সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বাঁকুড়া: চারদিকে শুধু জল। কোথাও ডুবে গিয়েছে চাষের জমি, কোথাও নদীর জল ঢুকে পড়েছে বসত এলাকায়। যোগাযোগের পথ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় জলবন্দী মানুষের কাছে পৌঁছনোও কঠিন হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার সকালে ডিঙি নৌকা নিয়ে বন্যাকবলিত এলাকায় পৌঁছে গেলেন রাজ্যের বন, পরিবেশ ও সমবায় দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী তথা সোনামুখীর বিধায়ক দিবাকর ঘরামি (Dibakar Gharami)। অন্য দিকে, বাঁকুড়ার জেলাশাসক অনীশ দাশগুপ্তকে (Anish Dasgupta) সঙ্গে নিয়ে নৌকায় দামোদরের বুকে থাকা জলবন্দি মানাচরে পৌঁছে দুর্গত পরিবারের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দিলেন শালতোড়ার বিধায়ক চন্দনা বাউরি (Chandana Bauri)।
প্রসঙ্গত, দামোদরের জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্গাপুর ব্যারাজ (Durgapur Barrage) থেকে বিপুল পরিমাণ জল ছাড়ার পর ফুলেফেঁপে উঠেছে দামোদর নদ। নদীর জল বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলিতে জল ঢুকতে শুরু করেছে। সোনামুখী ব্লকের উত্তর নিত্যানন্দপুর এলাকাতেও বৃহস্পতিবার থেকে দ্রুত জল ঢুকছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। ইতিমধ্যেই কয়েকশো একর কৃষিজমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন। বৃহস্পতিবার রাতেই জেলাশাসককে সঙ্গে নিয়ে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে বেরিয়েছিলেন মন্ত্রী দিবাকর ঘরামি। শুক্রবার সকালেও পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে ফের তিনি নৌকায় ওঠেন। জলবন্দী এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন। যাঁদের বাড়িঘর ও চাষের জমি জলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
দিবাকর ঘরামির রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি গ্রামবাংলার মাটির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। রাজনীতিতে আসার আগে কৃষিকাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। এখনও সুযোগ পেলেই মাঠে গিয়ে কৃষিকাজ করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। দামোদরের তীরবর্তী এলাকায় বাড়ি হওয়ায় প্রতিবছর বর্ষায় নদীর জল বাড়ার পরিস্থিতিও তাঁর কাছে পরিচিত। ফলে নিজের বিধানসভা এলাকায় জল ঢোকার খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতি দেখতে নিজেই নৌকা নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। শুক্রবার সকালে ডিঙি নৌকায় করে জলমগ্ন বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। কৃষকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ফসলের ক্ষতি। কয়েকশো একর জমি জলের তলায় চলে যাওয়ায় ধান-সহ বিভিন্ন চাষের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জমিতে জল জমে থাকলে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী চাষের প্রস্তুতিতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন দিবাকর ঘরামি।
অন্য দিকে, দামোদরের বুকে থাকা মানাচর এলাকার পরিস্থিতিও নজর কেড়েছে। বাঁকুড়ার মেজিয়া ব্লকের রামচন্দ্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত এই এলাকা মূলত নদীর মাঝে থাকা একটি চর বা দ্বীপের মতো ভূখণ্ড। সেখানে কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে। শুষ্ক মরসুমে নদীর জল কমে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা নদীর বুক দিয়ে হেঁটেই যাতায়াত করতে পারেন। কিন্তু বর্ষা এলেই ছবিটা বদলে যায়। দামোদর ফুলেফেঁপে উঠলে চারদিক জল দিয়ে ঘিরে যায় মানাচর। ফলে বাইরের এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্ষার এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই শুক্রবার সেখানে নৌকা নিয়ে পৌঁছন শালতোড়ার বিধায়ক চন্দনা বাউরি ও জেলাশাসক অনীশ দাশগুপ্ত। নৌকায় করে জল পেরিয়ে তাঁরা মানাচরে পৌঁছন। দুর্গত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তাঁদের হাতে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। খাবার, জল ও জরুরি প্রয়োজনের জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
জলবন্দী পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যার কথাও জানতে চান বিধায়ক ও জেলাশাসক। বর্ষার সময় যাতায়াতের সমস্যা, চিকিৎসার প্রয়োজনে নদী পার হওয়ার ঝুঁকি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ সবকিছু নিয়েই চরবাসীদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে নদীর জল বেড়ে গেলে ছোট শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে বাইরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মানাচরের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। শুধু বর্ষার সময় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া নয়, চর এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। আগামী দিনে মানাচরের যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় পরিষেবা এবং অন্যান্য পরিকাঠামো উন্নয়নে পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছেন চন্দনা বাউরি ও জেলাশাসক। এদিকে দামোদরের জল বাড়ায় নদী সংলগ্ন আরও বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নদীর জলস্তর বাড়ার পাশাপাশি নিচু জমিতে জল ঢুকে পড়ায় কৃষিকাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেসব জমিতে সদ্য চাষ করা হয়েছিল, সেগুলির ফসল জলের তলায় চলে যাওয়ায় কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। মন্ত্রী নিজে এলাকায় গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির মধ্যে প্রশাসনিক সাহায্য পাওয়ার প্রত্যাশা বেড়েছে।
দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার সঙ্গে দামোদরের জলস্তর বৃদ্ধির যোগ রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। নদীর জল বাড়ার পরিস্থিতিতে বাঁকুড়ার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোথাও নতুন করে জল ঢুকছে কি না, কোথাও মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেই বিষয়গুলিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে স্থানীয় বাসিন্দাদের নদীর কাছাকাছি না যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। জল বেড়ে গেলে চর ও নদীতীরবর্তী এলাকার যোগাযোগ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে জরুরি পরিস্থিতির জন্য নৌকা ও উদ্ধার ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে জনপ্রতিনিধিরা নিজেরা নৌকায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছে পরিস্থিতি দেখায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার ছবি সামনে এসেছে। বাঁকুড়ার সোনামুখী থেকে মেজিয়া দামোদর, তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার পরিস্থিতি এখন নজরে প্রশাসনের। এক দিকে কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ায় ক্ষতির হিসাব তৈরি করতে হবে, অন্য দিকে জলবন্দী পরিবারগুলির কাছে নিয়মিত ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে মানাচরের মতো নদীবেষ্টিত এলাকাগুলির দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামোগত সমস্যার সমাধানও জরুরি হয়ে উঠেছে।
শুক্রবারের এই পরিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রশাসনিক উদ্যোগও সামনে এসেছে। নৌকা চালিয়ে মন্ত্রী থেকে বিধায়ক ও জেলাশাসকের দুর্গত এলাকায় পৌঁছে যাওয়া ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে দামোদরের জলস্তর কত দ্রুত নামবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শেষ পর্যন্ত কত দাঁড়াবে, এখন সেদিকেই লক্ষ্য।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Bankura BMOH allegation | বাঁকুড়ার তালডাংরা গ্রামীণ হাসপাতালে বিস্ফোরক অভিযোগ: বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস, বিএমওএইচের বিরুদ্ধে তদন্তে নড়েচড়ে স্বাস্থ্য দফতর




