Abhaya Ma Nabadwip Durga Puja | অসুরবধ নয়, নবদ্বীপে মহিষাসুরমর্দিনী পূজিতা হন ‘অভয়া মা’ রূপে

SHARE:

এই পূজা বাংলার দুর্গোৎসবের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কারণ এখানে দেবী কেবল অসুরবধের প্রতীক নন, তা অভয়ার প্রতীক। যা বাংলার বৈষ্ণব আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এই পূজো শুধু আচার নয়, দর্শনেরও বাহক। নবদ্বীপের বাসিন্দারা বলেন, দুর্গাপুজো মানেই এখানে অভয়া মায়ের আরাধনা।

শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নবদ্বীপ, নদীয়া : ২৭৩ বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী এক বৈষ্ণব ক্ষেত্র নদীয়ার নবদ্বীপ। বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের রাজধানী হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত এই শহর আবার দুর্গোৎসবেরও ধারক। তবে এখানকার দুর্গাপুজো আলাদা। কারণ এখানে মহিষাসুরমর্দিনীকে দেখা যায় এক অনন্য রূপে ‘অভয়া মা’। শাস্ত্রীয় পৌরাণিক কাহিনি থেকে খানিকটা ভিন্ন, বৈষ্ণব প্রভাবিত এই পূজায় দেবী দুর্গা ষোড়শী রূপে পূজিতা হন এবং সঙ্গে থাকেন বালক রূপে মহাদেব। প্রায় ২৭৩ বছরের প্রাচীন এই পুজো আজও একই ভক্তি ও আচার মেনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

ইতিহাস বলছে, ১৭৫০ সালের দিকে নবদ্বীপের নেতাজি সুভাষ রোডের দক্ষিণ প্রান্তে, যা আজ ‘অভয়া মা-তলা’ নামে খ্যাত, মাটি খুঁড়তে গিয়ে মিলেছিল এক ক্ষুদ্র ধাতব দেবীমূর্তি। দৈর্ঘ্যে মাত্র ৭ সেন্টিমিটার আর প্রস্থে ৩.৫ সেন্টিমিটার সেই মূর্তিতে দেবীর ডান হাতে বরাভয় মুদ্রা, বাঁ হাতে এক রহস্যময় ভগ্নাংশ এবং পদতলে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী। বিশেষজ্ঞদের মতে সেটি সম্ভবত গোধিকা বা গোসাপ। মূর্তি উদ্ধারের পর তৎকালীন সমাজপতিরা স্থির করেন, এই মূর্তিকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর শারদোৎসবে দেবীর পূজা হবে। তখন থেকেই শুরু হয় অভয়া মায়ের পূজো।

স্থানীয় মুখোপাধ্যায় (Mukhopadhyay) পরিবার আজও সারা বছর সেই প্রাচীন ধাতব মূর্তির পূজা করে থাকেন। তবে দুর্গোৎসবে ভক্তদের জন্য গড়া হয় মৃন্ময়ী প্রতিমা। সিংহাসনে বসানো হয় ষোড়শী রূপের অভয়া মাকে। বিশেষত্ব হল, তাঁর বাঁ হাতে ধরা থাকে এক উলঙ্গ বালকের হাত। এই বালক রূপেই মহাদেব (Shiva) পূজিতা হন। পুরাণ মতে, একবার দেবাদিদেব মহাদেব ভগবতীর ধ্যান ভঙ্গের চেষ্টা করেছিলেন। সফল হলে তিনি বালক রূপে দেবীর সামনে উপস্থিত হন। তখন দেবী একদিকে বরাভয় মুদ্রায় তাঁকে আশীর্বাদ করেন, অন্যদিকে বাঁ হাতে ধরে রাখেন যাতে আর সরে যেতে না পারেন। সেই থেকেই এই রূপে তিনি পূজিতা, ‘অভয়া মা’।

স্থানীয়দের মতে, এই রূপ আসলে দেবীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রতীক। তাই মহিষাসুরমর্দিনীর প্রচলিত চিত্রের বদলে নবদ্বীপে দুর্গাপুজো মানেই অভয়ার আশ্রয়। ভক্তদের বিশ্বাস, অভয়া মায়ের আরাধনা করলে জীবনের বিপদ-আপদ, ভয়-শঙ্কা সব দূর হয়। এই ঐতিহাসিক মন্দির বর্তমানে হেরিটেজ স্বীকৃতি পেয়েছে। সম্প্রতি প্রতিদিনের নিত্যপূজার জন্য প্রাচীন ধাতব মূর্তির আদলে এক পাথরের প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় এক প্রবীণ ভক্ত শান্তনু মুখার্জি (Shantanu Mukherjee) জানান, “আমাদের জীবনের সব সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা অভয়া মায়ের কাছে নিবেদিত। তিনি কেবল দুর্গা নন, তিনি আমাদের রক্ষাকর্ত্রী।” প্রসঙ্গত, প্রতি বছর দুর্গোৎসবের সময় নবদ্বীপ জুড়ে যেন উৎসবের আবহ তৈরি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ ভিড় জমান অভয়া মা-তলায়। স্থানীয় ব্যবসায়ী সুধাংশু দত্ত (Sudhanshu Dutta) বলেন, “অভয়া মায়ের পুজো শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক মিলনক্ষেত্রও। এখানে ভক্তরা যেমন আনন্দে মাতেন, তেমনই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথেও একাত্ম হয়ে যান।”

ধর্মতত্ত্ববিদদের মতে, এই পূজা বাংলার দুর্গোৎসবের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কারণ এখানে দেবী কেবল অসুরবধের প্রতীক নন, তা অভয়ার প্রতীক। যা বাংলার বৈষ্ণব আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এই পূজো শুধু আচার নয়, দর্শনেরও বাহক। নবদ্বীপের বাসিন্দারা বলেন, দুর্গাপুজো মানেই এখানে অভয়া মায়ের আরাধনা। একদিকে প্রাচীন ধাতব মূর্তির পুজো, অন্যদিকে ঐতিহাসিক মন্দিরে মৃন্ময়ী প্রতিমার আরাধনা, এই দুই মেলবন্ধনেই সম্পূর্ণ হয় নবদ্বীপের দুর্গোৎসব। ইতিহাস, পৌরাণিক কাহিনি, স্থানীয় বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যের সমন্বয়ে অভয়া মা হয়ে উঠেছেন নদীয়ার নবদ্বীপের আত্মা। আজও যে দর্শনার্থী নবদ্বীপে প্রবেশ করেন, তাঁদের প্রথমেই চোখে পড়ে অভয়া মা-তলা। মন্দির, ভক্ত, আলো, আরাধনার আবহে নবদ্বীপ শহর যেন নিজেই নতুন প্রাণ পায় দুর্গোৎসবের দিনে।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shovabazar Rajbari, Raja Nabakrishna Deb |ঐতিহ্যে মোড়া শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো, ইতিহাসের পাতায় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বিস্মৃত অধ্যায়

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন