Ajit Pawar death, Maharashtra politics | দাদা থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু: মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে অজিত পাওয়ার কেন ছিলেন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : মহারাষ্ট্রের রাজনীতি বুধবার হঠাৎ করেই হারাল একটি পরিচিত, প্রভাবশালী মুখ। বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ার (Ajit Pawar) -এর। বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। নিজের রাজনৈতিক ‘গড়’ বারামতীতে (Baramati) পৌঁছনোর আগেই জীবন থেমে গেল এমন একজন নেতার, যাঁকে সমর্থক-বিরোধী নির্বিশেষে ‘দাদা’ বলেই ডাকতেন। এই আকস্মিক বিদায়ে শুধু এনসিপি (NCP) নয়, গোটা মহারাষ্ট্র রাজনীতিতেই তৈরি হয়েছে এক শূন্যতা। প্রশ্ন উঠছে, কেন এবং কীভাবে অজিত পাওয়ার রাজ্যের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন?

আরও পড়ুন : Ajit Pawar | ঘন কুয়াশার গ্রাসে বারামতী আকাশ, অবতরণের মুহূর্তে ভেঙে পড়ল উপমুখ্যমন্ত্রীর বিমান, রহস্যে মোড়া দুর্ঘটনায় শোকস্তব্ধ রাজ্য

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অজিত পওয়ারের উত্থানকে বুঝতে গেলে ফিরে যেতে হয় আশির দশকে। ১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার দেওলালি প্রভারা এলাকায় জন্ম তাঁর। পরিবারই ছিল রাজনীতির আঁতুড়ঘর। কাকা শরদ পওয়ার (Sharad Pawar) তখন থেকেই মহারাষ্ট্র ও জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। সেই ছায়াতেই রাজনীতির হাতেখড়ি অজিতের। শুরুতে স্থানীয় প্রশাসন, সমবায় আন্দোলন এবং বিশেষ করে পশ্চিম মহারাষ্ট্রের আখচাষি ও চিনিকল রাজনীতিতে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেন। এই ক্ষেত্রটি ছিল শরদ পাওয়ারের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক জমি শক্ত করেন অজিত। উল্লেখ্য, প্রথম দিকে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘শরদের ভাইপো’ হিসেবেই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয়ের গণ্ডি ভেঙে নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা তৈরি করতে সক্ষম হন। বারামতী বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ১৯৯১ সাল থেকে টানা জিতে আসা এই নেতা স্থানীয় স্তরে এমন প্রভাব গড়ে তুলেছিলেন, যা মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে বিরল। শরদ পাওয়ার যখন মুখ্যমন্ত্রী, তখন অজিত প্রথমবার রাজ্যের মন্ত্রী হন। পরে কংগ্রেস-এনসিপি জোট সরকারের আমলেও গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। বিদ্যুৎ, কৃষি, জলসম্পদ এমন একাধিক দফতরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রশাসনিকভাবে শক্ত ভিত দেয়।

অজিত পওয়ারের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, ক্ষমতার অন্দরমহলের সমীকরণ বোঝার দক্ষতা। মহারাষ্ট্র রাজনীতি গত কয়েক বছরে একাধিক ‘বর্ষা বিদ্রোহ’ -এর সাক্ষী। ২০২২ সালে শিবসেনা ভেঙে একনাথ শিন্দে (Eknath Shinde) বিজেপির (BJP) সহায়তায় ক্ষমতায় আসেন। সেই বিদ্রোহে ভেঙে যায় শিবসেনা-কংগ্রেস-এনসিপির জোট সরকার। ঠিক এক বছর পর, ২০২৩ সালের ২ জুলাই, রাজ্য রাজনীতিতে ফের ঝড় তোলেন অজিত। এবার বিদ্রোহের মুখে পড়েন তাঁর কাকা শরদ পাওয়ার। অজিতের নেতৃত্বে এনসিপির একটি বড় অংশ ভেঙে বিজেপি-শিবসেনা (শিন্দে গোষ্ঠী) জোটে শামিল হয়। এই সিদ্ধান্তেই রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যান অজিত। ন’জন বিধায়ক নিয়ে তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দেন, নিজে হন উপমুখ্যমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশনের রায়ে দলের নাম ও প্রতীকও যায় তাঁর দখলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন, এই দুই কারণেই বিজেপি তাঁকে উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়। একই সঙ্গে শিন্দেকে চাপে রাখার কৌশলও ছিল এই সিদ্ধান্তের মধ্যে।

কিন্তু, সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও এসেছে অজিতের জীবনে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন এনসিপি আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে বারামতীতেই। এই আসনে অজিতের স্ত্রী সুনেত্রা পাওয়ার (Sunetra Pawar) হেরে যান শরদ পাওয়ারের কন্যা সুপ্রিয়া সুলে (Supriya Sule) -এর কাছে। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই ফলাফল অজিতের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে। কিন্তু বছর ঘুরতেই বিধানসভা নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ায় তাঁর দল। শাসকজোটের শরিক হিসেবে এনসিপি ৪১টি আসনে জয় পায় এবং অজিত ফের উপমুখ্যমন্ত্রী হন। এই সময়েই রাজনীতিতে তিনি একটি নতুন ইঙ্গিত দেন। জানুয়ারি মাসে একাধিক সাক্ষাৎকারে অজিত বলেন, পরিবারে আর অশান্তি নেই এবং দুই এনসিপির মিলন অসম্ভব নয়। পুণে ও পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড় পুরনিগম নির্বাচনে শরদ ও অজিত দুই শিবিরের একসঙ্গে লড়াই সেই ইঙ্গিতকেই আরও জোরালো করে। বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোটে থেকেও নিজেদের ‘গড়’ রক্ষায় কাকা-ভাইপোর এই সমঝোতা মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।

বিতর্ক অবশ্য অজিতের পিছু ছাড়েনি। জলসম্পদ মন্ত্রী থাকাকালীন আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি পুত্র পার্থ পওয়ার (Parth Pawar) -এর নাম জড়িয়েছে জমি-বিতর্কে। সরকারি জমি কেনাবেচা নিয়ে তৈরি হওয়া সেই বিতর্কে রাজ্য সরকার জরিমানাও ধার্য করে। তবু সমালোচকেরাও মানেন, প্রশাসনিক দক্ষতায় অজিত ছিলেন অনন্য। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, কাজ শেষ করার ক্ষমতা এবং স্থানীয় স্তরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ—এই গুণগুলিই তাঁকে আলাদা করেছিল।মঙ্গলবারও তিনি রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে বুধবার সকালে মুম্বই (Mumbai) থেকে বিমানে বারামতী যাচ্ছিলেন। কিন্তু অবতরণের আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাই শুধু একজন উপমুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যু নয়, হারিয়ে গেল এক দক্ষ সংগঠক, প্রশাসক এবং ক্ষমতার রাজনীতির অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। অজিত পওয়ারের মৃত্যুতে তাঁর এনসিপির ভবিষ্যৎ এবং রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ, দু’টিই এখন বড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে।

ছবি: সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ বাইশ-তম কিস্তি)

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন