সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ স্পোর্টস ডেস্ক, কলকাতা : বিশ্বকাপ মঞ্চে এমন নাটকীয় প্রত্যাবর্তন বহুদিন দেখা যায়নি। ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত হার প্রায় নিশ্চিত ছিল আর্জেন্টিনার (Argentina)। ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা দলটি বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে। সেই মুহূর্তেই বদলে গেল ছবিটা। মাত্র ১৩ মিনিটের ঝড়ে ম্যাচের রং উলটে দিয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিল লিয়োনেল মেসির (Lionel Messi) দল। রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে মিশরকে (Egypt) হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেল আর্জেন্টিনা। আটলান্টায় ম্যাচের শুরু থেকেই ছন্দহীন দেখা যায় লিয়োনেল স্কালোনির (Lionel Scaloni) দলকে। আক্রমণ থেকে মাঝমাঠ, এমনকী রক্ষণেও বারবার ভুলের খেসারত দিতে হয়। মিশরের দ্রুত আক্রমণে বারবার বিপাকে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধেই গোল খেয়ে মেসিরা পিছিয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র দেখা যায়। মোহাম্মদ সালাহ (Mohamed Salah), হাসান ও জিকোদের আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ একাধিকবার চাপে পড়ে।

ম্যাচের ৭২ মিনিট পর্যন্ত মেসিকে প্রায় আটকেই রেখেছিল মিশরের ডিফেন্ডাররা। তিনজন মার্কার ঘিরে রাখায় আক্রমণ গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না লিয়ো। পেনাল্টি মিস, ফ্রি-কিক পোস্টে লাগা এসব মিলিয়ে দিনটা যেন তাঁর নাগালের বাইরেই ছিল। কিন্তু সেই মেসিই হঠাৎ করে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেন। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মেসির ক্রসে হেডে গোল করে ম্যাচে ফেরার সূচনা করেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো (Cristian Romero)। সেই গোল যেন নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে আর্জেন্টিনা দলে ও খেলোয়াড়দের মধ্যে। চার মিনিট পর আবার মেসির পায়ের জাদু। তাঁর তৈরি আক্রমণেই ফিরে আসে বল, আর দুর্দান্ত শটে জালে পাঠান তিনি নিজেই। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-২। এরপর ম্যাচ তখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর অপেক্ষায়। ঠিক সেই সময় ডান দিক থেকে লাউতারো মার্তিনেজ় (Lautaro Martinez) -এর ক্রসে হেড করে জয়সূচক গোল করেন এঞ্জো ফের্নান্দেজ (Enzo Fernandez)। মাত্র ১৩ মিনিটে তিনটি গোল আর তাতেই ইতিহাস গড়ে ফেলে আর্জেন্টিনা।
এই ম্যাচে আবারও দলের ভরসার নাম হয়ে উঠলেন লিয়োনেল মেসি। শুরুতে ব্যর্থতা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনিই ম্যাচের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। তাঁর পারফরম্যান্সেই ঢাকা পড়ে যায় দলের একাধিক দুর্বলতা। ম্যাচ শেষে আবেগও ধরে রাখতে পারেননি লিয়ো। সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। সেই দৃশ্যই বুঝিয়ে দেয়, কতটা চাপের মধ্যে ছিলেন তিনি নিজে ও সমগ্র আর্জেন্টিনা দল। সতীর্থদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁরা মেসিকে কাঁধে তুলে নিয়ে জয় উদযাপন করেন। এই জয়ের মধ্যেও চিন্তার ভাঁজ রয়েছে কোচ স্কালোনির কপালে। রক্ষণভাগে বারবার ফাঁক ধরা পড়েছে। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ় (Lisandro Martinez) -এর সামনে দিয়ে সহজে গোল করে গিয়েছে মিশর। মাঝমাঠেও সমন্বয়ের অভাব চোখে পড়েছে। রদ্রিগো ডি পল (Rodrigo De Paul) ও অ্যালেক্সিস ম্যাকঅ্যালিস্টারদের (Alexis Mac Allister) ব্যাক পাস ও স্কোয়ার পাসের প্রবণতা আক্রমণকে মন্থর করেছে।
ফলে মেসিকেই বারবার নিচে নেমে বল তুলতে হয়েছে ও আক্রমণ গড়তে হয়েছে। আক্রমণে জুলিয়ান আলভারেজ (Julian Alvarez) ও এঞ্জো ফের্নান্দেজ চেষ্টা করলেও ধারাবাহিকতা ছিল না। ফলে গোলের সুযোগও কম তৈরি হয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচে প্রতিপক্ষ যদি মিশরের বদলে ফ্রান্স (France) বা স্পেন (Spain) হত, তাহলে ফল অন্যরকমও হতে পারত। কারণ রক্ষণ ও মাঝমাঠের এই দুর্বলতা বড় দলের বিরুদ্ধে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
তথাপি ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপে এর আগে ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ জেতার নজির ছিল না আর্জেন্টিনার। সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে এই ম্যাচ। তাই এটিকে আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তন হিসেবেই ধরা হচ্ছে ফুটবল বিশ্বে। এই জয়ের পর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু পরবর্তী ম্যাচের আগে দলের ফাঁকফোকর ভরাট করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। স্কালোনির সামনে সময় খুব বেশি নেই। রক্ষণকে শক্তিশালী করা ও মাঝমাঠে সমন্বয় ফেরানো জরুরি হয়ে উঠেছে। তবুও, এই ম্যাচের নায়ক একজনই, তিনি লিয়োনেল মেসি। তাঁর পায়ের জাদুতেই বিশ্বকাপের মঞ্চে টিকে রইল আর্জেন্টিনা। ১৩ মিনিটের সেই ঝড়ই এখন ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রে তা আর বলার অঅপেক্ষা রাখে না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Lionel Messi World Cup goals, Argentina vs Cape Verde match | মেসির ম্যাজিকে রোমাঞ্চকর জয়, বিশ্বকাপে টানা গোলের রেকর্ডে ইতিহাস : কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শেষ হাসি আর্জেন্টিনার



