সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : আইপিএলে (IPL) পুরনো সাফল্য ফিরে পেতে দল ঢেলে সাজানোর পথে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স (Mumbai Indians)। কোচিং বিভাগে পরিবর্তন, পারফরম্যান্স সামলানোর জন্য নতুন মুখ ও নেতৃত্বে সম্ভাব্য রদবদল এসব মিলিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্দরমহলে শুরু হয়েছে নতুন পরিকল্পনা। আর সেই পরিবর্তনের আবহেই প্রশ্ন উঠছে দলের সঙ্গে সচিন তেন্ডুলকরের (Sachin Tendulkar) দীর্ঘ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ২০০৮ সালে আইপিএলের সূচনা থেকে মুম্বইয়ের সঙ্গে যুক্ত ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। প্রায় ১৮ বছর ধরে নানা ভূমিকায় দলের পাশে থাকা সচিনকে আগামী মরসুমেও আইকন হিসেবে দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে জল্পনা। যদিও এই বিষয়ে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স কর্তৃপক্ষ কিংবা সচিনের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা করা হয়নি।
দলের সাম্প্রতিক ব্যর্থতার পর পরিবর্তনের পথে হাঁটছে মুম্বই। প্রধান কোচের দায়িত্বে মাহেলা জয়বর্ধনের (Mahela Jayawardene) পরিবর্তে কায়রন পোলার্ডকে (Kieron Pollard) আনার সিদ্ধান্ত সেই পরিকল্পনারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন অলরাউন্ডার দীর্ঘ দিন মুম্বাইয়ের হয়ে খেলেছেন। ২০১০ সালে ফ্র্যাঞ্চাইজিতে যোগ দেওয়ার পর মাঠে নিজের কার্যকর ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ক্রিকেট থেকে সরে আসার পর গত চার বছর দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন। ফলে মুম্বইয়ের খেলোয়াড়দের মানসিকতা, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ ও দলের নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই তাঁকে কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। পোলার্ডের সামনে অবশ্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। আইপিএলের অন্যতম সফল দল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স অতীতে একাধিক বার খেতাব জিতলেও সাম্প্রতিক মরসুমগুলিতে প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি। সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে নতুন কোচকে শুধু দলের ব্যাটিংয়ের উন্নতি ঘটালেই চলবে না, গোটা দলের পারফরম্যান্সে ভারসাম্য আনতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, বোলিং বিভাগের কার্যকারিতা বাড়ানো ও তরুণ ক্রিকেটারদের কাছ থেকে ধারাবাহিক অবদান পাওয়াও তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
দলের অধিনায়কত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে। গত মরসুমের ফলাফল ও নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের কারণে হার্দিক পাণ্ড্যের (Hardik Pandya) ভবিষ্যৎ ঘিরে জল্পনাও বেড়েছে। ভারতীয় দলের অলরাউন্ডারকে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। শুধু তা-ই নয়, তাঁকে আগামী মরসুমের দলেই রাখা হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে হার্দিকের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের তরফে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। তাই তাঁকে সরানো কিংবা দল থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিকে নিশ্চিত খবর হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এই পরিস্থিতিতে আবার রোহিত শর্মাকে (Rohit Sharma) অধিনায়কের দায়িত্বে ফেরানো হতে পারে বলে জল্পনা চলছে। মুম্বাইয়ের হয়ে একাধিক আইপিএল খেতাব জয়ের সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন রোহিত। তাঁর অধিনায়কত্বে দল একাধিক বার প্রতিযোগিতার সেরা হয়েছে। ফলে সমর্থকদের একাংশ তাঁকে ফের নেতৃত্বে দেখতে আগ্রহী। তবে নেতৃত্বের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, খেলোয়াড়দের ভূমিকা এবং নতুন কোচের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ বিষয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত রোহিতের প্রত্যাবর্তনও জল্পনার স্তরেই থাকছে।
শুধু কোচ ও অধিনায়কত্ব নয়, দলের পারফরম্যান্স উন্নত করতে সহায়ক কর্মীদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের পারফরম্যান্স ডিরেক্টর হিসেবে জ়ুবিন ভারুচাকে (Zubin Bharucha) আনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘ সময় রাজস্থান রয়্যালসের (Rajasthan Royals) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ওই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ক্রিকেটারদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা মুম্বইয়ের কাজে লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। জোরে বোলিং বিভাগের দায়িত্বেও নতুন মুখ আসতে পারেন বলে জল্পনা আছে। সূত্রের খবর, স্টেফানোস জোন্সের (Stefanos Jones) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আগে রাজস্থান রয়্যালসের সঙ্গে কাজ করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তরুণ ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। নীতীশ রেড্ডি (Nitish Reddy), অরুন্ধতী রেড্ডি (Arundhati Reddy) ও অর্জুন তেন্ডুলকরের (Arjun Tendulkar) মতো ক্রিকেটারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে। তবে মুম্বাইয়ের জোরে বোলিং কোচ হিসেবে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে কি না, তা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কোচিং বিভাগে এত পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সচিন তেন্ডুলকরের ভূমিকা নিয়ে। আইপিএলের প্রথম মরসুম থেকেই মুম্বাইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শুরুতে দলের অন্যতম প্রধান ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে নেমেছেন। ২০১৩ সালে আইপিএল খেতাব জয়ের পর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন সচিন। তার পর ২০১৪ সালে তাঁকে দলের আইকন বা প্রধান মুখের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই সময় থেকে তিনি মুম্বাইয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন অন্য ভূমিকায়। খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কও দলের ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে। কিন্তু সচিনের বর্তমান দায়িত্ব নিয়মিত কোচিংয়ের মতো নয়। দলের সঙ্গে তাঁর ভূমিকা অনেকটাই পরামর্শমূলক ও প্রয়োজননির্ভর বলে উল্লেখ।
মুম্বাইয়ের প্রতিটি ম্যাচে সচিন উপস্থিত থাকেন না। পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রিকেটার কিংবা কোচিং বিভাগের সদস্যদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ফলে তাঁর ভূমিকা স্থায়ী ও পূর্ণ সময়ের দায়িত্বের চেয়ে কিছুটা আলাদা। গত দুই বছরে দলের ভিতরে তাঁর এই ভূমিকার গুরুত্ব কমেছে বলেও সূত্রে দাবি করা হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজির তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পোলার্ড প্রধান কোচ হওয়ার পর সচিনের পরামর্শদাতার ভূমিকা কতটা প্রয়োজনীয় থাকবে, সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। পোলার্ড নিজেও মুম্বাইয়ের দীর্ঘ দিনের সদস্য ও খেলোয়াড় ও ব্যাটিং কোচ হিসেবে দলের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। ফলে দলের দৈনন্দিন ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তে নতুন কোচের ভূমিকা বাড়তে পারে। তবে তার অর্থ এই নয় যে সচিনকে অবশ্যই দায়িত্ব থেকে সরতে হবে। দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো কী ভাবে সাজানো হবে, তা নির্ভর করবে কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সিদ্ধান্তের উপর।
অর্জুন তেন্ডুলকরের ভবিষ্যৎ নিয়েও এই আলোচনার মধ্যে প্রসঙ্গ উঠেছে। মুম্বাইয়ের একটি সূত্রের দাবি, অর্জুনকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সচিনকে কোনও বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবে এই দাবি স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ক্রিকেটে দল নির্বাচন সাধারণত খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স, দলের ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তিতে হয়। সচিনের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজির সম্পর্কের কারণে অর্জুনের দলীয় অবস্থান নিয়ে আলাদা কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ও সচিন দুই পক্ষের দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে এই জল্পনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এক দিকে ফ্র্যাঞ্চাইজি নতুন কোচিং কাঠামো গড়ে আগামী মরসুমে সাফল্য ফেরানোর চেষ্টা করছে, অন্য দিকে সচিনের মতো প্রাক্তন অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ক্রিকেটারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখেই এখনও কোনও পক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। আগামী মরসুমের আগে সচিন নিজেই আইকনের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন বলেও জল্পনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনার পক্ষে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই।
মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের সামনে এখন মূল লক্ষ্য দলকে আবার প্রতিযোগিতার শীর্ষে ফেরানো। সেই উদ্দেশ্যে কোচিং বিভাগে পরিবর্তন, পারফরম্যান্স ব্যবস্থাপনায় নতুন দায়িত্ব এবং নেতৃত্ব নিয়ে সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত সবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সচিন তেন্ডুলকরের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ নিছকই সাংগঠনিক বদলের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজির ইতিহাস ও পরিচিতিও। আগামী মরসুমের আগে কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন দেখার। আপাতত নিশ্চিত তথ্যের চেয়ে জল্পনাই বেশি, আর সচিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sara Tendulkar viral video, Sachin Tendulkar family, Arjun Tendulkar Sania Chandok engagement | শচীন তেন্ডুলকরের পরিবারে মিষ্টি মুহূর্ত, সানিয়া চণ্ডকের সঙ্গে সারা তেন্ডুলকরের ভিডিও আবার ভাইরাল



