সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ : কলকাতার দুর্গাপুজোর বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রিকে কেন্দ্র করে ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহারের অভিযোগে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রাজ্যের প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে (Indranil Sen) ঘিরে এই মামলায় বৃহস্পতিবার ব্যাঙ্কশাল আদালতে (Bankshall Court) একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ তুলে ধরেছে পুলিশ বলে উল্লেখ। তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে দাবি, ‘মাস আর্ট’ (Mas Art) নামে একটি সংস্থা ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইউনেস্কোর লোগো ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো ও বিশেষ প্রবেশের পাস বিক্রি করেছে। অথচ ওই সংস্থার সঙ্গে ইউনেস্কোর চুক্তি হয়েছিল ২০২৫ সালে। সরকারি আইনজীবীর বক্তব্য, বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে লোগো ব্যবহারে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইন্দ্রনীল। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ নেই এবং পাস বিক্রির বিষয়টিও তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁকে পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
বুধবার গ্রেফতারির পর বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করানো হয় রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রীকে। শুনানি চলাকালীন তদন্তকারী অফিসারদের বক্তব্যের ভিত্তিতে সরকারি আইনজীবী অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Abhijit Chatterjee) মামলাটিকে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরেন। পুলিশের দাবি, দুর্গাপুজোর বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রি ও তার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনেস্কোর সঙ্গে ২০২৫ সালে চুক্তি হলেও তার আগের কয়েক বছর ধরেই ‘মাস আর্ট’-এর মাধ্যমে পুজোর পাস বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই লেনদেনের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েই তদন্ত এগোচ্ছে। সরকার পক্ষের বক্তব্য, ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত ছিল। বাণিজ্যিক বা আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে ওই লোগো ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে আদালতে দাবি করেছেন সরকারি আইনজীবী। তা সত্ত্বেও পুজোর বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রির ক্ষেত্রে সেই লোগো ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তা নিয়মবিরুদ্ধ কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তকারীদের দাবি, ২০২২ সাল থেকেই এই ধরনের পাস বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছিল। চুক্তির সময়কাল এবং তার আগে সংগৃহীত অর্থের হিসাবের মধ্যে কোনও অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন : Sarshuna Crime News | চুম্বনের অভিযোগে নগ্ন করে হাঁটানোর নালিশ, সরশুনায় গ্রেফতার ৩
মামলার আর্থিক দিকটি নিয়েও আদালতে গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ‘মাস আর্ট’-এর প্রধান হিসেবে পরিচিত ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যে দিন টাকা জমা পড়েছে, সেই দিনই প্রাক্তন মন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই দাবির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক লেনদেনের নথি পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে সরকারি পক্ষ জানিয়েছে। তবে আদালতে পেশ করা অভিযোগ এবং তদন্তকারীদের বক্তব্য এখনও বিচারপ্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত ভাবে প্রমাণিত হয়নি। আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি, অর্থের উৎস এবং তার ব্যবহার সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছে পুলিশ। তদন্তকারী পক্ষ আরও জানিয়েছে, এই মামলায় তিন জনের গোপন জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যে প্রাক্তন মন্ত্রীর ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে বলে সরকারি আইনজীবী দাবি করেছেন। ওই জবানবন্দি ও অন্যান্য নথি কেস ডায়েরিতে রাখা হয়েছে বলেও আদালতে জানানো হয়। অভিযোগকারীর আইনজীবীর বক্তব্য, পুজোর পাস বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই অর্থ কী ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, কারা তার সুবিধা পেয়েছেন ও গোটা ব্যবস্থার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে সরকারি পক্ষের দাবি। এই যুক্তিতেই ইন্দ্রনীলের জামিনের বিরোধিতা করেন সরকারি আইনজীবী।
অন্য দিকে, ইন্দ্রনীলের আইনজীবী আদালতে তাঁর মক্কেলের হয়ে পাল্টা যুক্তি পেশ করেন। তাঁর বক্তব্য, ইন্দ্রনীল তদন্তে সহযোগিতা করেছেন, অথচ দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাস বিক্রির দায়িত্ব তাঁর হাতে ছিল না বলেও দাবি করা হয়েছে। ইন্দ্রনীলের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বেসরকারি সংস্থাকে টিকিট বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই সংস্থার ভূমিকা যথাযথ ভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। তাঁর আরও দাবি, ‘মাস আর্ট’-এর কোনও পদে তিনি নেই এবং ওই সংস্থার কাজকর্মের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পর্কও নেই। উল্লেখ্য, ফোনে ইন্দ্রনীলকে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তারও জবাব দিয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে জানানো হয়েছে, তাঁর মোবাইল ফোন তল্লাশির পর ইডির (Enforcement Directorate) হেফাজতে আছে। তাই ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার প্রেক্ষিতে এই বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে তাঁর বক্তব্য। ইন্দ্রনীল আরও প্রশ্ন তুলেছেন, যাঁরা নিজেদের এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বলে দাবি করে অভিযোগ জানিয়েছেন, তাঁরা ঠিক কী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, এই মামলায় কয়েক জন অভিযুক্ত আগাম জামিন পেয়েছেন। তাঁদের ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কার্যকলাপও খতিয়ে দেখা উচিত।
‘মাস আর্ট’-এর পাশাপাশি জিডি ক্রিয়েশন (GD Creation) ও থার্ড লাইন (Third Line) নামে আরও কয়েকটি সংস্থার নাম এই বিতর্কে উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। ইন্দ্রনীলের দাবি, ওই সংস্থাগুলির সঙ্গেও তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। অন্য দিকে, দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে পুলিশ। সরকারি আইনজীবীর বক্তব্য, যে সময়ে এই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেই সময়ে ইন্দ্রনীল রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন। দরপত্র আহ্বানের ঘটনাও তাঁর মন্ত্রিত্বের সময়কালে ঘটেছে বলে সরকারি পক্ষের দাবি। তবে মন্ত্রিত্বের সময়ে কোনও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এবং তাতে ব্যক্তিগত ভাবে কারও অপরাধমূলক ভূমিকা থাকা এক বিষয় নয়। সেই যোগসূত্র তদন্তে প্রমাণ করা প্রয়োজন। এই মামলার সূত্রপাত কলকাতা পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া একটি অভিযোগ থেকে। জয়দীপ মুখোপাধ্যায় (Joydeep Mukherjee) নামে এক ব্যক্তি কলকাতার বৌবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর (FIR) নথিভুক্ত হয়। পরে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটও আর্থিক লেনদেনের দিকটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে। ইডি এর আগে ইন্দ্রনীলকে একাধিক বার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ও তাঁর বিভিন্ন ঠিকানায় তল্লাশিও চালিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দুর্গাপুজো ও লক্ষ্মীপুজোর পর তাঁকে ফের তলব করা হয়েছিল। তার পরেই বুধবার গ্রেফতারির ঘটনা ঘটে।
গ্রেফতারির আগে থেকেই আইনি লড়াই চলছিল ইন্দ্রনীলের। আগাম জামিন চেয়ে তিনি কলকাতা হাই কোর্টের (Calcutta High Court) দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) দ্বারস্থ হন প্রাক্তন মন্ত্রী। তবে শীর্ষ আদালতে মামলার শুনানি নিয়ে এখনও নিষ্পত্তি হয়নি বলে সূত্রের খবর। মঙ্গলবার মামলাটি বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের (Justice Dipankar Datta) এজলাসে ওঠার কথা থাকলেও তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়ান। ফলে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। উল্লেখ্য, দুর্গাপুজোর সঙ্গে ইউনেস্কোর নাম জড়িয়ে রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতির কারণে। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় জায়গা পায়। সেই স্বীকৃতিকে ঘিরে দেশ-বিদেশে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে পুজোর বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রি, প্রিভিউ শো এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনে ইউনেস্কোর নাম বা লোগো ব্যবহারের অভিযোগ স্বাভাবিক ভাবেই গুরুত্ব পেয়েছে। তবে স্বীকৃতির নাম ব্যবহার করে কোনও সংস্থা আর্থিক সুবিধা নিয়েছে কি না, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কি না ও অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত ভূমিকা কতটা? এই প্রশ্নগুলির উত্তর নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া নথি ও প্রমাণের উপর।
আপাতত আদালতের নির্দেশে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে থাকবেন ইন্দ্রনীল সেন। এই সময়ের মধ্যে পাস বিক্রির দায়িত্বে থাকা সংস্থা, সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, দরপত্রের নথি ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য খতিয়ে দেখতে চাইছে তদন্তকারী দল। অন্য দিকে, প্রাক্তন মন্ত্রীর পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির প্রত্যক্ষ যোগ নেই। ফলে মামলার পরবর্তী শুনানিতে আর্থিক লেনদেনের নথি, গোপন জবানবন্দি এবং সংস্থাগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অভিযোগের সত্যতা বিচারাধীন, তদন্তের অগ্রগতির দিকেই এখন লক্ষ্য সবার।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Putin praises Modi, Modi Ukraine peace efforts | ‘যত দ্রুত সম্ভব সংঘাত শেষ হোক’! মোদীর উদ্যোগে পুতিনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, কী বললেন রুশ প্রেসিডেন্ট?




