সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন চরমে, তখন কলকাতার বালিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে একেবারে অন্য ধরনের প্রার্থীর গল্প সামনে এসেছে। সিপিআই (এম) -এর তরুণ মুখ আফরিন বেগম (Afreen Begum) এখন শুধু রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য নয়, তাঁর জীবনযাপন, আর্থিক অবস্থা এবং প্রচারের ধরন নিয়েও আলোচনার কেন্দ্রে। মাত্র ৫০০ টাকা নগদ হাতে নিয়ে নির্বাচনের ময়দানে নেমেছেন আফরিন। নির্বাচন কমিশনে (Election Commission) জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি নিজেকে কার্যত ‘সর্বহারা’ বলে উল্লেখ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, তাঁর কোনও স্থাবর সম্পত্তি নেই, না আছে বাড়ি, না জমি, না গাড়ি। আয় না থাকায় কর দেওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। এই সরল আর্থিক চিত্রই তাঁকে অন্য প্রার্থীদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
কিন্তু অর্থের অভাব থাকলেও মানসিকভাবে নিজেকে স্থির রাখার আলাদা উপায় খুঁজে নিয়েছেন আফরিন। প্রচারের চাপ, রাজনৈতিক আক্রমণ, সবকিছুর মাঝেও তিনি বলছেন, ‘বন্ধুদের পাঠানো মিম দেখে মাথা ঠান্ডা রাখছি।’ এই সহজ স্বীকারোক্তি ইতিমধ্যেই তরুণ ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ঘিরে থাকা প্রজন্মের কাছে এই মানবিক দিকটি তাঁকে আরও কাছের করে তুলছে। উল্লেখ্য, আফরিন বেগমের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University)-এর ছাত্র রাজনীতি থেকে। এসএফআই (SFI)-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি লালবাজার (Lalbazar) অভিযান হোক বা ক্যাম্পাসভিত্তিক আন্দোলন, সব জায়গাতেই সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। যদিও দীর্ঘদিন তিনি আলোচনার বাইরে ছিলেন, সম্প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিসরে উপস্থিত থাকার কারণে সংবাদমাধ্যমের নজরে আসেন। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ডাকা বৈঠকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম (Mohammad Salim) এবং রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শমীক লাহিড়ী (Shamik Lahiri)-এর সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি আলোচনায় আসে। সেখানে জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar)-এর সামনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছিলেন আফরিন। সেই ঘটনার পর থেকেই দলের অন্দরে তাঁকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
অবশেষে বালিগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করেন মহম্মদ সেলিম ও বিমান বসু (Biman Bose)। মাত্র ২৯ বছর বয়সী এই তরুণী তখন থেকেই লাগাতার প্রচারে ব্যস্ত। ভোর পাঁচটা থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। বালিগঞ্জের অলিগলি থেকে আবাসন, সমস্ত জায়গাতেই পৌঁছে যাচ্ছেন নিজের বক্তব্য নিয়ে। তাঁর বক্তব্যের ধরন ও যুক্তি অনেকের নজর কাড়ছে। কিন্তু আর্থিক দিক থেকে তিনি যে একেবারেই পিছিয়ে, সেটিও সমানভাবে সামনে এসেছে। হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর নামে তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এসবিআই (State Bank of India)-তে রয়েছে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৭০২ টাকা ৮২ পয়সা। পার্ক সার্কাসের (Park Circus) ইন্ডিয়ান ব্যাংক (Indian Bank)-এ রয়েছে ১৪১ টাকা ৪০ পয়সা এবং এজেসি বোস রোডের (AJC Bose Road) ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাংক (Indian Overseas Bank)-এ রয়েছে ১,৯৪১ টাকা। এ ছাড়াও প্রায় ৩০ হাজার টাকার শেয়ার রয়েছে তাঁর নামে, যদিও বর্তমান বাজারে তার মূল্য কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি তিনি ৮,৪৬৩ টাকার একটি এলআইসি (LIC) প্রিমিয়াম দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে তাঁর অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৭৬ হাজার ৭৭৭ টাকা ৮২ পয়সা।
শিক্ষাগত দিক থেকেও আফরিন যথেষ্ট যোগ্য। ২০২০ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন আফরিন। বর্তমানে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কোনও স্থায়ী আয় না থাকায় তিনি পুরোপুরি রাজনৈতিক ও একাডেমিক কাজেই সময় দিচ্ছেন। পার্টির হোলটাইমার না হওয়ায় সংগঠন থেকেও নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পান না। রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে একাধিকবার পুলিশি আটক হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা নেই। পুলিশি নথিতে তাঁর নাম পরিচ্ছন্ন বলেই উল্লেখ। উল্লেখ্য, বালিগঞ্জের নির্বাচনী লড়াই এমনিতেই হাইপ্রোফাইল। সেখানে এই ধরনের এক ‘সাধারণ’ প্রার্থীর উপস্থিতি অনেকের আগ্রহ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটা তৈরি হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। আফরিন নিজে অবশ্য খুব বাস্তববাদী। তিনি জানাচ্ছেন, ‘লড়াইটা সহজ নয়, কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছনোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তাঁর প্রচারে বড় মাপের আয়োজন নেই, আছে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা। এখন প্রশ্ন একটাই, এই সরল জীবনযাপন, সীমিত সম্পদ আর ভিন্ন ধরণের প্রচার কি ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলতে পারবে? উত্তর মিলবে ফল ঘোষণার দিন। তবে আপাতত বালিগঞ্জে ‘মিম দেখে চাপ সামলানো’ এই প্রার্থীই আলোচনার কেন্দ্রে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Raninagar Assembly CPIM Rally, Afreen Begum Shilpi Speech | রানিনগরে বামফ্রন্টের বিশাল বাইক মিছিল, সভায় আফরিন বেগম শিল্পীর তীব্র আক্রমণ রাজ্য ও কেন্দ্রকে


