Aravalli Hills environmental crisis | আরাবল্লী ধ্বংস হলে কি দিল্লি মরুভূমি হবে? পরিবেশ সংকটে প্রাচীন পাহাড়

SHARE:

Ancient Aravalli Hills face environmental threat due to new definition. Experts warn of desertification and pollution in North India. উন্নয়নের নামে আরাবল্লী পর্বতের সংজ্ঞা বদল। বিপন্ন পরিবেশ, জল ও বায়ু ভারসাম্য। কী বলছে সরকার?

বিনীত শর্মা ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : হিমালয়েরও বহু আগে জন্ম নেওয়া এক প্রাচীন প্রহরী আজ অস্তিত্বের লড়াইয়ে। প্রায় ৩২০ কোটি বছর পুরনো আরাবল্লী পর্বত (Aravalli Hills) শুধু ভারতের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের অংশ নয়, উত্তর ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্যের মূল স্তম্ভ। গুজরাট (Gujarat) থেকে রাজস্থান (Rajasthan), হরিয়ানা (Haryana) হয়ে দিল্লি (Delhi) পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই পাহাড় যুগের পর যুগ ধরে থর মরুভূমি (Thar Desert)-কে পূর্বদিকে এগিয়ে আসা থেকে আটকে রেখেছে। আজ সেই আরাবল্লীই ধ্বংসের মুখে, আর সেই বিপদের আঁচ পড়তে পারে দিল্লি-এনসিআর (Delhi-NCR) থেকে গোটা উত্তর ভারতে।

উন্নয়নের যুক্তিতে সম্প্রতি আরাবল্লী পর্বতের আইনি সংজ্ঞা বদল করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক (Ministry of Environment, Forest and Climate Change) জানিয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ নয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু ভূখণ্ডকেই পর্বত হিসেবে গণ্য করা হবে। গত ২০ নভেম্বর এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, প্রতিবাদ ও আশঙ্কা।পরিবেশবিদদের দাবি, এই নতুন সংজ্ঞার ফলে রাজস্থানের আরাবল্লী পর্বতের প্রায় ৯৩ শতাংশই সুরক্ষার বাইরে চলে যাবে। সরকারি ও গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, আরাবল্লী রেঞ্জে প্রায় ১.৬ লক্ষ পাহাড়চূড়ার মধ্যে মাত্র ১০৪৮টির উচ্চতা ১০০ মিটারের বেশি। বাকি অধিকাংশ শৃঙ্গের উচ্চতা ৩০ থেকে ৮০ মিটারের মধ্যেই। অর্থাৎ নতুন সংজ্ঞা কার্যকর হলে আইনের ফাঁক গলে এই বিশাল অংশে খনন, নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কার্যকলাপ শুরু হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

আরও পড়ুন : Mussoorie registration, QR Code Travel India, Uttarakhand travel update | মুসৌরি ঘুরতে গেলে লাগবে প্রি-রেজিস্ট্রেশন, চালু নতুন কড়া নিয়মাবলি: ভ্রমণকারীদের জন্য জরুরি নির্দেশিকা

এর প্রভাব কী হতে পারে? পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, আরাবল্লী শুধু পাহাড় নয়, উত্তর ভারতের প্রাকৃতিক লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। এই পর্বতশ্রেণি বর্ষাকালে জলীয় বাষ্পকে আটকে রেখে রাজস্থান ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বৃষ্টিপাতে সহায়তা করে। আরাবল্লী ক্ষয় হলে বৃষ্টির প্যাটার্ন বদলে যেতে পারে। জলীয় বাষ্প পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে পাকিস্তানের দিকে চলে যেতে পারে, যার ফলে রাজস্থান ও হরিয়ানা জুড়ে ভয়াবহ খরা দেখা দিতে পারে। উল্লেখ্য, চম্বল (Chambal), বানাস (Banas), সাহিবি (Sahibi), কসাবতী (Kasavati), গম্ভীরী (Gambhiri), সোতা (Sota), মোরেল (Morel) -এর মতো বহু নদীর উৎপত্তি এই আরাবল্লী থেকেই। পাহাড় ক্ষয়ে গেলে এই নদীগুলিও শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি, পানীয় জল এবং জীবিকায়।

আরাবল্লীর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল মরুভূমির অগ্রগতি রোধ করা। এই পর্বতশ্রেণি না থাকলে থর মরুভূমি পূর্ব দিকে এগিয়ে এসে দিল্লি ও উত্তর প্রদেশের (Uttar Pradesh) বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে গ্রাস করতে পারে। তার সঙ্গে বাড়বে ধুলোঝড়, তাপপ্রবাহ ও বায়ুদূষণ। দিল্লি-এনসিআরের মানুষ যে সামান্য শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পান, সেটাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণেও আরাবল্লীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে গুরুগ্রাম (Gurugram) ও ফরিদাবাদ (Faridabad)-এ ভয়াবহ জলসঙ্কটের সময় এই আরাবল্লীই ভূগর্ভস্থ জলের আধার হিসেবে কাজ করেছিল। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে আলওয়ার (Alwar) জেলায় একাধিক নদী শুকিয়ে গেলে আরাবল্লীর ওপর বাঁধ তৈরি করে জল ধরে রেখে প্রায় এক হাজার গ্রামকে খরা থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল।

আরও পড়ুন : Travelog : Nahargarh Fort, Rajasthan | রাজপ্রাসাদের ছায়ায় নাহারগড়, জমকালো ঐতিহ্যের ব্যঞ্জনা

কিন্তু আরাবল্লীর ওপর নজর নতুন নয়। ১৯৭০ ও ৮০ -এর দশক থেকেই এখানে ব্যাপক হারে খনন শুরু হয়। পাথর, মার্বেল, কোয়ার্টজ তোলার নামে পাহাড় কেটে উজাড় করে দেওয়া হয় বনাঞ্চল। ফলস্বরূপ নেমে যায় জলস্তর, বাড়ে ধুলোঝড় ও দূষণ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয় যে, ২০০২ ও ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দেয়, আরাবল্লীতে খনন নিষিদ্ধ। পরিবেশগত ছাড় ছাড়া কোনও প্রকল্প অনুমোদন করা যাবে না।এর পরেও বেআইনি কার্যকলাপ থামেনি। খননের বদলে শুরু হয় নতুন খেলা, বিলাসবহুল ফার্মহাউস, রিসর্ট, হাইওয়ে নির্মাণ। গুরুগ্রাম ও ফরিদাবাদে চোখে পড়ে সেই চিত্র। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত সেন্ট্রাল এমপাওয়ার্ড কমিটি (Central Empowered Committee) -এর রিপোর্টে প্রকাশ পায়, রাজস্থানের আরাবল্লীর প্রায় ২৫ শতাংশ ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। শুধু আলওয়ার জেলাতেই ১২৮টি পাহাড়চূড়ার মধ্যে ৩১টি খননের কবলে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সংজ্ঞা নিয়ে আশঙ্কা আরও বেড়েছে। পরিবেশবিদ ও আন্দোলনকারীদের দাবি, গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা ও দিল্লি জুড়ে বিস্তৃত আরাবল্লী রেঞ্জকে ‘বাস্তুসঙ্কটপন্ন এলাকা’ (Ecologically Critical Area) ঘোষণা করা হোক এবং সমস্ত খনন কার্যকলাপ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হোক। তবে কেন্দ্রের বক্তব্য আলাদা। কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব (Bhupender Yadav) দাবি করেছেন, আরাবল্লীর ক্ষেত্রে কোনও পরিবেশগত ছাড় দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মোট ১.৪৪ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে মাত্র ০.১৯ শতাংশ অংশ খননের উপযোগী। বাকি অংশ সুরক্ষিত থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই ঝাড়খণ্ডের সারান্ডা (Saranda)-র মতো নির্দিষ্ট মাইনিং প্ল্যান তৈরি করা হবে, যেখানে বিশেষজ্ঞদের অনুমোদন ছাড়া কোনও খনন হবে না।কেন্দ্রের দাবি, নতুন সংজ্ঞা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য, ধ্বংসের জন্য নয়। কিন্তু পরিবেশবিদদের প্রশ্ন, এত সূক্ষ্ম বাস্তুতন্ত্রে সামান্য ছাড়ও কি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে না? আরাবল্লী বাঁচানো মানে শুধু পাহাড় বাঁচানো নয়, উত্তর ভারতের ভবিষ্যৎ, জল, বাতাস এবং জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত 
আরও পড়ুন : Rajgad Travelog in Bengali with full travel details | রাজগড়ে একদিন: সাহ্যাদ্রি পাহাড়ে হারানো রাজ্যের খোঁজ

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন