সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রথম দফা শেষ হতেই প্রকাশ্যে এল এমন একটি পরিসংখ্যান, যা ইতিমধ্যেই উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে। এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় এনুমারেশন ফর্ম গ্রহণ শেষ হয় বৃহস্পতিবার। তার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন (Election Commission) বিধানসভাভিত্তিক নাম বাদ পড়ার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেই সংখ্যার তুলনা সামনে আসতেই বিস্ময় ছড়িয়েছে রাজনীতির অন্দরে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) কেন্দ্র ভবানীপুরে নাম বাদ গিয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার, আর বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) নন্দীগ্রামে বাদ মাত্র সাড়ে ১০ হাজার।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তালিকা অনুসারে ভবানীপুর বিধানসভায় ভোটার সংখ্যা ছিল ১,৬১,৫০৯ জন। সেই তালিকা থেকেই বাদ পড়েছে ৪৪,৭৮৭ জনের নাম, প্রায় ২৮ শতাংশ। অপরদিকে, নন্দীগ্রামে ভোটার সংখ্যা ছিল ২,৭৮,২১২ জন, সেখানে বাদ পড়েছে ১০,৫৯৯ জনের নাম। দু’টি কেন্দ্রের ভোটারসংখ্যার তুলনায় এই বাদ পড়া সংখ্যার বিস্তর পার্থক্য তাই স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন উসকে দিচ্ছে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এত বড় আকারে নাম বাদ পড়া সাধারণ ঘটনা নয়। বিশেষ করে ভবানীপুরের মতো সংবেদনশীল কেন্দ্রে ৪৫ হাজার নাম বাদ পড়া অবশ্যই নজরকাড়া বিষয়।”
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের স্মৃতি এখনও তরতাজা। সেই নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে। সেখানে ১,৯৫৬ ভোটে পরাজিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যা পরে আদালতের দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছয়। মামলার বিচারকও বদল হয়েছেন, কিন্তু তার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। যদিও তার পরের উপনির্বাচনে নিজের আসন ভবানীপুর থেকেই বিপুল ব্যবধানে (৫৮,৮৩৫ ভোট) জিতে বিধানসভায় ফেরেন মুখ্যমন্ত্রী।
অন্যদিকে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামগুলো কমিশন বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করেছে মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়া, ডুপ্লিকেট নামসহ একাধিক কারণ। তবে শুধুই ভবানীপুর নয়, বাদপড়ার সংখ্যায় কলকাতার বন্দর (Kolkata Port) বিধানসভা শীর্ষে। এই কেন্দ্রটি রাজ্যের মন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের (Firhad Hakim) অধীনে। এখানে বাদ পড়েছে ৬৩,৭৩০ জনের নাম, যা রাজ্যের অন্যতম সর্বোচ্চ। তার কিছু পিছনে রয়েছে আরেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের (Aroop Biswas) কেন্দ্র টালিগঞ্জে (Tollygunge) বাদ পড়েছে৩৫,৩০৯ জন।
বিজেপি শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ মুখদের কেন্দ্রেও বাদ পড়ার সংখ্যা নন্দীগ্রামের তুলনায় বেশি। অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) -এর আসানসোল দক্ষিণে বাদ পড়েছে ৩৯,২০২ জনের নাম। শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh) -এর শিলিগুড়ি কেন্দ্রে বাদ পড়েছে ৩১,১৮১ জন। প্রসঙ্গত, জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় (South 24 Parganas) এ সংখ্যা ৮,১৬,০৪৭। উল্লেখযোগ্যভাবে এই জেলা বহু বছর ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) প্রভাববলয়ে রয়েছে, এবং গত লোকসভা ভোটে তিনি ডায়মন্ড হারবার থেকে সাত লক্ষের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছিলেন।অন্যদিকে, সবচেয়ে কম নাম বাদ পড়েছে বাঁকুড়ার কোতুলপুর (Kotulpur) বিধানসভায়, মাত্র ৫,৬৭৮। রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে চৌরঙ্গী (Chowringhee), তার বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় (Nayana Bandyopadhyay) – এ বাদ পড়ার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি: ৭৪,৫৫৩ জন। সব মিলিয়ে, এসআইআর -এর প্রথম দফায় বাদ পড়েছে ৫৮ লক্ষেরও বেশি নাম। যা সাম্প্রতিক স্মৃতিতে নজিরবিহীন। আগামী মঙ্গলবার খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। তারপর শুরু হবে আপত্তি ও দাবি জানানোয় নতুন পর্ব।রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, “এই বাদ পড়ার সংখ্যা আগামী বিধানসভা নির্বাচনে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কেন্দ্রগুলিতে।” পরিস্থিতি এখন নজরকাড়া। ভোটের আগে ভোটার তালিকা নিয়ে যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনের রাজনৈতিক তাপমাত্রা আরও বাড়াবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal SIR Ghost Voters | বঙ্গে ভোটার তালিকায় ৫৪.৬ লাখ মৃত-ডুপ্লিকেট ভোটার চিহ্নিত




