সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : হকি বিশ্বকাপের (Hockey World Cup) দ্বিতীয় ম্যাচেই ধাক্কা খেল ভারত। সোমবার আমস্টেলভিনে (Amstelveen) ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়ের জায়গায় পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত ২-৪ গোলে হেরে মাঠ ছাড়তে হল হরমনপ্রীত সিংদের (Harmanpreet Singh)। ম্যাচের একটা বড় সময় ভারত এগিয়ে ছিল। কিন্তু তৃতীয় কোয়ার্টার থেকে ছবিটা বদলাতে শুরু করে। শেষ দিকে রক্ষণে একের পর এক ভুল এবং ইংল্যান্ডের আক্রমণের চাপ সামলাতে না পারায় ম্যাচ হাতছাড়া হয় ভারতের। ম্যাচের শুরু থেকেই ভারতকে যথেষ্ট সক্রিয় দেখাচ্ছিল। আক্রমণে উঠে একাধিক বার ইংল্যান্ডের রক্ষণে চাপ তৈরি করেন ভারতীয় খেলোয়াড়েরা। জার্মনপ্রীত সিংয়ের (Jarmanpreet Singh) একটি জোরালো শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। অন্য দিকে, ইংল্যান্ডও দ্রুত আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করছিল। ম্যাচের ১১ মিনিটে পেনাল্টি কর্নার পেয়ে যায় তারা। সেই সময় ভারতীয় রক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন মনপ্রীত সিংহ (Manpreet Singh)। সামনে এসে ইংল্যান্ডের প্রয়াস তিনি আটকে দেন।
কিন্তু বেশিক্ষণ ভারতকে গোলশূন্য রাখা সম্ভব হয়নি। ১৩ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল পেয়ে যায় ইংল্যান্ড। মাঝমাঠ থেকে বাড়ানো লম্বা পাস ধরে নেন স্টুয়ার্ট রাশমেয়ার (Stuart Rushmere)। সেখান থেকে সতীর্থ নিকোলাস বান্দুরাকের (Nicholas Bandurak) কাছে তিনি বল বাড়িয়ে দেন। গোলের সামনে সুযোগ পেয়ে কোনও ভুল করেননি বান্দুরাক। তাঁর শটে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। প্রথম কোয়ার্টারের বাকি সময় ভারত গোল শোধ করার চেষ্টা করলেও ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। তবে দ্বিতীয় কোয়ার্টারের শুরুতেই ম্যাচে ফেরে ভারত। পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করেন অধিনায়ক হরমনপ্রীত। তাঁর শট ছিল এতটাই নিখুঁত যে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষকের পক্ষে সেটি থামানোর সুযোগ ছিল না। গোলের কোণ লক্ষ্য করে নেওয়া সেই শটে ১-১ করে ভারত।
সমতা ফেরানোর পর ভারতীয় দল আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মাত্র দু’মিনিটের মধ্যে আবার গোলের সুযোগ আসে। পেনাল্টি কর্নার থেকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটি কাজে লাগাতে পারেনি ভারত। সেই সুযোগ নষ্ট হওয়ার পরেও আক্রমণের ঝাঁঝ কমেনি। দ্বিতীয় কোয়ার্টারেই ম্যাচে প্রথম বার এগিয়ে যায় ভারত। বাঁ দিক দিয়ে দুর্দান্ত ভাবে উঠে আসেন হার্দিক সিং (Hardik Singh)। ইংল্যান্ডের এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে জায়গা তৈরি করে তিনি বল বাড়িয়ে দেন গোলের বিপরীত দিকে থাকা দিলপ্রীত সিংয়ের (Dilpreet Singh) কাছে। বল পেয়ে স্টিকের হালকা স্পর্শে সেটিকে জালে পাঠিয়ে দেন দিলপ্রীত। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় ভারত। এই সময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ভারতের হাতে চলে এসেছিল। বল দখলে রেখে একের পর এক আক্রমণ তৈরি করছিলেন ভারতীয় খেলোয়াড়েরা। ইংল্যান্ডও গোলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। দ্বিতীয় কোয়ার্টারের শেষ দিকে তারা গোল করলেও সেটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে বিরতিতে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়ে ভারত।
তৃতীয় কোয়ার্টারের শুরুতেও ভারতের দাপট বজায় ছিল। বলের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে ছিল ভারতীয় দল। গোলের দিকে তাঁরাএকাধিক শটও নেয়। ম্যাচের একটা পর্যায়ে ভারতের শটের সংখ্যা আটে পৌঁছে যায়। কিন্তু গোলের ব্যবধান বাড়াতে না পারার খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে দলকে। ৩৯ মিনিটে সমতা ফেরায় ইংল্যান্ড। সতীর্থের কাছ থেকে বল পেয়ে রাশমেয়ার দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে হালকা ফ্লিক করেন। সেই বল ভারতীয় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালে গিয়ে পৌঁছয়। ২-২ হয়ে যায় ম্যাচ।
সমতা ফেরার পর ম্যাচ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। দু’দলই আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করছিল। ইংল্যান্ডের একটি প্রতি-আক্রমণ থেকে গোলের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যদিও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি তারা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের চাপ বাড়ায় ইংল্যান্ড। তৃতীয় কোয়ার্টার শেষ হওয়ার মাত্র দু’মিনিট আগে ভারতীয় রক্ষণে বড় ধাক্কা আসে। হেনরি ক্রফট (Henry Croft) গোল করে ইংল্যান্ডকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ইংল্যান্ড। কিছুক্ষণ আগেও যে ম্যাচে ভারত এগিয়ে ছিল, সেটিই তখন ঘুরে যায়।
শেষ কোয়ার্টারে গোল শোধ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে ভারত। শুরুতেই পেনাল্টি কর্নার আদায় করে নেওয়ার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সেটি থেকে গোল করতে পারেনি ভারতীয় দল। ৫০ মিনিটে অভিষেকের (Abhishek) কাছেও সুযোগ আসে। বাঁ প্রান্ত দিয়ে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে বক্সের দিকে উঠে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর শট পোস্টের বাইরে চলে যায়। এরপরেও ভারত একাধিক বার ইংল্যান্ডের বক্সে ঢোকার চেষ্টা করে। ৫১ মিনিটে বক্সের মধ্যে মনদীপ সিং (Mandeep Singh) পড়ে গেলে ভারতীয় খেলোয়াড়েরা পেনাল্টি স্ট্রোকের আবেদন করেন। রেফারালের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত ভারতের পক্ষে যায়নি।
ম্যাচের শেষ দিকে ভারতের উপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয় ইংল্যান্ড। পর পর দু’টি পেনাল্টি কর্নার আদায় করে নেয় তারা। দ্বিতীয় পেনাল্টি কর্নার থেকেই গোল আসে। বান্দুরাক নিজের দ্বিতীয় গোল করে ইংল্যান্ডের জয় প্রায় নিশ্চিত করে দেন। ৪-২ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচে ফেরার সময় আর ছিল না ভারতের হাতে। ম্যাচের ফল শুধু স্কোরলাইনে ভারতের হারই দেখাচ্ছে না, তা এগিয়ে থাকার পর কী ভাবে ম্যাচের শেষ পর্যায়ে রক্ষণ সামলাতে হয়, সেই জায়গাতেও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে ভারত যে আক্রমণাত্মক হকি খেলেছিল, তাতে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় কোয়ার্টারের শেষ দিকে পর পর দুই গোল খাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে ভারত ২৪ বার মুখোমুখি হয়েছিল। তার মধ্যে ১০টি ম্যাচে ভারত জয় পেয়েছিল এবং ৯ বার হেরেছিল। তাই পরিসংখ্যানের দিক থেকেও দু’দলের লড়াই যথেষ্ট কাছাকাছি। এ বার অবশ্য বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডই শেষ হাসি হাসল। উল্লেখ্য, ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াল সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা। পেনাল্টি কর্নার থেকে একাধিক সুযোগ তৈরি হলেও সব ক্ষেত্রে তা গোলের মুখে নিয়ে যেতে পারেনি দল। বিপরীতে ইংল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পাওয়া সুযোগগুলিকে কাজে লাগিয়েছে। রাশমেয়ার ও বান্দুরাক দু’টি করে গোল করে ইংল্যান্ডের জয়ে বড় ভূমিকা নেন। বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতায় একটি ম্যাচের ফলই পুরো ছবির শেষ কথা নয়। তবে গ্রুপ পর্বে পরবর্তী ম্যাচগুলিতে ভারতকে এই হারের ভুলগুলি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে রক্ষণে শেষ মুহূর্তের চাপ সামলানো, পেনাল্টি কর্নারের সুযোগ কাজে লাগানো ও এগিয়ে থাকার পর ম্যাচের গতি নিজেদের হাতে রাখাই হবে দলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। হরমনপ্রীতদের সামনে তাই এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। দ্বিতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ২-৪ গোলে হার ভারতের বিশ্বকাপ অভিযানকে কঠিন করে দিলেও প্রতিযোগিতার লড়াই এখনও বাকি। পরের ম্যাচগুলিতে ফল নিজেদের পক্ষে আনতে পারলে ফের ছন্দে ফিরতে পারে ভারতীয় দল। তবে সোমবারের ম্যাচ থেকে একটি শিক্ষা ইতিমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, এগিয়ে থাকা আর জয় নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়, শেষ বাঁশি পর্যন্ত একই মাত্রার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই বড় পরীক্ষা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Galle Test : India vs Sri Lanka Test latest news | শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৭৮ রানে এগিয়ে ভারত, গল টেস্টে তৃতীয় দিনেই ঘুরছে ম্যাচের হাওয়া! চাপে আয়োজকেরাই




