সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★দেরাদুন, ৩০ অক্টোবর ২০২৬: উত্তরাখণ্ডের (Uttarakhand) পাহাড়ি আকাশে ফের মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা। জোশীমঠের (Joshimath) কাছে যাত্রিবাহী একটি হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ে পাইলট-সহ ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। বদরীনাথ (Badrinath) থেকে পাঁচ যাত্রীকে নিয়ে ফেরার পথে শুক্রবার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রান্স ভারত অ্যাভিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের (Trans Bharat Aviation Private Limited) ওই কপ্টার। প্রথমে হেলিকপ্টারটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেটি নিখোঁজ বলে মনে করা হয়েছিল। পরে দুর্ঘটনার খবর নিশ্চিত করেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি (Pushkar Singh Dhami)। এই ঘটনা ফের পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টার পরিষেবার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। গত এক দশকের পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে উত্তরাখণ্ডে মোট ১৩টি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। তাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৭ জন। দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এই পাহাড়ি রাজ্যে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে।
উত্তরাখণ্ডের অর্থনীতি ও পর্যটনের সঙ্গে ধর্মীয় পর্যটনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রতি বছর কেদারনাথ (Kedarnath), বদরীনাথ, গঙ্গোত্রী (Gangotri) ও যমুনোত্রী (Yamunotri) এই চার ধাম দর্শনের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী সেখানে যান। দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করার পরিবর্তে অনেকেই সময় বাঁচাতে বেসরকারি হেলিকপ্টার পরিষেবা ব্যবহার করেন। বিশেষ করে প্রবীণ তীর্থযাত্রী এবং শারীরিক ভাবে দীর্ঘ পথ চলতে অক্ষম মানুষের কাছে এই পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আকাশ থেকে দেখার জন্যও পর্যটকদের একাংশ হেলিকপ্টার ভাড়া করেন। কিন্তু পরপর দুর্ঘটনার ঘটনা এই পরিষেবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। শুক্রবারের দুর্ঘটনাটি ঘটে বদরীনাথ থেকে জোশীমঠে ফেরার পথে। হেলিকপ্টারটিতে পাইলট ছাড়াও পাঁচ জন যাত্রী ছিলেন। প্রাথমিক ভাবে জানা যায়, জোশীমঠ উপত্যকার উপর দিয়ে যাওয়ার সময় কপ্টারটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, ট্র্যাকিং সিস্টেমেও হেলিকপ্টারটির অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে সেটি কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে দুর্ঘটনার খবর সামনে আসে।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, জোশীমঠ এলাকার হাথি পর্বতের পিছনে ছায়ি গ্রামের কাছে হেলিকপ্টারটির সঙ্গে শেষ বার যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছিল। দুপুর ২টো ২০ মিনিট নাগাদ মারওয়ারি সেতুর কাছে জেপি পাওয়ার হাউসের অদূরে পাহাড়ের গায়ে সেটি ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনায় পাইলট-সহ ছয় জনেরই মৃত্যু হয়েছে। মৃত পাঁচ যাত্রীই বেঙ্গালুরুর (Bengaluru) বাসিন্দা বলে জানা গিয়েছে। দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে প্রতিকূল আবহাওয়া, অবিরাম বৃষ্টি ও কম দৃশ্যমানতার বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত তদন্তের আগে দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য যে, এই দুর্ঘটনার পর গত দশ বছরের পরিসংখ্যান সামনে আসায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উত্তরাখণ্ডে ১৩টি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে বলে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। এই দুর্ঘটনাগুলিতে মোট ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরে দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে বেশি। শুধু উত্তরাখণ্ড নয়, মহারাষ্ট্র (Maharashtra) ও ছত্তীসগঢ়েও (Chhattisgarh) গত কয়েক বছরে একাধিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গত এক দশকে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মোট ৩৬ জনের মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তার মধ্যে ২৭ জনই উত্তরাখণ্ডের।
গত বছর রাজ্যসভায় এই বিষয়ে তথ্য দিয়েছিলেন অসামরিক বিমান পরিবহণ প্রতিমন্ত্রী মুরলীধর মোহল (Murlidhar Mohol)। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ১২টি বড় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তার মধ্যে সাতটি দুর্ঘটনাই উত্তরাখণ্ডে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পাহাড়ি রাজ্যটিতে হেলিকপ্টার চলাচল নিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, এর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে কেদারনাথের কাছে একটি যাত্রিবাহী হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। সেই ঘটনায় পাইলট-সহ সাত জনের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গত বছর উত্তরকাশীতে (Uttarkashi) মে ও জুন মাসে পরপর দুটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটে। ওই দুটি ঘটনায় মোট ১৩ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। আরও উদ্বেগের বিষয়, মাত্র ৪৫ দিনের ব্যবধানে ওই যাত্রাপথে মোট পাঁচটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার ঘটনা সামনে আসে। তার মধ্যে দুটি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে। ফলে চারধাম যাত্রার সময় হেলিকপ্টার পরিষেবা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
উত্তরাখণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থান হেলিকপ্টার চলাচলের ক্ষেত্রে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। রাজ্যের অধিকাংশ তীর্থস্থানই পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। অনেক জায়গায় পাহাড়ের উচ্চতা, সরু উপত্যকা, হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং মেঘের ঘনত্ব উড়ানের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বর্ষার সময়ে বৃষ্টি এবং কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাহাড়ি এলাকায় আবহাওয়া দ্রুত বদলে যাওয়ায় উড়ানের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি কতক্ষণ বজায় থাকবে, তা অনুমান করাও কঠিন হতে পারে। গত কয়েক বছরের দুর্ঘটনাগুলির কারণ বিশ্লেষণে খারাপ আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতার অভাবের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। তবে সব দুর্ঘটনার নেপথ্যে একই কারণ রয়েছে, এমনটা নয়। কিছু ঘটনায় যান্ত্রিক গোলযোগের সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। ফলে শুধু আবহাওয়ার উপর লক্ষ্য রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না। হেলিকপ্টারের রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত যান্ত্রিক পরীক্ষা, পাইলটদের প্রশিক্ষণ এবং উড়ানের আগে আবহাওয়ার পরিস্থিতি যাচাইয়ের মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিমান চলাচল সংক্রান্ত মহলের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টার পরিষেবার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে উড়ানের জন্য পাইলটদের আলাদা প্রশিক্ষণ, প্রতিকূল আবহাওয়ায় উড়ান বাতিলের ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি কপ্টারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়মিত যাচাই করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চারধাম যাত্রার সময় হেলিকপ্টারের সংখ্যা ও উড়ানের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতি বছর চারধাম যাত্রায় পুণ্যার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টার পরিষেবার চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিষেবা যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করলেও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ঝুঁকির বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে প্রতিকূল আবহাওয়ার সময়ে উড়ান চালু রাখা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে আরও সতর্ক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, বিমান পরিবহণ সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জোশীমঠের কাছে শুক্রবারের দুর্ঘটনা তাই শুধু একটি হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ার ঘটনা নয়। গত এক দশকে উত্তরাখণ্ডে একের পর এক দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির পরিসংখ্যান পাহাড়ি আকাশপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। চারধাম যাত্রার জনপ্রিয়তা এবং পর্যটকদের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিষেবা বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রী ও পাইলটদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আগামী দিনে দুর্ঘটনা রোধে কী ধরনের পদক্ষেপ করা হয়, এখন সেদিকেই দৃষ্টি থাকবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Assam Child Marriage News, Himanta Biswa Sarma Child Marriage Action | অসমে বাল্যবিবাহ রুখতে কড়া অভিযান, রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে নতুন গুরুত্ব পেল হিমন্ত সরকারের উদ্যোগ



