্ষমতায় এসে গরিবদের জন্য চালু থাকা প্রকল্প বন্ধ করিনি, এখানে এলে তাও বন্ধ হবে না।’ মাছ-ডিম সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়েও তিনি জানান, এ ধরনের কোনও নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নই ওঠে না। এই ইস্তাহার প্রকাশের মাধ্যমে বিজেপি ২০২৬ সালের নির্বাচনে নিজেদের উন্নয়নমূলক ভাবনা এবং প্রশাসনিক রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এখন দেখার, এই প্রতিশ্রুতিগুলি কতটা প্রভাব ফেলে ভোটের ময়দানে এবং রাজ্যের ভোটারদের কতটা আকৃষ্ট করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Amit Shah Kolkata roadshow news, WB Elections 2026 Bhabanipur | ভবানীপুরে ‘বদল’-এর ডাক অমিত শাহর, শুভেন্দুর মনোনয়ন ঘিরে রাজনৈতিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি




