সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana) নিয়ে বড় খবর। সোমবার থেকে রাজ্য সরকারের তরফে এই প্রকল্পের টাকা উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রথম দফায় প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পেতে চলেছেন। তাঁদের জন্য মোট ৪৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে নথি যাচাইয়ের পর প্রায় ১৭ লক্ষ আবেদন বাতিল হয়েছে। ফলে আবেদনকারীদের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, কেন তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেল, আবার কী ভাবে আবেদন করা যাবে, কবে থেকে নতুন করে ফর্ম পূরণের সুযোগ মিলবে! তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। নবান্নে সোমবার সাংবাদিক বৈঠকে অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার (Sumana Sarkar) ও তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রতিমন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী (Purnima Chakraborty)। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন নারী ও শিশুকল্যাণ দফতরের সচিব মৌমিতা গোদারা (Moumita Godara)। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্টের মধ্যে প্রথম দফায় যোগ্য উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে দেওয়ার কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ১ কোটি ৬২ লক্ষ আবেদন যাচাই করা হয়েছে। সেই যাচাইয়ের পর ১৭ লক্ষ আবেদন বাতিল হয়েছে। এর ফলে প্রথম দফায় টাকা পাওয়ার জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন ১ কোটি ৪৫ লক্ষ আবেদনকারী। তাঁদের অ্যাকাউন্টে মোট ৪৩৫০ কোটি টাকা পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু, এখানেই আবেদন যাচাইয়ের কাজ শেষ হচ্ছে না। ১০ জুলাই পর্যন্ত অন্নপূর্ণা যোজনায় মোট প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছিল। তার মধ্যে একটি বড় অংশের নথি এখনও যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ১১ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত যাঁরা অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করেছেন, তাঁদের নথি এখনও পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেই কাজ শেষ করতে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে এই সময়ের মধ্যে যাঁদের আবেদন যাচাই হবে, তাঁদের টাকা পরবর্তী পর্যায়ে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রথম দফায় ১৭ লক্ষ আবেদন বাতিল হওয়ার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংযোগের সমস্যা। নবান্নের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া আবেদনের মধ্যে অন্তত ১০ লক্ষ ক্ষেত্রে আধার কার্ডের নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। ফলে নথি যাচাইয়ের সময় সেই আবেদনগুলি বাতিল করা হয়েছে। শুধু আধার-বাংলার সংযোগের সমস্যাই নয়, আরও কয়েকটি কারণেও আবেদন বাতিল হয়েছে। সরকারি কর্মচারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া কিংবা আয়করদাতা হওয়া, এই ধরনের কারণেও কিছু আবেদনকারীর নাম বাদ পড়েছে। প্রকল্পের নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করলে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে যাঁরা টাকা পাওয়ার আশায় আবেদন করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নথিতে কোনও ভুল বা তথ্যের অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তবে আবেদন বাতিল হওয়া মানেই সুযোগ একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে না। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, যাঁদের আবেদন বাতিল হয়েছে, তাঁরা নির্দিষ্ট পোর্টালের মাধ্যমে আবার আবেদন করার সুযোগ পাবেন। এর জন্য পোর্টালে থাকা ‘সোশ্যাল রেজিস্টার’ (Social Register) অপশনে গিয়ে নতুন করে আবেদন জানাতে হবে। সংশ্লিষ্ট আবেদন আবার জেলাশাসক স্তরে যাচাই করা হবে। নথিতে প্রয়োজনীয় তথ্য ঠিক থাকলে এবং প্রকল্পের শর্ত পূরণ করলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পেতে পারেন।
আরও উল্লেখ, এই মুহূর্তে ওই পোর্টালে নতুন করে আবেদন করার সুযোগ বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ২০ আগস্ট থেকে ফের আবেদন করার ব্যবস্থা চালু হবে। যাঁদের আবেদন বাতিল হয়েছে, তাঁরাও সেই সময় নিজেদের অভিযোগ জানাতে পারবেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নতুন করে আবেদন করার সুযোগও থাকবে। যাঁরা প্রথম বার আবেদন করেননি, তাঁদের ক্ষেত্রেও নিয়ম রয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে নতুন আবেদন গ্রহণের সুযোগ থাকবে না। ফলে যাঁরা এখনও প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেননি, তাঁদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
আধার কার্ড ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংযোগের সমস্যা দূর করতেও জেলা প্রশাসনকে সক্রিয় করা হয়েছে। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, ব্লক স্তরে বিডিও-রা (BDO) ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। প্রয়োজন হলে বিভিন্ন এলাকায় শিবির আয়োজন করে উপভোক্তাদের আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে যাঁদের আবেদন শুধু আধার-ব্যাঙ্ক সংযোগের ত্রুটির কারণে আটকে গিয়েছে, তাঁদের সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে। অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য আয় ও সম্পত্তি সংক্রান্ত কিছু শর্তও রয়েছে। সরকারের তরফে আগে জানানো হয়েছিল, মাসিক আয় ১০ হাজার টাকার বেশি হলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। একই ভাবে পরিবারের বার্ষিক আয় ১২ লক্ষ টাকার বেশি হলেও সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জমির মালিকানার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম রাখা হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সাতটি পুরনিগম এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে ৫০ ডেসিমেলের বেশি জমি থাকলে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। তবে গ্রামীণ এলাকার জমির ক্ষেত্রে কিছুটা আলাদা নিয়ম রয়েছে। আবেদন যাচাইয়ের সময় আয়, পেশা, জমির মালিকানা, আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট-সহ একাধিক তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সোমবার মানবাজার থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, আগের সরকারের সময়ে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫০০ টাকা করে দেওয়া হত এবং সেই টাকা পৌঁছতে দীর্ঘ সময় লাগত। বর্তমান সরকার টাকা দেওয়ার আগে নথি যাচাইয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, ‘আপনি তো চান না সরকারি টাকা এ ভাবে নয়ছয় হোক। তাই ঝাড়াইবাছাই করতে আমাদের সময় লেগেছে।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, প্রথম দফায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে ৩০০০ টাকা করে পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে জনকল্যাণ শিবিরের মাধ্যমে আরও বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আবেদন গ্রহণের কথাও জানান তিনি। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং দিব্যাঙ্গ ভাতার মতো প্রকল্পে যোগ্য ব্যক্তিদের আবেদন গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে তাই এখন নজর দু’টি দিকে। এক দিকে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছনোর প্রক্রিয়া চলছে, অন্য দিকে ১৭ লক্ষ বাতিল আবেদন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে যাচাইয়ের সুযোগ। যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য ঠিক রয়েছে কি না, আয় ও সম্পত্তি সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করছেন কি না, তা আগে দেখে নিতে হবে। ২০ অগস্ট থেকে পোর্টাল খুললে ফের আবেদন করার সুযোগ থাকবে। ফলে প্রথম দফায় তালিকা থেকে বাদ পড়লেও যোগ্য আবেদনকারীদের সামনে ফের সুযোগ থাকছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Netaji Seva Kendra West Bengal, Suvendu Adhikari Announcement | প্রতি বিধানসভায় ‘নেতাজী সেবাকেন্দ্র’, মাসে ৩০ হাজার টাকা! প্রাক্তন বিধায়কদের চিকিৎসাভাতাও বাড়ল, বিধানসভায় বড় ঘোষণা শুভেন্দুর




