সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : ভারতে বসবাস করলেও রাজনৈতিক প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার অধিকার কি রয়েছে বিদেশি নাগরিকদের? ওভারসিজ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া (OCI) কার্ডধারীদের অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে এ বার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল বম্বে হাইকোর্ট (Bombay High Court)। আমেরিকার নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও ভারতে এসে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশ নেওয়ার ঘটনায় এক অভিনেতার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার শুনানিতে আদালত জানিয়ে দিয়েছে, ওসিআই কার্ড থাকলেই ভারতীয় নাগরিকদের মতো সমস্ত সাংবিধানিক অধিকার পাওয়া যায় না। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, আন্দোলন কিংবা সমালোচনামূলক কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আছে। আদালতের বক্তব্য, ভারতে থাকার সময় ওসিআই কার্ডধারীদের দেশের আইন এবং তাঁদের জন্য নির্ধারিত শর্ত মেনে চলতে হবে। এই মামলার শুনানিতে বিচারপতিদের মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রবাসী ভারতীয়দের অধিকার নিয়ে।
আরও পড়ুন : Sonali Kulkarni Aamir Khan | কেন ‘দঙ্গল’-এর আমিরকে আসল হিরো বললেন সোনালী?
ঘটনার সূত্রপাত মুম্বইয়ে একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। মামলার আবেদনকারী অভিনেতা ইমরান খান (Imran Khan) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও তাঁর কাছে ভারতের ওসিআই কার্ড রয়েছে। সম্প্রতি দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তিনি অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। এই ঘটনার পরেই তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করে বিদেশি নাগরিকদের নথি সংক্রান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (FRRO)। ওই দফতরের তরফে তাঁকে ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার নোটিশ পাঠানো হয়। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভিনেতা। সোমবার মামলাটির শুনানিতে বিচারপতিদের বেঞ্চ আবেদনকারীর অবস্থান নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলে। প্রধান বিচারপতি মহেশ চন্দ্র ত্রিপাঠী (Mahesh Chandra Tripathi) ও বিচারপতি অদ্বৈত সেথনার (Adwait Sethna) বেঞ্চ ওসিআই কার্ডধারীদের সাংবিধানিক অবস্থান এবং তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে। শুনানির সময় আদালতের বক্তব্য ছিল, বিদেশি নাগরিক হিসেবে ভারতে থাকার অনুমতি পাওয়া আর ভারতীয় নাগরিকের সমান রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করা এক বিষয় নয়। ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতে দীর্ঘ সময় থাকতে পারেন, কাজ করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট কিছু সুযোগ-সুবিধাও পেতে পারেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তাঁরা দেশের নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত সমস্ত অধিকার ব্যবহার করতে পারবেন।
শুনানির সময় আদালতের তরফে যে কড়া মন্তব্য করা হয়েছে, তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি চর্চা শুরু হয়েছে। বিচারপতিরা আবেদনকারীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমেরিকায় গিয়ে প্রতিবাদ করুন। কিন্তু ভারতে থেকে কোনও বিষয়ে প্রতিবাদ করার বিষয়টি মেনে নেওয়া হবে না।’ আদালতের এই পর্যবেক্ষণে বিদেশি নাগরিকদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কঠোর মনোভাবের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। বিচারপতিদের বক্তব্য, কোনও ব্যক্তি বিদেশের নাগরিক হলে তাঁকে ভারতে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের অনুমতি এক করে দেখা যায় না। উল্লেখ্য, ভারতীয় সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদকে কেন্দ্র করেই মামলার শুনানিতে এই বিষয়টি উঠে আসে। সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। তবে এই অধিকারগুলি ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট। বিদেশি নাগরিকরা ভারতে অবস্থান করলেও তাঁরা ভারতীয় নাগরিকদের মতো এই সাংবিধানিক অধিকার দাবি করতে পারেন না। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতীয় নাগরিক নন। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিষয়টি ভারতীয় নাগরিকদের অধিকার দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়।
এই মামলায় নির্বাচনী তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গও উঠে আসে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিনেতা ইমরান খান সরাসরি এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন না। তিনি ভারতের নাগরিক নন এবং দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাধিকারও তাঁর নেই। তাই যে বিষয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ নাগরিক স্বার্থ জড়িত নয়, সেই বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তুলেছে। বিচারপতিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী বিষয়ে বিদেশি নাগরিকদের ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা আছে বলে উল্লেখ। শুনানির সময় আদালত একটি তুলনামূলক পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করে। কোনও ভারতীয় নাগরিক যদি অন্য কোনও দেশে গিয়ে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে একই ধরনের প্রতিবাদে অংশ নিতেন, তা হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারত। বিদেশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন ও বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই ভারতে ওসিআই কার্ড নিয়ে বসবাস করার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও এ দেশের নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন বলে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে।
শুধু মৌখিক পর্যবেক্ষণেই বিষয়টি শেষ করেনি আদালত। অভিনেতা ইমরান খানকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বলা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না, সেই মর্মে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। শুনানিতে অভিনেতা নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন বলে জানা গিয়েছে। আদালতের নির্দেশ মেনে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন। মামলার এই পর্যায়ে আবেদনকারীর ক্ষমাপ্রার্থনা এবং ভবিষ্যতের আচরণ সংক্রান্ত অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ওসিআই ব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র বোঝাও জরুরি। ওভারসিজ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া কার্ড মূলত বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগের ব্যবস্থা। এই কার্ডের মাধ্যমে তাঁরা ভারতে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুবিধা পান। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগও রয়েছে তাঁদের। বারবার ভিসার আবেদন করার প্রয়োজনীয়তা অনেক ক্ষেত্রে থাকে না। তবে ওসিআই কার্ড কোনওভাবেই দ্বৈত নাগরিকত্বের স্বীকৃতি নয়। কার্ডধারীরা ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হন না।
এই ব্যবস্থার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। লোকসভা, বিধানসভা কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকারও তাঁদের নেই। দেশের সাংবিধানিক পদে বসার ক্ষেত্রেও তাঁদের উপর বিধিনিষেধ রয়েছে। অর্থাৎ ভারতে থাকার এবং কাজ করার ক্ষেত্রে একাধিক সুবিধা থাকলেও রাজনৈতিক অধিকার ভারতীয় নাগরিকদের মতো নয়। আদালতের বর্তমান পর্যবেক্ষণ সেই পার্থক্যকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রবাসী ভারতীয়দের একটি বড় অংশের কাছে ওসিআই কার্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ করার পরেও ভারতের সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত যোগাযোগ বজায় রাখতে এই কার্ড ব্যবহার করেন অনেকে। তাঁদের অনেকেই বছরের একটা বড় সময় ভারতে কাটান। কেউ ব্যবসার কাজে, কেউ পারিবারিক প্রয়োজনে, আবার কেউ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেশে আসেন। ফলে ওসিআই কার্ডধারীদের অধিকার এবং তাঁদের উপর আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে বম্বে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিষয়ে মতপ্রকাশ এবং প্রতিবাদে অংশগ্রহণের সীমা কোথায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওসিআই কার্ডধারীদের ভারতে বসবাসের অনুমতি থাকলেও নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অধিকার তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে এই মামলার পর্যবেক্ষণ এবং চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানিতে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ইমরান খানের ভারত ছাড়ার নোটিশের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়িয়েছে আদালত। ফলে আপাতত ওই নোটিশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ বহাল থাকছে। মামলার পরবর্তী শুনানি ডিসেম্বর মাসে হওয়ার কথা। সেই শুনানিতে আবেদনকারীর হলফনামা, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং বিদেশি নাগরিক হিসেবে তাঁর আইনি অবস্থান নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। বম্বে হাইকোর্টের এই মামলাকে কেন্দ্র করে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতে থেকে কোন ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন ও কোন ক্ষেত্রে তাঁদের আইনি বাধার মুখে পড়তে হবে। বিদেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ থাকলেও সেই সুবিধার সঙ্গে নাগরিকত্বের অধিকারকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না বলেই আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে উঠে এসেছে। ডিসেম্বরের শুনানিতে মামলাটি কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Aamir Khan emotional moment | Singapore International Film Festival : ৩০ বছরের কাজের নেশায় পরিবারকে সময় দিতে পারেননি! সিঙ্গাপুরে চোখের জল আমির খানের, জীবনের বড় আক্ষেপ প্রকাশ্যে



