সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : স্যাটেলাইটের ছবি দেখে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা এখন অনেক সহজ। কিন্তু সেই প্রযুক্তির সাহায্যেই যদি চোখে পড়ে প্রায় ৮৫০ ফুট ব্যাসের এক অদ্ভুত বৃত্তাকার গঠন, তা হলে কৌতূহল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এক নির্জন এলাকায় এমনই একটি কাঠামো নজরে আসে ভূতাত্ত্বিক আর্থার হিকম্যানের। গুগল আর্থ (Google Earth) -এর ছবি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তিনি মাটির ওপর এই অস্বাভাবিক বৃত্তাকার চিহ্ন দেখতে পান। প্রথম দর্শনে সেটি কী ভাবে তৈরি হয়েছে, তা বোঝা সহজ ছিল না। মানুষের তৈরি কোনও কাঠামো, নাকি প্রাকৃতিক কোনও ঘটনার ফল, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় অনুসন্ধান। পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্ত, ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ এবং খননকার্যের তথ্য থেকে উঠে আসে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। গবেষকদের মতে, ওই বৃত্তাকার গঠন আসলে উল্কাপাতের ফলে তৈরি একটি গহ্বর। প্রায় ২৬০ মিটার বা ৮৫০ ফুট ব্যাসের এই কাঠামোটি পরবর্তী সময়ে ‘হিকম্যান ক্রেটার’ (Hickman Crater) নামে পরিচিতি পায়। পৃথিবীর বুকে মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতের চিহ্ন কী ভাবে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে, এই আবিষ্কার তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
প্রথমে দূর থেকে দেখা বৃত্তটির প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, পরে বিজ্ঞানীরা সরেজমিনে পরীক্ষা করে সেটির গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন। অস্ট্রেলিয়ার ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় এই স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এর আকার এবং ভূপ্রকৃতি উল্কাপাতের ফলে সৃষ্ট গহ্বরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে গবেষণায় উঠে আসে। ‘অস্ট্রেলিয়ান জার্নাল অফ আর্থ সায়েন্সেস’ (Australian Journal of Earth Sciences)-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে হিকম্যান ক্রেটারের ব্যাস প্রায় ২৬০ মিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘অস্ট্রেলিয়ান জিওগ্রাফিক’ (Australian Geographic) -এর প্রতিবেদনেও এই কাঠামোর আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় শনাক্ত হওয়া তুলনামূলক নবীন উল্কাপাতজনিত গহ্বরগুলির মধ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, গুগল আর্থের ছবিতে বৃত্তাকার চিহ্নটি নজরে এলেও শুধু ছবি দেখেই তার উৎপত্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ, শিলার বৈশিষ্ট্য ও পরবর্তী অনুসন্ধানের তথ্য মিলিয়েই উল্কাপাতের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে। সূত্রের খবর, গবেষণায় উঠে এসেছে, হিকম্যান ক্রেটার তৈরি হয়ে থাকতে পারে আনুমানিক ১০ মিটার চওড়া একটি উল্কাপিণ্ডের আঘাতে। মহাকাশ থেকে আসা কোনও বস্তু অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়লে তার শক্তিশালী অভিঘাতে মাটি ও শিলাস্তরে গহ্বর তৈরি হতে পারে। আঘাতের তীব্রতা, বস্তুটির গতি, গঠন এবং ভূমির প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে সেই গহ্বরের আকার ও গভীরতা। হিকম্যান ক্রেটার নিয়েও গবেষকদের ধারণা, উল্কাপিণ্ডের আঘাতে ভূপৃষ্ঠে বড়সড় পরিবর্তন ঘটেছিল। সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রে গহ্বরটির গভীরতা সম্পর্কে যে অনুমান দেওয়া হয়েছে, তা প্রায় ৮০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। যদিও সময়ের সঙ্গে বৃষ্টি, ক্ষয়, পলি জমা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় এই ধরনের গহ্বরের আসল গঠন বদলে যেতে পারে। ফলে বর্তমানে যে কাঠামো দেখা যায়, তা আঘাতের সময়কার চেহারার সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়।
এই গহ্বরের বয়স নির্ধারণ করাও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন, হিকম্যান ক্রেটারটি আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ১ লক্ষ বছরের মধ্যে কোনও এক সময়ে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এই সময়কালকে ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের ‘লেট প্লাইস্টোসিন’ (Late Pleistocene) পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্লাইস্টোসিন যুগে পৃথিবীর জলবায়ুতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল। বরফযুগের বিভিন্ন পর্যায়, তাপমাত্রার ওঠানামা আর পরিবেশের পরিবর্তন এই সময়ের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। হিকম্যান ক্রেটারের বয়স সম্পর্কে ধারণা পেতে গবেষকেরা গহ্বরের দক্ষিণ প্রান্তের কাছাকাছি থাকা একটি ছোট জলধারার ওপর আঘাতের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করেছেন। ভূমির স্বাভাবিক গঠন কী ভাবে বদলেছে এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে, তা বিশ্লেষণ করে গহ্বরটির বয়সের সম্ভাব্য সীমা নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ১০ হাজার থেকে ১ লক্ষ বছরের এই সময়সীমা একটি অনুমান, নির্দিষ্ট কোনও বছরের হিসাব নয়।
দূর থেকে দেখা বৃত্তাকার কাঠামোটির প্রকৃতি যাচাই করতে অস্ট্রেলিয়ার সরকারী ভূতাত্ত্বিক সংস্থাও অনুসন্ধান চালায়। অস্ট্রেলিয়ার ‘ডিপার্টমেন্ট অফ মাইনস, ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেশন অ্যান্ড সেফটি’ (Department of Mines, Industry Regulation and Safety বা DMIRS)-এর ২০১৭ সালের একটি বিজ্ঞপ্তিতে হিকম্যান ক্রেটার নিয়ে গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। ওই তথ্য অনুযায়ী, ‘জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া’ (Geological Survey of Western Australia) ২০১২ সালে ‘অ্যাটলাস আয়রন’ (Atlas Iron) -এর সহযোগিতায় এখানে খননকার্য চালায়। মূল উদ্দেশ্য ছিল, গঠনটি সত্যিই উল্কাপাতের ফলে তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করার মতো ভূতাত্ত্বিক উপাদান সংগ্রহ করা। কারণ, কোনও জায়গায় বৃত্তাকার গর্ত দেখা গেলেই সেটিকে উল্কাপাতের ফল বলা যায় না। আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ, ক্ষয়প্রক্রিয়া কিংবা অন্য ভূতাত্ত্বিক ঘটনাতেও গোলাকার বা প্রায় গোলাকার গঠন তৈরি হতে পারে। তাই শিলার নমুনা সংগ্রহ এবং তার বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা ছিল এই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খননকার্যের ফলাফল নিয়ে পি. ডব্লিউ. হেইনস (P. W. Haines) ‘কোলাবোরেটিভ সায়েন্টিফিক ড্রিলিং অ্যাট হিকম্যান ক্রেটার’ (Collaborative Scientific Drilling at Hickman Crater) শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র লেখেন। সেখানে খনন করে পাওয়া নমুনা এবং ভূগর্ভস্থ স্তরের বিবরণ তুলে ধরা হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উল্লম্বভাবে খনন করা বোরহোলটি প্রায় ৬৪.৭ মিটার গভীরতায় পৌঁছেছিল। খনন করে পাওয়া নমুনায় দেখা যায়, ভূপৃষ্ঠের নিচে বিভিন্ন স্তরে পলি এবং আদি শিলার উপস্থিতি রয়েছে। ওপরের প্রায় ৪৮.৪ মিটার অংশে এমন পলি পাওয়া যায়, যা গহ্বরটি তৈরি হওয়ার পরবর্তী সময়ে সেখানে জমা হয়েছিল বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ, উল্কাপাতের ফলে তৈরি গহ্বরটি পরে ধীরে ধীরে পলি ও অন্যান্য উপাদানে ভরাট হতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে বাতাস, বৃষ্টির জল ও আশপাশের ভূমি থেকে আসা উপাদান জমে গহ্বরের ভেতরের চেহারা বদলে দিতে পারে। এ ধরনের পলির স্তর বিশ্লেষণ করে কোনও ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অতীত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
খননকার্যে আরও গভীরে গিয়ে ৫৫.১ থেকে ৬৪.৭ মিটার অংশে অত্যন্ত ফাটলযুক্ত রাইওলাইট (Rhyolite) শিলার সন্ধান পাওয়া যায়। রাইওলাইট এক ধরনের আগ্নেয় শিলা, যা গলিত শীতল পদার্থ থেকে তৈরি হয়। এই শিলা আদি শিলাস্তরের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শিলার ফাটল, স্তরের বিন্যাস এবং পলির অবস্থান পরীক্ষা করে গবেষকেরা গহ্বরটির গঠন সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ পান। তবে একটি খননকার্যের ফলাফল দিয়েই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কোনও গহ্বরের উৎপত্তি, বয়স এবং আঘাতের প্রকৃতি নির্ধারণ করতে একাধিক ধরনের প্রমাণ একসঙ্গে বিচার করতে হয়। হিকম্যান ক্রেটারের ক্ষেত্রেও স্যাটেলাইট চিত্র, ভূপৃষ্ঠের গঠন, খনন থেকে পাওয়া নমুনা এবং প্রকাশিত গবেষণার তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। হিকম্যান ক্রেটারের আবিষ্কার আরও একবার দেখিয়েছে, পৃথিবীর বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন ভূতাত্ত্বিক চিহ্ন লুকিয়ে থাকতে পারে, যা সাধারণ চোখে সহজে ধরা পড়ে না। গুগল আর্থের মতো ডিজিটাল মানচিত্র পরিষেবা গবেষকদের কাছে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তবে স্যাটেলাইট চিত্র কোনও আবিষ্কারের সূত্র দিলেও তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করতে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, নমুনা পরীক্ষা এবং গবেষণার প্রয়োজন হয়। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এই ৮৫০ ফুট ব্যাসের গহ্বর সেই প্রক্রিয়ারই একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। মহাকাশ থেকে আসা একটি ছোট বস্তুও হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর ভূপ্রকৃতিতে চিহ্ন রেখে যেতে পারে। হিকম্যান ক্রেটারের বয়স, গঠন এবং উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা সেই অতীতের ঘটনাকে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে। আর এই আবিষ্কারের সূত্রপাত হয়েছিল গুগল আর্থে দেখা একটি অস্বাভাবিক বৃত্তাকার চিহ্ন থেকে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Aamir Khan wedding, Gauri Spratt | বিয়ে সারলেন আমির খান! গৌরী স্প্র্যাটের আচরণ ঘিরে নতুন কৌতূহল, কেন পাপারাৎজিদের বলেছিলেন ‘আমাকে একা ছেড়ে দিন’?



