সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি, অসম: উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছবি আবারও সামনে এল অসমে। লাগাতার বৃষ্টি ও নদীর ফুলেফেঁপে ওঠা জলের চাপে রাজ্যের একাধিক জেলা কার্যত বিপর্যস্ত। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বন্যায় মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১০০ ছুঁয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কার্বি আংলং (Karbi Anglong) ও গোলাঘাট (Golaghat) জেলায় আরও দু’জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। যদিও কিছু এলাকায় জল নামতে শুরু করেছে, তবুও পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। হাজার হাজার মানুষ এখনও ঘরছাড়া অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত সাতটি জেলায় চরাইদেও (Charaideo), দারাং (Darrang), গোলাঘাট, শিবসাগর (Sivasagar), যোরহাট (Jorhat), কার্বি আংলং এবং নওগাঁও (Nagaon) বন্যার প্রকোপে রয়েছে। এই জেলাগুলিতে প্রায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে গোলাঘাটে, যেখানে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ বন্যার কবলে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শিবসাগর, সেখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বিপর্যস্ত। যোরহাট জেলাতেও প্রায় ১৬ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয়েছে।
বন্যার ফলে এখনও ৪৫৬টি গ্রাম জলমগ্ন। বহু জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সড়কপথ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নৌকা ও বিকল্প ব্যবস্থায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দুর্গতদের জন্য ছয়টি জেলায় ১২৫টি ত্রাণশিবির ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে খাদ্য, পানীয় জল এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রশাসনের এক কর্তার কথায়, ‘যে সব এলাকায় সরাসরি পৌঁছনো সম্ভব নয়, সেখানে বিশেষ ব্যবস্থায় সাহায্য পাঠানো হচ্ছে।’ বন্যার জেরে কৃষিক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। ধানসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকদের সামনে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বহু কৃষক জানিয়েছেন, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা চাষ এক নিমেষে শেষ হয়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে গবাদি পশুরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর।
অসমের প্রধান নদীগুলির জলস্তর এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। ব্রহ্মপুত্র (Brahmaputra) ও তার উপনদীগুলির জলস্তর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে নিম্নভূমি এলাকাগুলিতে। ফলে জল নামলেও নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আবহাওয়া দফতরও জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে ঘরবাড়ির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। বহু বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, আবার অনেক বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। যেসব বাড়ি আপাতদৃষ্টিতে অক্ষত, সেগুলিতেও বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নেই। দেওয়াল ভেজা, মেঝে কাদায় ভরা, পানীয় জলের অভাব ইত্যাদি মিলিয়ে ঘরে ফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে বহু পরিবারের কাছে। ফলে অনেকেই এখনও ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।তাছাড়াও, ত্রাণশিবিরগুলিতে থাকা মানুষদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ঘরছাড়া অবস্থায় থাকার ফলে শিশু ও প্রবীণদের সমস্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার উপরও চাপ পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিকিৎসক দল মোতায়েন করা হলেও প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছনো এখনও চ্যালেঞ্জের।
রাজ্য প্রশাসন সূত্রে খবর, পরিস্থিতি সামাল দিতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উদ্ধারকাজে নেমেছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন। নৌকা, লাইফ জ্যাকেট এবং জরুরি সরঞ্জাম নিয়ে কাজ চলছে। বন্যাকবলিত মানুষদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এদিকে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এখনও কাটেনি। বহু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি, ফসল ও জীবিকা হারিয়ে দিশাহারা। তবুও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে প্রশাসনের তরফে। পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত পরিকল্পনাও তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। উল্লেখ্য যে, অসমে বন্যা নতুন কিছু নয়, কিন্তু প্রতি বছরই এর ভয়াবহতা নতুন করে সামনে আসে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাজ্যটি বারবার এই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। তবে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Assam polygamy ban policy, Himanta Biswa Sarma polygamy rule | বহুবিবাহে কড়া রাশ অসমে! চাকরি যাবে, বন্ধ হবে সরকারি সুবিধা : বাজেটে বড় ঘোষণা, তুমুল আলোচনা রাজ্যজুড়ে




