প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমঞ্চে ফের উজ্জ্বল হল ভারতের নাম। ৭৯তম ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্থাৎ British Academy Film Awards (BAFTA) ২০২৬-এ সেরার শিরোপা জিতল মণিপুরি ভাষায় নির্মিত ছবি ‘বুং’। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই সংবেদনশীল ছবিটি ‘বেস্ট চিলড্রেন’স অ্যান্ড ফ্যামিলি ফিল্ম’ বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে। প্রযোজনায় রয়েছেন বলিউডের অভিনেতা-পরিচালক Farhan Akhtar (ফারহান আখতার)। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই সাফল্য ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্রের জন্য এক নতুন অধ্যায় রচনা করল। ‘বুং’ পরিচালনা করেছেন Lakshmipriya Devi (লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী)। মণিপুরি ভাষায় নির্মিত এই ছবির নামের অর্থ ‘ছোট ছেলে’। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক কিশোর, যে তার হারিয়ে যাওয়া বাবাকে খুঁজে পেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার বিশ্বাস, বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারলেই মায়ের মুখে আবার হাসি ফুটবে। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন কিশোর শিল্পী Gugun Kipgen (গুগুন কিপগেন)। শিশুমনের আবেগ, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এক কিশোরের দিনলিপিই ছবির মূল সুর। প্রসঙ্গত, লন্ডনে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্ত ছিল আবেগঘন। ফারহান আখতার যখন তাঁর স্ত্রী Shibani Dandekar (শিবানী দান্ডেকর)-এর সঙ্গে মঞ্চে ওঠেন, তাঁদের মুখে গর্ব ও আনন্দের ছাপ ধরা পড়ে। পুরস্কার হাতে নিয়ে ফারহান বলেন, ‘ভারতের এক কোণের গল্প আজ আন্তর্জাতিক দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এই সম্মান পুরো দলের।’ তাঁর কণ্ঠে ছিল আবেগের সুর।

‘বুং’ গত সেপ্টেম্বরে মুক্তি পায়। মুক্তির আগে একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় ছবিটি। সেখানেই প্রশংসা কুড়োয়। বিদেশি সমালোচকেরা ছবির নির্মাণভঙ্গি, বাস্তবধর্মী অভিনয় এবং মানবিক গল্প বলার ধরণকে উচ্চ প্রশংসায় ভরিয়ে দেন। অনেকেই মন্তব্য করেন, ‘ছবিটি স্থানীয় মাটির গন্ধ ধরে রেখে বিশ্বজনীন অনুভূতির কথা বলেছে।’ মণিপুরের সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি ছবির প্রেক্ষাপট। অস্থিরতার মাঝেও এক শিশুর আশাভরা চোখ, এই বৈপরীত্যই ‘বুং’-কে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। ছবিতে দেখানো হয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পরিবার ও সম্পর্কের শক্তি কতটা গভীর হতে পারে। সংলাপ, চিত্রগ্রহণ ও আবহসংগীতে মণিপুরের নিজস্ব সংস্কৃতি ও প্রকৃতির ছাপ স্পষ্ট। পাহাড়, মেঘ আর নীরবতার মধ্যে এক কিশোরের যাত্রা দর্শককে আবেগে ভাসায়।
ফারহান আখতার দীর্ঘ দিন ধরেই ভিন্নধর্মী গল্পে আস্থা রেখেছেন। তাঁর প্রযোজনা সংস্থা আগেও একাধিক উল্লেখযোগ্য ছবি তৈরি করেছে। ‘বুং’ সেই ধারাকেই আরও প্রসারিত করল। উত্তর-পূর্ব ভারতের গল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে আনার প্রয়াস যে কতটা সার্থক হতে পারে, এই পুরস্কার তার প্রমাণ। অনুষ্ঠানে ফারহান বলেন, ‘এই ছবির দল মণিপুরের বাস্তবতা তুলে ধরতে নিরলস পরিশ্রম করেছে। আজ সেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি মিলল।’ তবে, ‘বেস্ট চিলড্রেন’স অ্যান্ড ফ্যামিলি ফিল্ম’ বিভাগে বিভিন্ন দেশের ছবির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল ‘বুং’। তবু নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে সেরার আসন দখল করেছে। শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বড়দের পৃথিবীকে দেখানোর যে প্রয়াস, তা দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। ছবির আবেগঘন মুহূর্তগুলিতে অনেকেই চোখের জল সামলাতে পারেননি। আবার, ভারতের আঞ্চলিক ভাষার ছবি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবু মণিপুরি ভাষার ছবির এই সাফল্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দীর্ঘ দিন ধরে মূলধারার বাইরে থাকা উত্তর-পূর্ব ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য এটি এক বড় মাইলফলক। স্থানীয় শিল্পী, কলাকুশলী এবং প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত প্রয়াস আজ বিশ্বমঞ্চে আলোচিত।
লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী পুরস্কারপ্রাপ্তির পর বলেন, ‘এই গল্প আমাদের মাটির। আমরা চেয়েছিলাম সৎভাবে তা তুলে ধরতে। আন্তর্জাতিক দর্শক তা গ্রহণ করেছেন, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’ তাঁর কথায় ছিল কৃতজ্ঞতার সুর। ছবির কিশোর অভিনেতা গুগুন কিপগেনও প্রশংসা পেয়েছেন অভিনয়ের জন্য। তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় ছবির প্রাণ হয়ে উঠেছে। BAFTA ২০২৬-এ ‘বুং’-এর জয় ভারতীয় চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য গর্বের মুহূর্ত। সামাজিক মাধ্যমে অভিনন্দনের বার্তা ভেসে এসেছে নানা প্রান্ত থেকে। অনেকেই লিখেছেন, ‘ভারতের গল্প এখন বিশ্বের গল্প।’ আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই স্বীকৃতি প্রমাণ করল, ভাষা বা ভৌগোলিক সীমানা কোনও বাধা নয়; শক্তিশালী গল্পই শেষ পর্যন্ত দর্শকের মন জয় করে। মণিপুরের এক কিশোরের হারানো বাবাকে খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন আজ ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে নতুন আলোর রেখা এঁকে দিল। ‘বুং’ শুধু একটি ছবি নয়, এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। BAFTA-র মঞ্চে ভারতের এই জয় আগামী দিনে আরও আঞ্চলিক গল্পকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kiran Rao chikungunya, Aamir Khan ex wife health | বিছানায় শয্যাশায়ী কিরণ রাও! চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত আমির খানের প্রাক্তন স্ত্রী, স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগে অনুরাগীরা




