সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বারুইপুর ৮ জুলাই : বারুইপুরে (Baruipur) কিশোরী নির্যাতন ও খুনের ঘটনার পর রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন। ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গণপিটুনিতে একজন যুবকের মৃত্যুও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার সরেজমিনে বারুইপুরে গিয়ে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। এসপি অফিসে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে তিনি জানান, ‘এই ঘটনায় কোনও গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না।’ পাশাপাশি রাজ্যের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তকে (Siddhanath Gupta) ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে বারুইপুরের পুলিশ সুপারের দফতরে পৌঁছে একাধিক পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখতে তিনি নির্দেশ দেন। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘আমাদের তরফে যদি সামান্যতম শিথিলতা থেকেও থাকে, তবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এই মন্তব্য ঘিরে প্রশাসনিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনার কেন্দ্রে থাকা নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, ‘ওই পরিবার আমার উপর ভরসা রেখেছে, সেটাই বড় বিষয়।’ শুধু নির্যাতিতার পরিবার নয়, গণপিটুনিতে নিহত যুবক ইন্দ্রনাথ তাঁতির (Indranath Tanti) পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘ইন্দ্রনাথ নির্দোষ ছিল।’ এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে, কারণ স্থানীয় স্তরে ওই যুবককে ঘিরে নানা জল্পনা ছড়িয়েছিল।
সূত্রের খবর, ঘটনার দিনই ফোনে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন শুভেন্দু। পরে একাধিকবার তাঁদের সঙ্গে কথা বলে প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাস দেন। মঙ্গলবারের সফরে তিনি বলেন, ‘রাজ্যের সমস্ত থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এই ধরনের অপরাধ ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।’ একই সঙ্গে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (Bharatiya Nyaya Sanhita) এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মেনে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। অভিযোগ, কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পর সময়মতো পদক্ষেপ করা হয়নি। সেই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আগের রাতের মিসিং ডায়েরি থেকে শুরু করে পরবর্তী সব ঘটনা খতিয়ে দেখেছি।’ তিনি আরও জানান, ‘সরকার কী করেছে, তা শীঘ্রই সামনে আসবে। এক সপ্তাহ পর আবার এখানে এসে দুই পরিবারের সঙ্গে দেখা করব।’ এই ঘটনার জেরে এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি উঠেছে। সূর্যপুরে (Suryapur) একটি পুলিশ আউটপোস্ট তৈরির দাবি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের। সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘প্রয়োজনে বাড়ি ভাড়া নিয়ে হলেও আউটপোস্ট তৈরি করতে হবে। আমি আবার এলে সেটি চালু দেখতে চাই।’
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার। পরিবার সূত্রে খবর, ওই দিন বিকেলে খাবার কিনতে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি কিশোরী। পরদিন সকালে বাড়ির কাছের একটি পুকুর থেকে তার দেহ উদ্ধার হয়। এরপরেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্থানীয়রা। শুরু হয় বিক্ষোভ, পথ অবরোধ, এমনকি রেল অবরোধও। অভিযোগ ওঠে, পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে, রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে। এই অশান্তির মধ্যে গণপিটুনির শিকার হন ইন্দ্রনাথ তাঁতি। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভিডিয়ো ফুটেজ দেখে প্রায় ২০০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। কাউকে ছাড়া হবে না।’ পাশাপাশি যাঁরা পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে উস্কানি দিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি। নাম না করে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) এবং সিপিএম (CPM)-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগও তোলেন শুভেন্দু।
অন্যদিকে, এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের নাম আনন্দ সর্দার (Ananda Sardar), প্রভাস মণ্ডল (Prabhas Mondal) ও দিবাকর সর্দার (Dibakar Sardar)। তাঁদের বিরুদ্ধে গণধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আহত পুলিশকর্মীদের সঙ্গেও তিনি দেখা করবেন। তাঁর কথায়, ‘আমাদের তিনজন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন। তাঁদের দেখতে হাসপাতালে যাব।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকার দিকটিও তিনি সামনে আনেন। পুরো ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসনের তরফে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস মিললেও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়ে গিয়েছে। এখন নজর ৭২ ঘণ্টার রিপোর্টের দিকে, যেখানে উঠে আসতে পারে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এবং দায় নির্ধারণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal syllabus change, Syama Prasad Mookerjee history | পাঠ্যবইয়ে শ্যামাপ্রসাদ, বাদ সিঙ্গুর আন্দোলন! শুভেন্দুর ঘোষণায় বাংলার শিক্ষানীতিতে বড় বদলের ইঙ্গিত



