সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : উৎসবের মরসুমে রাজ্যগুলির আর্থিক স্বস্তি দিতে কেন্দ্রীয় করের অতিরিক্ত কিস্তি ছাড়ল নরেন্দ্র মোদী সরকার (Narendra Modi Government)। গত ৩১ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন রাজ্যের জন্য মোট ১ লক্ষ ৯ হাজার ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। নিয়মিত মাসিক কর বণ্টনের বাইরে এই অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হয়েছে রাজ্যগুলির হাতে। এই বরাদ্দে পশ্চিমবঙ্গের ভাগে এসেছে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। ফলে রাজ্যের উন্নয়নমূলক কাজ, পরিকাঠামো নির্মাণ ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের খরচ সামলানোর ক্ষেত্রে নতুন আর্থিক সংস্থান তৈরি হল। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে উত্তরপ্রদেশ। অন্যদিকে বিহার, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র-সহ একাধিক রাজ্যের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের (Ministry of Finance) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি আর্থিক বছরে এটি রাজ্যগুলির জন্য দ্বিতীয় অতিরিক্ত কর বণ্টনের কিস্তি। সাধারণ নিয়মে কেন্দ্রীয় করের নির্দিষ্ট অংশ রাজ্যগুলির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে নিয়মিত মাসিক অর্থের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিস্তি ছাড়ার ফলে রাজ্যগুলির হাতে একসঙ্গে বেশি অর্থ পৌঁছয়। উৎসবের সময়ে সরকারি ব্যয়ের চাপ তুলনামূলকভাবে বাড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে রাজ্যগুলির আর্থিক পরিকল্পনা ও উন্নয়নমূলক কাজ যাতে ব্যাহত না হয়, তা মাথায় রেখেই এই অর্থ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এই বরাদ্দের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। রাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সরকারি পরিকাঠামো উন্নয়ন, রাস্তা ও অন্যান্য নির্মাণকাজ, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে রাজ্য সরকারকে নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতন, পেনশন এবং প্রশাসনিক খরচের মতো দায়ও রয়েছে। কেন্দ্রীয় করের অতিরিক্ত ভাগ হাতে আসায় রাজ্যের কোষাগারে কিছুটা বাড়তি অর্থের জোগান তৈরি হবে। তবে এই অর্থ কোন কোন খাতে কতটা ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করবে রাজ্য সরকারের নিজস্ব আর্থিক পরিকল্পনার উপর। রাজ্যভিত্তিক বরাদ্দের নিরিখে প্রথম স্থানে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh)। এই রাজ্য পেয়েছে ১৯ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে বিহার (Bihar), তাদের বরাদ্দ ১০ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) ভাগে এসেছে ৮ হাজার ১০ কোটি টাকা। পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে তার পরেই। মহারাষ্ট্র (Maharashtra) পেয়েছে ৭ হাজার ২২ কোটি টাকা এবং রাজস্থানের (Rajasthan) জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৬ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। দেশের বড় রাজ্যগুলির মধ্যে এই অর্থ বণ্টনে উল্লেখযোগ্য অঙ্ক বরাদ্দ হয়েছে একাধিক রাজ্যের জন্য।
অন্যান্য রাজ্যের বরাদ্দের তালিকাতেও আছে বিভিন্ন অঙ্ক। ওডিশা (Odisha) পেয়েছে ৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। অন্ধ্রপ্রদেশের (Andhra Pradesh) ভাগে এসেছে ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। কর্ণাটক (Karnataka) পেয়েছে ৪ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা ও তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৪ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। গুজরাটের (Gujarat) ভাগে এসেছে ৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। পূর্ব ভারতের আর এক রাজ্য ঝাড়খণ্ড (Jharkhand) পেয়েছে ৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। ছত্তিশগড়ের (Chhattisgarh) জন্য বরাদ্দ ৩ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। অসম (Assam) পেয়েছে ৩ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতের অন্যান্য রাজ্যের জন্যও অর্থ ছাড়া হয়েছে। কেরল (Kerala) পেয়েছে ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। তেলেঙ্গানার (Telangana) ভাগে এসেছে ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা ও পাঞ্জাব (Punjab) পেয়েছে ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। হরিয়ানার (Haryana) জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। অরুণাচল প্রদেশ (Arunachal Pradesh) পেয়েছে ১ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। উত্তরাখণ্ডের (Uttarakhand) ভাগে এসেছে ১ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। হিমাচল প্রদেশের (Himachal Pradesh) জন্য বরাদ্দ ৯৯৬ কোটি টাকা।
উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির জন্যও এই অর্থ বণ্টন করা হয়েছে। ত্রিপুরা (Tripura) পেয়েছে ৬৯৯ কোটি টাকা। মেঘালয়ের (Meghalaya) ভাগে এসেছে ৬৮৮ কোটি টাকা ও মণিপুর (Manipur) পেয়েছে ৬৮২ কোটি টাকা। মিজোরামের (Mizoram) জন্য বরাদ্দ ৬১৫ কোটি টাকা। নাগাল্যান্ড (Nagaland) পেয়েছে ৫২৪ কোটি টাকা। দেশের ছোট রাজ্যগুলির মধ্যে গোয়ার (Goa) ভাগে এসেছে ৩৯৮ কোটি টাকা ও সিক্কিম (Sikkim) পেয়েছে ৩৬৫ কোটি টাকা। রাজ্যগুলির জনসংখ্যা, আয়তন, আর্থিক অবস্থা এবং কেন্দ্রীয় কর বণ্টনের নির্ধারিত সূত্র অনুযায়ী এই অর্থ ভাগ করা হয়। উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় করের ৪১ শতাংশ রাজ্যগুলির মধ্যে বণ্টনের যে ব্যবস্থা রয়েছে, এই অর্থ ছাড় সেই কাঠামোরই অংশ। কেন্দ্রীয় করের ভাগ রাজ্যগুলির হাতে পৌঁছনোর ফলে তাদের নিজস্ব বাজেট পরিচালনার সুযোগ বাড়ে। কারণ রাজ্য সরকারগুলিকে নিজেদের দায়িত্ব পালনের জন্য একাধিক ক্ষেত্রে অর্থের প্রয়োজন হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি, পরিবহণ এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় চালিয়ে যেতে হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও নতুন পরিকাঠামো তৈরির জন্যও অর্থের প্রয়োজন হয়। কেন্দ্রীয় করের ভাগ থেকে পাওয়া অর্থ সেই ব্যয়ের জোগান দিতে সাহায্য করে।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman) জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তিশালী অবস্থান ও কর আদায়ের উন্নতির কারণে রাজ্যগুলিকে এই অতিরিক্ত কিস্তি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে লেনদেন ও উৎপাদন বাড়লে কেন্দ্রীয় সরকারের কর সংগ্রহেও তার প্রভাব পড়ে। সেই রাজস্বের নির্দিষ্ট অংশ নিয়ম মেনে রাজ্যগুলির মধ্যে বণ্টন করা হয়। অতিরিক্ত কিস্তি ছাড়ার ফলে রাজ্য সরকারগুলি নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে আরও অর্থ হাতে পায়। এতে চলতি আর্থিক বছরের ব্যয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুবিধা হতে পারে। প্রসঙ্গত, উৎসবের মরসুমে রাজ্যগুলির আর্থিক প্রয়োজনও বেড়ে যায়। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কাজ, পরিষেবা পরিচালনা ও স্থানীয় স্তরে উন্নয়নমূলক উদ্যোগের জন্য এই সময়ে অর্থের জোগান গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কর বণ্টনের অর্থ রাজ্যগুলিকে সেই চাপ সামলাতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে যেসব রাজ্যে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান, সেখানে বরাদ্দের অর্থ নতুন কাজ শুরু করা অথবা চলতি প্রকল্পের গতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। তবে অর্থের ব্যবহার ও অগ্রাধিকারের বিষয়টি রাজ্য সরকারগুলির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকার এই বরাদ্দ রাজ্যের আর্থিক পরিকল্পনায় বাড়তি জায়গা তৈরি করবে। রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় করের ভাগও বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কেন্দ্র থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়। কিন্তু রাজ্যের ঋণের বোঝা, রাজস্ব ঘাটতি, নিয়মিত খরচ এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের আর্থিক প্রয়োজন, সব দিক বিবেচনা করেই এই অর্থের ব্যবহার ঠিক করতে হবে। বরাদ্দের অর্থ হাতে আসা আর সেই অর্থের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। কার্যকর পরিকল্পনা ও ব্যয়ের উপরই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ভর করবে। কেন্দ্র ও রাজ্যের আর্থিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কর বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যগুলিকে নিজেদের প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু কর সংগ্রহের বড় অংশ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়। সেই কারণে কেন্দ্রীয় করের নির্দিষ্ট অংশ রাজ্যগুলির মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিয়মিত বরাদ্দের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিস্তি রাজ্যগুলির হাতে দ্রুত অর্থ পৌঁছে দিতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে আর্থিক সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
এখন দেখার যে, পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্য এই অতিরিক্ত অর্থ কোন কোন খাতে ব্যবহার করে। বাংলার হাতে আসা ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা রাজ্যের চলতি ব্যয় ও উন্নয়নমূলক পরিকল্পনায় কতটা সহায়তা করে, তা আগামী দিনে বোঝা যাবে। কেন্দ্রের তরফে একসঙ্গে ১ লক্ষ ৯ হাজার ১৯ কোটি টাকা ছাড়ার ফলে রাজ্যগুলির কোষাগারে বাড়তি অর্থ পৌঁছল। উৎসবের মরসুমে এই অর্থ রাজ্যগুলির আর্থিক চাপ সামলানোর পাশাপাশি উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nirmala Sitharaman on 10 percent growth | India economic growth : ৭.৮ শতাংশ থেকে ১০-এর ঘরে যেতে পারে! ভারতের অর্থনীতি নিয়ে বড় আশার কথা শোনালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন



