সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ খড়গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলতে চলেছে আইআইটি খড়্গপুর (IIT Kharagpur)। শুধু কম্পিউটারের পর্দায় তথ্য বিশ্লেষণ নয়, বাস্তব জগতের বস্তু, যন্ত্র ও পরিবেশের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ আরও গভীর করার লক্ষ্যে দেশে প্রথম ফিজিক্যাল এআই স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ৩৫ কোটি টাকার তহবিল গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয়েছে ‘বেঞ্জামিন গুপ্ত স্কুল অফ ফিজিক্যাল এআই’ (Benjamin Gupta School of Physical AI)। আইআইটি খড়্গপুরের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সমাজসেবী বিনোদ গুপ্ত (Vinod Gupta), তাঁর পরিবার ও আইআইটিকেজিপি ফাউন্ডেশন ইউএসএ (IITKGP Foundation USA)-এর সহযোগিতায় এই উদ্যোগ এগিয়ে চলেছে। গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রকৌশল শাখার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোই হবে এই নতুন স্কুলের অন্যতম লক্ষ্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বর্তমানে শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প, পরিবহণ, যোগাযোগ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, ভাষা বোঝা, ছবি শনাক্ত করা কিংবা জটিল সমস্যার সমাধানে এআই ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কিন্তু প্রযুক্তির পরবর্তী পর্যায়ে শুধু তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই যথেষ্ট নয়। যন্ত্র কীভাবে বাস্তব পরিবেশে কাজ করবে, কোনও বস্তুর গঠন ও গতিবিধি কীভাবে বুঝবে ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে কার্যকর পদক্ষেপ করবে, সেই প্রশ্নগুলিও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আইআইটি খড়্গপুরের নতুন স্কুল সেই ক্ষেত্রেই গবেষণা ও শিক্ষার পরিসর বাড়াতে চায়। প্রস্তাবিত স্কুলটি গড়ে তুলতে মোট ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের মধ্যে বিনোদ গুপ্তের পরিবার ১২.৫ কোটি টাকা অনুদান দেবে। পাশাপাশি, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী ১০ কোটি টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। বাকি অর্থের জোগান দেবে আইআইটি খড়্গপুর। অর্থাৎ, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিকাঠামো তৈরিতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এই উদ্যোগ তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বিনোদ গুপ্তের প্রয়াত পুত্র বেঞ্জামিন গুপ্তের স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্কুলটির নামকরণ করা হচ্ছে বলে খবর। ফলে এই প্রকল্পের সঙ্গে প্রযুক্তিগত গবেষণার পাশাপাশি একটি পারিবারিক স্মৃতিও জড়িয়ে থাকছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য থাকবে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বিকাশ, গবেষকদের প্রশিক্ষণ ও বাস্তব সমস্যার সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর প্রয়োগ। দেশের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আইআইটি খড়্গপুরের কাছে এই উদ্যোগ গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ এনে দিতে পারে। উল্লেখ্য, ‘ফিজিক্যাল এআই’ বলতে এমন এক প্রযুক্তিক্ষেত্রকে বোঝানো হয়, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাস্তব জগতের বস্তু, যন্ত্র ও পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে। প্রচলিত এআই ব্যবস্থার অনেকগুলি মূলত তথ্য, ভাষা, ছবি বা ডিজিটাল উপাদান নিয়ে কাজ করে। তার বিপরীতে ফিজিক্যাল এআইয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্রের চলাচল, চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানানো ও বাস্তব কাজ সম্পন্ন করার মতো বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রোবট, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, বুদ্ধিমান উৎপাদনব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির উন্নয়নে এই ক্ষেত্রের প্রয়োগের সুযোগ আছে খবর।
ধরা যাক, কোনও শিল্পকারখানায় একটি রোবটকে নির্দিষ্ট কাজ করতে হবে। শুধু নির্দেশ বুঝতে পারলেই চলবে না, যন্ত্রটিকে তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে, বস্তুর অবস্থান শনাক্ত করতে হবে ও কাজের পরিস্থিতি বদলে গেলে নিজের কার্যপদ্ধতিতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। একইভাবে, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নিরাপদ ব্যবহার, নির্ভুল নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তব পরিস্থিতিতে তার কার্যকারিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও পদার্থবিদ্যা, প্রকৌশল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্মিলিত প্রয়োগ প্রয়োজন। ফিজিক্যাল এআইয়ের গবেষণায় এই ধরনের সমস্যাগুলির সমাধান খোঁজার সুযোগ থাকবে বলে জানা যায়। আইআইটি খড়্গপুরের পরিচালক অধ্যাপক সুমন চক্রবর্তী (Suman Chakraborty) এই উদ্যোগের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতিমধ্যেই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। তবে আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি নির্ভর করবে বাস্তব জগতকে বোঝা, তার গঠন ও কার্যপ্রণালি বিশ্লেষণ করা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে তার সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ স্থাপনের উপর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘বেঞ্জামিন গুপ্ত স্কুল অফ ফিজিক্যাল এআই’ এই পরিবর্তনের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
অধ্যাপক চক্রবর্তীর বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও একটি বিষয়। ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারাই যথেষ্ট হবে না। সেই প্রযুক্তিকে নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীর জ্ঞান ও প্রকৌশলগত দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এর ফলে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা নির্ভরযোগ্য, সহজে বোঝা যায় এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কোনও বুদ্ধিমান যন্ত্র কীভাবে কাজ করছে, তার সিদ্ধান্তের পিছনে কোন ধরনের ভৌত নীতি রয়েছে ও বাস্তব পরিস্থিতিতে তার আচরণ কেন বদলাচ্ছে, তা বোঝার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে এই গবেষণার ক্ষেত্রে। এই দৃষ্টিভঙ্গি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার বিজ্ঞান, অ্যালগরিদম ও তথ্য বিশ্লেষণের মতো বিষয়গুলিতে বেশি মনোযোগ দেন। কিন্তু বাস্তব জগতে প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে গেলে যন্ত্রবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, ইলেকট্রনিক্স, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রকৌশল শাখার জ্ঞানও প্রয়োজন হয়। ফিজিক্যাল এআই স্কুলে এই বিষয়গুলির মধ্যে সমন্বয় তৈরির সুযোগ থাকলে গবেষণার পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে গবেষণার সম্ভাব্য ক্ষেত্রের মধ্যে থাকতে পারে বুদ্ধিমান রোবটের নকশা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থা, যন্ত্রের পরিবেশ শনাক্ত করার ক্ষমতা, বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিরাপদে কাজ করার প্রযুক্তি। তবে নির্দিষ্ট কোন কোন বিষয়ে পাঠদান বা গবেষণা শুরু হবে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রকেই সম্ভাব্য প্রয়োগের পরিসর হিসেবেই দেখা প্রয়োজন। প্রসঙ্গত, ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তি তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। শিল্পক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও জটিল কাজ সম্পন্ন করার জন্য বুদ্ধিমান যন্ত্রের চাহিদা বাড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে বাস্তব জগতের সঙ্গে যুক্ত এআই নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিকাঠামো তৈরি হলে শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের সামনে নতুন কাজের ক্ষেত্র খুলে যেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভবিষ্যতে সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
আইআইটি খড়্গপুরের এই উদ্যোগের আর একটি তাৎপর্য রয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিকে শুধু প্রচলিত পাঠক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নতুন গবেষণাক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার কাঠামোও উন্নত করতে হবে। ফিজিক্যাল এআইয়ের মতো ক্ষেত্র সেই পরিবর্তনেরই একটি দিক। এখানে কম্পিউটারভিত্তিক বুদ্ধিমত্তাকে বাস্তব যন্ত্রের কার্যপ্রণালির সঙ্গে যুক্ত করার জন্য বিভিন্ন শাখার জ্ঞান প্রয়োজন হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং তার ব্যবহারিক প্রয়োগের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ৩৫ কোটি টাকার তহবিলের ঘোষণা এবং নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাগার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, উপযুক্ত পাঠক্রম, শিক্ষক ও গবেষক নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মতো বিষয়গুলির উপর নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা। গবেষণার ফল বাস্তব শিল্পক্ষেত্রে কতটা প্রয়োগ করা যাচ্ছে ও শিক্ষার্থীরা কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করছেন, তা-ও ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের সাফল্য মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হবে।
দেশের প্রযুক্তি শিক্ষার মানচিত্রে আইআইটি খড়্গপুরের নতুন ফিজিক্যাল এআই স্কুল তাই শুধু একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাস্তব জগতের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার প্রচেষ্টা। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগ এবং আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার পরিকল্পনা একসঙ্গে এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করছে। আগামী দিনে এই স্কুলের গবেষণা ও শিক্ষাক্রম কীভাবে গড়ে ওঠে, তার উপর নির্ভর করবে ভারতের ফিজিক্যাল এআই গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Narendra Modi Donald Trump | India US relations : নরেন্দ্র মোদী-ট্রাম্পের ফোনালাপে বাণিজ্য-প্রতিরক্ষা থেকে প্রযুক্তি, আঞ্চলিক শান্তি নিয়েও আলোচনা


